আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা ঢুকেছিল যখন

আপডেট: 05:07:32 29/03/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিক।
আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে রক্ষা করতে সেদেশে ঢুকে পড়লো সোভিয়েত সেনাবাহিনী। মস্কো তখন বলেছিল, সোভিয়েত সৈন্যরা ছয় মাস থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেদেশে সোভিয়েত সৈন্যরা ছিল দীর্ঘ দশ বছর, এবং আফগানিস্তান পরিণত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনামে।
আফগানিস্তানের সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই জন্ম হয়েছিল তালেবান এবং আল-কায়েদার মতো জিহাদি বাহিনীগুলোর।
বিবিসির লুইস হিদালগো কথা বলেছেন এমন দুইজনের সঙ্গে যারা ইতিহাসের মোড় বদলে দেওয়া সেই ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
এদের একজন হলেন ভিরশভ ইসমাইলভ, যিনি আফগানিস্তানে সৈন্য হিসেবে কাজ করেছেন, এবং আরেকজন হলেন সাংবাদিক আন্দ্রেই অস্টালস্কি।
সেটা ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ। আন্দ্রেই অস্টারস্কি তখন কাজ করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারি বার্তা সংস্থা তাসে।
ক্রেমলিন থেকে একটা ফোন এলো তাসের মহাপরিচালক সের্গেই লোসেফের কাছে। তার পরই অস্টারস্কিকে ডেকে পাঠালেন মি. লোসেফ।
"আমি তখন বাড়ি যাবার জন্য আমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছি। ঠিক সেই সময় মহাপরিচালকের ঘরে আমার ডাক পড়লো।"
"তিনি আমাকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যরা আফগানিস্তানে ঢুকবে। আর তার পরই কাবুল সরকারের সমর্থনে একটা বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করবে তারা।"
মহাপরিচালক বললেন, অস্টারস্কিকে সারারাত অফিসেই থাকতে হবে এবং বিদেশ থেকে এর কী প্রতিক্রিয়া আসে- যেসব খবর সংগ্রহ করতে হবে।
কিন্তু এসব খবর সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা তখন অস্টারস্কির ছিল না। তিনি তখন ছিলেন একজন জুনিয়র রিপোর্টার।
"ঠিকই তাই, অনেক পরে আমি কেজিবির বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষকের স্মৃতিচারণ পড়ে খুব অবাক হয়েছিলাম। তিনিও লিখেছিলেন, তিনিও ওই খবরে খুব অবাক হয়েছিলেন।"
২৪ ডিসেম্বরের পরে তিন দিন ধরে- ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত- হাজার হাজার সোভিয়েত সৈন্য আফগানিস্তানে ঢুকলো।
স্থানীয় সংবাদে জানানো হয়, দুইদিন ধরে কাবুল বিমানবন্দরে প্রায় ২০০টি সোভিয়েত সামরিক পরিবহন বিমান অবতরণ করে। ছোট ও বড় আকারের 'আন্তনভ' পরিবহন বিমান ভর্তি করে আনা হয়েছিল এই সৈন্যদের।
মস্কো থেকে অনেক দূরে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র দাগেস্তানে- রেডিওতে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর ঘোষণাটি শুনেছিলেন এক তরুণ শিক্ষক ভিয়েরস্লাভ ইসমাইলভ।
"ব্যাপারটা ছিল এই রকম যে, সোভিয়েত সেনাবাহিনী সবসময়ই দুনিয়ার কোথাও না কোথাও যুদ্ধ করছিল। এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত খুবই কম," বলছিলেন ইসমাইলভ।
"মনে আছে আমাদের শুধু বলা হয়েছিল আমরা শুধু আফগানদের সাহায্য করছি, রাস্তা, স্কুল এবং হাসপাতাল পুনঃনির্মাণ করছি। সামরিক অভিযানের কোনো উল্লেখ ছিল না।"
"তাদের শত্রুদের সম্বোধন করা হতো 'ডাকাত' বলে, এবং তাদের হাত থেকে আফগান জনগণকে রক্ষা করছি আমরা- এটাই বলা হয়েছিল।"
এর মধ্যে মস্কোতে তাসের অফিসে- অস্টারস্কিকে আফগানিস্তান সংক্রান্ত নিউজ ডেস্কের দায়িত্ব দেওয়া হলো। কারণ তারা আফগানিস্তানের ভাষা দারি এবং পশতু বলেন ও বোঝেন এমন বিশেষজ্ঞ পাচ্ছিলেন না।
তাসের ভেতরে কোনো তথ্য প্রকাশের আগে তাকে নানা পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যেতে হতো।
অনেক তথ্যই তারা জানতে পেতেন যা সেন্সর করা নয়। সাধারণ মানুষের সেটা জানার কোনো উপায় ছিল না। সেগুলো যেতো পলিটব্যুরোর কাছে বা অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে।
এভাবেই একদিন অস্টারস্কিকে পাঠানো হলো স্থানীয় পার্টি কর্মকর্তাদের এসব তথ্য সম্পর্কে একটা ব্রিফিং দেওয়ার জন্য।
"হ্যাঁ, আমি তাদের বলেছিলাম যে, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিন- যাকে সোভিয়েত কমান্ডোরা হত্যা করেছিল- এবং তারপর এক মদ্যপ কেজিবি এজেন্ট বাবরাক কারমাল একটা সংখ্যালঘু সরকারের ভেতরেও সংখ্যালঘু একটা অংশের নেতা ছিলেন, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ওপরেই নির্ভর করছিল। কিন্তু আফগানিস্তান তখন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সমস্যাসংকুল দেশ।"
তার কথায়, পার্টি কর্মকর্তাদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা্ও ছিল অপ্রত্যাশিত।
"আমার শ্রোতারা একেবারেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। কারণ সোভিয়েত সংবাদপত্রে তারা যা পড়ছিলেন- আমার কথা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আমাকে দুয়ো দিতে লাগলেন, আমাকে লক্ষ্য করে নানা বিদ্রুপাত্মক কথা বলতে লাগলেন। আমাকে আমার বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করতে হলো।"
"আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। সত্যি সত্যি দৌড়িয়ে তাস অফিসে ঢুকলাম। বসের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে বললাম, আমি ভয় পাচ্ছি যে তারা আমার নিন্দা করবে, আর তার পর আপনি আমাকে বরখাস্ত করবেন। আমাকে হয়তো গ্রেফতারও করা হতে পারে। আমি আসলেই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
"তারা বললো, দেখা যাক। আমরা যা করতে পারি করবো। তারা তাই করেছিল। কিন্তু পার্টির লোকেরা সত্যি ঘটনা জানতে চাইছিল না। সোভিয়েত নেতারাও চাইছিল না।"
ফলে যুদ্ধ চলতেই থাকলো। প্রথম ছয় মাস, তার পর এক বছর, দুই বছর, চার বছর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল-তার বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠলো আফগানিস্তান।
মস্কো আর আমেরিকা উভয়েই তাদের প্রক্সিদের দিয়ে এ যুদ্ধ চালাতে লাগলো। বানের জলের মতো অস্ত্র ঢুকতে লাগলো আফগানিস্তানে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৮৫ সাল নাগাদ নতুন নেতা হলেন মিখাইল গরবাচেভ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এ যুদ্ধে কোনোদিনই জয় আসবে না। যুদ্ধে নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের মৃতদেহ যেভাবে ব্যাগে ভরা অবস্থায় প্রতিনিয়ত দেশে ফিরে আসছিল তা আর মানুষের কাছে গোপন রাখা যাচ্ছিল না।
এর কিছু দিন আগেই ভিরোস্লাভ ইসমাইলভ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আর ১৯৮৫ সালেই তাকে পাঠানো হলো আফগানিস্তানে।
"আমরা উড়োজাহাজে করে কাবুল গেলাম। মনে আছে, খুবই নোংরা একটা শহর। আমরা পৌঁছানোর পর একজন সিনিয়র অফিসার একটা বক্তৃতা দিলেন।"
"এর পর আমরা সিগারেট খেতে বেরুলাম। তখন সেই অফিসার বললেন, বুঝলে, আমরা যেভাবে এই যুদ্ধ চালাচ্ছি তাতে আমাদের ছেলে বা নাতিদেরও যখন সৈনিক হবার বয়েস হবে, তখনো এ লড়াই চলতে থাকবে।"
"তার কথা শুনেই আমি প্রথম বুঝলাম যে ব্যাপারটা মোটেও ভালোভাবে চলছে না। আমাদের যা বলা হয়েছিল, তার চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র পেলাম এখানে।"
"পর দিন একটা সামরিক কনভয়ে করে যাচ্ছিলেন ভিরোস্লাভ। পথে দেখলেন, একজন আফগান একটা ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছে- তাতে ভর্তি তরমুজ।"
"আমাদের একজন অফিসার ট্রাকটা থামালেন। তার পর সেখান থেকে তরমুজ নামিয়ে তা ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগলেন সৈন্যদের দিকে। অন্তত ২০-৩০টা। আর সেই আফগান ট্রাকচালক, সে বসে বসে কাঁপছিল। আর বলছিল, দয়া করে আর নেবেন না, আর নেবেন না। এগুলো বেচেই আমার সংসার চলে।"
আমার মনে আছে, সে মুহূর্তেই আমার মনে হলো, আমরা এ দেশে শান্তি স্থাপন করতে আসিনি। আমরা আসলে দখলদার। কারণ দখলদাররাই এই আচরণ করতে পারে।"
ভিরোস্লাভের বাহিনীর যে ভূমিকা ছিল তা রণাঙ্গণে নয়। তাদের কাজ ছিল কাবুল থেকে চারশ কিলোমিটার দূরের কান্দাহারে রসদপত্র নিয়ে যাওয়া।
"আমাদের যেতে হতো পার্বত্য পথ দিয়ে। দিনের আলো ফুটতে না ফুটতে আমরা যাত্রা শুরু করতাম। আমাদের রাতে ভ্রমণ করার অনুমতি ছিল না। তবে কখনো কখনো তা-ও করতে হতো।"
"সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ ছিল কান্দাহার যাওয়া। পথে একটা শস্যের গুদাম পড়তো। সেটা পার হলেই শুরু হতো গুলি।"
"কান্দাহারে আমাদের যে বাহিনী তারা আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা গুলি খেতাম। তখন আমরা একদিনের বিশ্রাম পেতাম। কিন্তু তার পরই আবার যাত্রা শুরু করতে হতো।"
"আমার ওপরে ছিল ৪০০ লোকের দায়িত্ব। তাদের বয়স ১৮ বা ১৯-এর মতো। তাদের খাওয়ানো, কেউ আহত হলে তাদের দেখাশোনা, তাদের অস্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটা দেখা- সবসময়ই আমার এগুলো নিয়েই ভাবতে হতো।
কিন্তু তার মধ্যেও তারা জানতে পেতেন যে, চারপাশে কী হচ্ছে। বেসামরিক লোকদের ওপর বোমা পড়ছে, তারা মারা যাচ্ছে, নানা জায়গায় মাইন পাতা হচ্ছে- সব কিছুই।
"নিশ্চয়ই, আমরা সবই জানতাম। কখন আমাদের সৈন্যরা আফগানদের ওপর আঘাত হানছে, আমাদের উড়োজাহাজ থেকে কোনো হাসপাতাল বা গ্রামের ওপর বোমা পড়ছে, এরকম নানা কিছু। এগুলো ছিল 'কোল্যাটেরাল ড্যামেজ' বা যুদ্ধকালীন যেসব ক্ষতি এড়ানো যায় না সেরকম ব্যাপার।"
"কখনো কখনো তারা আমাদের দু-চারদিনের জন্য কান্দাহারের বাইরে নিয়ে যেত। কারণ তখন উড়োজাহাজ থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে, রাস্তা বন্ধ। কিন্তু কী করা যাবে! এটা তো একটা যুদ্ধ, যা আমরাই শুরু করেছি। আমাদেরকেই এটা শেষ করতে হবে।"
"কিন্তু যা মেনে নেওয়া সবচেয়ে কঠিন হতো তা হলো, নিহত প্রতি চারজন সোভিয়েত সৈন্যের মধ্যে একজনই শত্রুর হাতে নিহত হতো না। তারা নিজ পক্ষের গুলিতেই মারা যেতো, কেউ বা আত্মহত্যা করতো।"
"কোনো ক্ষেত্রে হয়তো যুদ্ধে খারাপ কিছু হলো, কোথাও বা কোনো পাইলট মদ খেয়ে উড়োজাহাজ চালাতে গেল এবং তা বিধ্বস্ত হলো- বা অন্য বিমানের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো, এভাবেই মারা যেতো অনেকে। আমাদের অফিসাররা আমাদের বীরত্বের কথা বলতেন, কিন্তু আসলে আমাদের শত্রু ছিলাম আমরাই।"
"আমার লোকদের মধ্যে একটি ছেলে আত্মহত্যা করেছিল। সে তার বন্দুক রেখে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা গ্রেনেড। পরে আমরা তার ছিন্নভিন্ন দেহটা পেয়েছিলাম। সে একটা নোটে লিখে গিয়েছিল, 'আমি একটা কাপুরুষ, আমার মতো লোকের বেঁচে থাকা উচিত নয়। আমার মাকে বলবেন- আমি বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছি।' সেই কথাগুলো এতদিন পরও আমার মনে আছে।"
১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার শেষ হয়। আফগানিস্তানে ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্য এবং দশ লাখ আফগান মারা যায়।
এর দুই বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নই বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ইসমাইলভ এখন সামরিক বিশ্লেষকের কাজ করেন। আর অস্টারস্কি পরে বিবিসিতেও কাজ করেন। এখন তিনি থাকেন ইংল্যান্ডে।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]