আতিয়ারের শাহাদতের কথা জানে না মুক্তিযোদ্ধা সংসদ

আপডেট: 03:14:34 16/12/2016



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : ‘হে পথিক তুমি এসেছিলে হেতা লইয়া মুক্তির বাণী পথের দিশা দেখাইয়া গেলে বুকের রক্ত দানী’ উক্তিটি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আতিয়ার রহমানের কবরে খোদাই করে লেখা।
স্থানীয়রা তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানলেও তা জানে না উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড। তার শহীদ হওয়ার কোনো তথ্যই নেই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড অফিসে। অথচ একাত্তরে আতিয়ার রহমানের ত্যাগের কথা শ্রদ্ধাভরে আজো স্মরণ করছেন স্থানীয়রা।
নড়াইল জেলার কালিয়ার বাসিন্দা ছিলেন আতিয়ার রহমান। পেশায় ছিলেন ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা। চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে থাকতেন মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কাছারিতে। স্থানীয়রা তাকে সেক্টর বলেই চেনেন। অনেক বছরই তিনি ছিলেন ওই এলাকাসহ আশপাশের ইউনিয়নে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চলছে তুমুল বেগে যুদ্ধ। উপজেলার সর্বত্র ছড়িছে পড়েছে রাজাকাররা। তাদের প্রতিহত করে দেশ ও মানুষকে রক্ষায় শত্রুর মোকাবেলা করছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় দেওয়ায় রাজাকাররা প্রকাশ্যে গুলি কলে হত্যা করেছিলো এই আতিয়ার রহমানকে।
সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ওই এলাকার অনেকেই। বুধবার সন্ধ্যায় কথা হয় মনোহরপুর ইউনিয়নের খাকুন্দি গ্র্রামের বৃদ্ধ খোরশেদ আলমের সঙ্গে; যিনি ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
খোরশেদ আলী জানান, স্ত্রী, দুই ছেলে কাজল ও বাদল এবং তিন মেয়ে রিতা, মিনা ও ইলাকে নিয়ে মনোহরপুর কাছারি ঘরে থাকতেন ৪৫ বছর বয়সী আতিয়ার রহমান। চাকরির কারণে সরাসরি যুদ্ধে যেতে পারেননি তিনি। তবে যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে এই কাছারি ঘরে আসতেন। আতিয়ার রহমান তাদের আশ্রয়, খাবার দিতেন। তিনি ছিলেন মুজিবভক্ত। সেই সূত্রে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতেন। সেই অপরাধে ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট সকাল সাড়ে আটটার দিকে রাজাকাররা আতিয়ার রহমানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। তারা আতিয়ারের হাতে ও পেটে গুলি করেছিলো।
খোরশেদ বলেন, ‘সকালে গুলির শব্দ হলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তখন আমরা এগিয়ে আসি। এসে দেখি আতিয়ার রহমান পড়ে আছেন। গুলিতে তার কলিজাসহ নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে দেখি তিনি মারা গেছেন। নিজের হাতে আতিয়ার রহমানের কলিজা বুকের ভিতরে ঠুকিয়ে দিয়েছিলাম আমি।’
আতিয়ার রহমানের পরিবারের কথা জানতে চাইলে খোরশেদসহ অনেকেই জানান, তার সাহেবের বাড়িতো এখানে নয়, কালিয়ায়। তাই উনি শহীদ হওয়ার পর সবাই এখান থেকে চলে গেছেন। আতিয়ারের বৃদ্ধ স্ত্রী তার ছোট ছেলেকে নিয়ে যশোরের বাড়িতে থাকতেন। তবে এখন আতিয়ারের স্ত্রী বেঁচে আছেন কি না তা জানাতে পারেননি এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা জানান, আতিয়ারের বড় ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। তাছাড়া এক মেয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে যশোরে, আরেক মেয়ে ঢাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে ছেলে-মেয়েরা তাদের মাকে নিয়ে এসে বাবার কবর জিয়ারত করে যান। গত ঈদেও তারা এসেছিলেন। তবে আতিয়ার রহমান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি বলে জানান তারা।
খাকুন্দি গ্রামের রহিম রানা বলেন, ‘‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লেখা বসুন্দিয়া এলাকার গালিব হরমুজ নামে এক লেখকের ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’ নামে এক বইতে আমি আতিয়ার রহমানের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শহীদ হওয়ার ঘটনা পড়েছি।’’
তবে তিনি শহীদের মর্যাদা না পাওয়ায় রহিম রানাসহ স্থানীয়রা অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার এসএম কওসার আহম্মেদ বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আতিয়ার রহমান নামে কেউ মনোহরপুরে শহীদ হয়েছেন বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া এই নামে কেউ ভাতা পান কিনা তাও আমি জানি না।’

আরও পড়ুন