আদিবাসীর অধিকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আপডেট: 05:44:59 11/11/2016



img

এমএম কবীর মামুন : কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ঘটনা উঠে এসেছে। সেটা হলো গাইবান্ধায় আদিবাসী পল্লীতে হামলা আর তাদের উচ্ছেদ করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ভিডিওগুলো এসেছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন হামলা কাম্য নয়। কোনো সংকট থাকলে তা নিরসনের অনেক শান্তিপূর্ণ উপায় খুঁজে বের করা যেতে পারে নিশ্চয়ই। মানুষ মেরে, ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করার পেছনে কী অভিসন্ধি কাজ করে? আদিবাসীরা বলছে, জমি তাদের আর অন্যপক্ষ বলছে জমি তাদের। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল বায়োস্কোপ। ‘কী চমেৎকার দেখা গেল, হা-রে মজা লাইগা গেল, শ্যামল হেম্ব্রম জীবন দিলো, কত মানুষ আহত হলো, আদিবাসী উচ্ছেদ হলো’ আরো কত কী!
সমতল কিংবা পাহাড়ে, আদিবাসীদের ভূমি দখল বাংলাদেশে নতুন কোনো ইস্যু নয়। যুগ-যুগান্তর ধরে এই প্রক্রিয়া চলমান। এই কথা কারো অজানা নয়। মিলিটারি দিয়ে, সেটেলার দিয়ে পাহাড় দখল আর ক্ষমতা দিয়ে জবরদস্তি করে সমতলের আদিবাসীদের ভূমি দখল সমান্তরালে চলে এখানে। ভূমিতে আদিবাসীদের মালিকানা প্রথাগত। শহুরে কাগুজে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা তারা কোনো দিন করেনি। ফলে ভূমিগ্রাসীদের পক্ষে তাদের জমির জাল দলিল তৈরি করে গায়ের জোরে দখল করাটা খুবই সহজ। আবার কৌশলে কাজ না হলে হামলা করে, ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে, ভয় দেখিয়ে, গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেও তাদের ভূমি দখল করা হয়েছে অতীতেও। নিজেদের ভূমি রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে ২০০০ সালে খুন হয়েছেন উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার আন্দোলনের নেতা আলফ্রেড সরেন। আজো তার হত্যার বিচার হয়নি। খুনি গদাই-হাতেমরা এখনো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এলাকায় আর আতঙ্কে দিন রাত কাটে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর গ্রামের আদিবাসীদের। ২০০৪ সালে নিজেদের ভূমি রক্ষায় প্রাণ দিতে হয়েছিল টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের ইকোপার্কবিরোধী আন্দোলনের নেতা পীরেন স্নালকে। ১৯৯৬ সালে অপহৃত হলেন হিল উইমেনস ফেডারেশনের কল্পনা চাকমা। আজো তার কোনো খোঁজ আজো পাওয়া গেল না। এগুলোই হলো এখানকার বাস্তবতা।
জমির মালিকানা কার এমন সমস্যার সমাধানের কায়দা যদি হয় মানুষের লাশের উপর দিয়ে তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার কেন শান্তিপূর্ণ উপায় খুঁজলো না। পেশীশক্তি আর বন্দুকই কি সমাধান? নাকি সমস্যা অন্য কোথাও।
কেন সরকার আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে নারাজ? বাঙালি কেন তাদেরকে ‘উপজাতি’ বলে সম্বোধন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ (২)-
‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।’
এই অনুচ্ছেদ হতেই বুঝা যায় যে বাঙালি তার দেশে অন্য অন্যকোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকারে স্বচ্ছন্দ নয়। এই রাষ্ট্র ১৯৭২ সালেই বাঙালি ছাড়া অন্যদেরকে অস্বীকার করেছিল। বঙ্গবন্ধু নিজেই পাহাড়ি আদিবাসী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বলেছিলেন, ‘তোরা বাঙালি হয়ে যা।’ পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তাদেরকে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃ-গোষ্ঠী’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ (ক)- ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা , নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এই অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে অনেকেই বলেন, রাষ্ট্র তাদেরকে স্বীকৃতি তো দিয়েছেই। আদিবাসীদের জন্য ব্যবহৃত ‘উপজাতি’, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃ-গোষ্ঠী’ প্রভৃতি প্রত্যয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীকে কেন উপজাতি হিসাবে আখ্যা দেওয়া হবে? পৃথিবীর সকল জাতিই কোনো না কোনো নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্গত। তাহলে কেন কাউকে ক্ষুদ্র হিসাবে বিবেচনা করা হবে? স্বাধীন রাষ্ট্রে কে ক্ষুদ্র কে বৃহৎ এই ধারণা তৈরি করা হয় শুধুমাত্র ফায়দা হাসিলের জন্য। এগুলো আসলে উৎপীড়নের কৌশল। ক্ষমতাবানরা এভাবেই ‘হেজিমনি’ তৈরি করে এবং নানান কায়দা-কানুন করে নিপীড়ন চালায়। সুতরাং গাইবান্ধায় আদিবাসীদের উপর যা হয়েছে তা এই রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে আদিবাসীদেরও অংশগ্রহণ ছিল। পাকিস্তানি শোষকদের হাত থেকে দেশটাকে স্বাধীন করতে তারাও অস্ত্র হাতে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে। তাদের মধ্যেও সংগঠক ছিল মুক্তিযুদ্ধের। তাই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাগারাম মাঝি, প্রমোদ মানকিন বা রাজা ম প্রু সেইনকেও দেখা যায় দেশের ভেতরে এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে ঘুরে আদিবাসীদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে। সারাদেশের সব আদিবাসী অঞ্চল যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মধুপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পাবনা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আদিবাসীরা তাদের সংখ্যানুপাতে ব্যাপক হারে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং ১৯৯৬ সালে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা থেকে জানা যায়, শুধু ১১ নম্বর সেক্টরে অর্থাৎ ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট এক হাজার ৩০০ আদিবাসী গারো, হাচং-কোচ মুক্তিযোদ্ধা ছিল আর শুধু হালুয়াঘাট অঞ্চলেই ১১৫ জন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ছিল এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন শহীদও হয়েছেন। ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রমোদ মানকিন, নেত্রকোনার বিরিশিরির কোম্পানি কমান্ডার দীপক সাংমা, কমলাকান্দা এলাকার দশম শ্রেণির ছাত্র থিওফিল হাজং, দুর্গাপুরের পল্গাটুন কমান্ডার ধীরেন্দ্র রিছিল, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রং প্রমুখ। ১ নম্বর সেক্টরের অধীন পার্বত্য অঞ্চলের ১১টি আদিবাসী জাতিসত্তার প্রায় সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেন। আরডিসির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী নারীদের ভূমিকাও কিছু কম নয়। যেমন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং যোদ্ধা গারো নারী বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেত্রী লতিকা এন মারাক, খাসিয়া মুক্তিবেটি কাকেৎ হেনইঞিতা বা কাঁকন বিবি (যার নাম আমরা সবাই কম-বেশি জানি), রাখাইন নারী প্রিনছা খেঁ, খাসিয়া নারী শহীদ কাঁকেট (তার পুরো নাম জানা যায় না, তবে বাঙালিদের কাছে তিনি কাঁকুই নামে পরিচিত, তিনি পাকিস্তানিদের অত্যাচারে জীবন দেন)। তবে দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূলধারার যে ইতিহাস রচিত হয়েছে তাতে তারা স্থান পায়নি। এ থেকেও কিছুটা অনুমান করা যায় আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবস্থান।
অন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর ১৬৯ নন্বর কনভেনশনের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে আদিবাসীর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে তা হলো- “আদিবাসী হলো তারাই যাদের উৎপত্তি একটা জনগোষ্ঠী হতে, যারা একটা দেশের বা দেশের মধ্যে একটা ভৌগোলিক অঞ্চলের বাসিন্দা, যারা ঐ অঞ্চল আবিষ্কারের সময় হতে বা ঔপনিবেশিক বা বর্তমান রাষ্ট্রসীমা গঠিত হবার আগে থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছে এবং যাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ক্ষেত্রে অথবা পূর্ণাঙ্গ বৈধতা রয়েছে।” এই সংজ্ঞা থেকে কিছু বিষয় খুবই স্পষ্ট আর তা হলো- আদিবাসী হলো তারাই যারা তাদের নিজেদের আদিবাসী হিসাবে চিহ্নিত করে এবং ব্যক্তিগতভাবে যারা তাদের কমিউনিটির দ্বারা ঐ কমিউনিটির সদস্য হিসাবে স্বীকৃত। যারা স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে তাদের পরিচয় দেয়। যাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাস স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।যাদের যাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতন্ত্র। তারা ভূমি ও সম্পদের ক্ষেত্রে যৌথ মালিকানায় বিশ্বাসী এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং আইন এদের প্রথাগত বিষয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক অধিকারের ধারণা। কিন্তু আমরা বাঙালিরা মনে করি যে, তাদেরকে আদিবাসী বললে বোধ হয় আমরা ঔপনিবেশিক কিংবা ভিনদেশী হয়ে যাবো। কেউ আদিবাসী না হলেই যে সেটেলার হয়ে যাবে এটা অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমেরিকার বেলায় প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশের বেলায় তা সঠিক নয়। আদিবাসী অধিকার বিষয়ক প্রগতিশীল চিন্তাধারায় আদিবাসী না হলে তাকে সেটেলার বলে ব্যাখ্যা করে না। বাঙালিরা বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘নেটিভ’। ফলে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর আদিবাসী পরিচয় স্বীকার করার মাধ্যমে তা কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ বা অস্বীকৃত হয় না। সুতরাং এটা বলা যায় যে, যদি ধারণার জায়গা পরিষ্কার থাকে তবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জাতিগত বিষয়ে কোনো সংঘাত কিংবা নিপীড়ন সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে না।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আদিবাসী সাঁওতালদের উপর যে নিপীড়ন হয়েছে তা আসলে অবর্ণনীয়। তারা গৃহহীন হয়ে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দেখবার কেউ নেই। রাষ্ট্র স্বয়ং যেখানে প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ সেখানে তাদের টিকে থাকাটাই মুশকিল। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ-পরবর্তী পাকিস্তানের ২৪ বছরের নিপীড়নকে এই দেশের মানুষ একসাথে মোকাবেলা করে দীর্ঘ আন্দোলন আর ১৯৭১-এর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। এই দেশের মানুষ জানে শোষণের যন্ত্রণা কত ভয়াবহ। যে বাঙালির উপর এত নিপীড়ন হয়েছে, যারা শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, সেই বাঙালি নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে না। উগ্র জাতীয়তাবাদ তার কাছে কাম্য নয়। রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের সমস্যা বুঝতে হবে। সকলকে সমানভাবে দেখতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান তার তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের অংশে ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান’। আবার তার ঠিক পরের অনুচ্ছেদ মানে ২৮ (১) এ বলছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না’।
সংবিধান হলো রাষ্ট্র পরিচালনার সকল আইনের নৈতিক ভিত্তি। সুতরাং আমাদের পবিত্র সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে অবশ্যই আদিবাসীদের উপর সকল ধরনের নিপীড়ন বন্ধ করতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি তাদেরকে ‘উপ’, ‘ক্ষুদ্র’ কিংবা ‘লঘু’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত না করে সকলের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান তাদেরকে দিতে হবে সংখ্যার বিচারে বিবেচনা না করে। তবেই সমুন্নত হবে স্বাধীনতার চেতনা।

লেখক : সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট

লেখকের পূর্বতন লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন