আফ্রিকান জেব্রা যশোরে কোথা থেকে কীভাবে এলো

আপডেট: 02:49:06 10/05/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : আফ্রিকার প্রাণী জেব্রা। সুদূর বাংলাদেশের একটি জেলা যশোরে এই প্রাণীর উপস্থিত যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। জনমনে প্রশ্ন জাগছে সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে যশোরের একেবারে সীমান্তবর্তী খাটালে এই প্রাণিগুলো কীভাবে আনা সম্ভব হলো?
বাংলা ট্রিবিউন তার একটি রিপোর্টে বলছে, ধারণা করা হচ্ছে, ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে এই জেব্রাগুলো যশোরে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে পাচার হওয়ার আগেই গোয়েন্দা পুলিশ সেগুলো উদ্ধার করে।
গোয়েন্দা পুলিশ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া জেব্রাগুলো আফ্রিকান প্রজাতির। পাচারের নেপথ্যে বাণিজ্যের পাশাপাশি সৌন্দর্য্য বাড়ানোর জন্যও সৌখিন ব্যক্তিরা অবৈধভাবে নিজের কাছে রাখার জন্য জেব্রাগুলো সংরক্ষণ করতে পারে।
গত মঙ্গলবার (৮ মে) রাতে জেব্রাগুলো আটকের পর কোন পথে, কীভাবে, কারা এই প্রাণীগুলো যশোরে নিয়ে এসেছে, তা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশ। যশোর জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার এসআই মো. মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে জানতে পারি— কিছু জেব্রা ভারতে পাচারের জন্য সীমান্তের খাটালে মজুদ রাখা হয়েছে। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলে ৫-৬ জন পাচারকারী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়।’
টার্কিশ এয়ারলাইন্সের কার্গো বিমানে করে নয়টি জেব্রা ঢাকায় আনা হয়। আর সেখান থেকে দুটি খাঁচায় করে যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়ার সাতমাইল এলাকার একটি গরুর খাটালে এনে রাখা হয় বলে মনে করছেন এস আই মুরাদ।
তার ভাষ্য— ‘আমরা জেব্রাগুলো উদ্ধারের সময় দুটি খাঁচা পেয়েছি। এই খাঁচার ওপরে একটি টার্কিশ সিল ছিল। যা থেকে বোঝা যায়, জেব্রাগুলো তুরস্ক থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। এরপর ঢাকা থেকে খাঁচায় করে এখানে নিয়ে আসা হয়। তবে এই তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।’
উদ্ধার হওয়া জেব্রাগুলোর মধ্যে একটি মৃত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া জেব্রাগুলোর মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। মোট নয়টা জেব্রার মধ্যে একটি জেব্রা মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। বাকি আটটি খুলনা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’ 
গরুর খাটাল থেকে বিদেশি প্রাণী উদ্ধারের ঘটনায় যশোর শার্শা থানায় বুধবার (৯ মে) একটি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় খাটালের মালিক মো. তুতু (৪০), বেনাপোল পোর্ট থানা এলাকার মো. মুক্তি (৪৫), নরসিংদী পলাশ উপজেলার রানা ভূঁইয়া (২৮), বগুড়ার আদমদিঘীর আমরুজ্জামান বাবুসহ (৩২) পাঁচ থেকে ছয়জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে নয়টি জেব্রার আনুমানিক মূল্য বলা হয়েছে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা।
তবে উদ্ধার করা জেব্রাগুলোর অর্থমূল্য থাকলেও এর পেছনে দৃশ্যত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রব মোল্লা। তিনি বলেন, ‘এসব জেব্রা সাধারণত আফ্রিক অঞ্চলে পাওয়া যায়। আফ্রিকান কিছু উপজাতি ছাড়া সারাবিশ্বে জেব্রার মাংস কেউ খায় না। এছাড়া, জেব্রার শরীরের কোনো অংশ দিয়ে ওষুধ বা অন্যকিছুই তৈরি হয় না।’
ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণের জন্য এই জেব্রাগুলো আনা হতে পারে বলে ধারণা করছেন এই প্রাণিবিদ। তার ভাষ্য— ‘চিড়িয়াখানায় রেখে প্রদর্শন করা বা ব্যক্তিগতভাবে নিজের সংগ্রহে রাখার জন্য এগুলো আনা হতে পারে। এছাড়া, জেব্রার আর তেমন কোনো ইউটিলিটি নেই।’
একটি মৃতসহ নয়টি জেব্রা খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিগগিরই গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে জেব্রাগুলোকে উন্মুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান।
এদিকে, বিবিসি এক রিপোর্টে জানায়, বন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, দেশের বাইরে থেকে আনার পথে ক্লান্তির কারণে একটি জেব্রার মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ বলছে, ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসব জেব্রা আনা হয়েছিল বলে তাদের জোর সন্দেহ। এই ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
যশোরের গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন, "এগুলো ঢাকা থেকে এসেছে। বড় লোহার খাঁচায় করে ট্রাকে সেগুলোকে আনা হয়। গ্রামের একটি খাটালের ভেতরে সেগুলো রাখা হয়েছিল।কিন্তু ওই এলাকার আশেপাশের বাড়িঘরের লোকজন দেখে পুলিশে খবর দিলে রাতেই আমরা সেখানে যাই।"
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, রাতে সেখানেই রাখা হয় জেব্রাগুলো।
"এ ধরনের প্রাণী হ্যান্ডেল করে আমরা অভ্যস্ত না। তাছাড়া খাঁচাও অনেক ভারি। ফলে সকাল বেলা খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগে খবর দেওয়া হয়," বলেন ওসি মনিরুজ্জামান।
তিনি আরো জানান, ওই এলাকাতে এর আগে সিংহ শাবক এবং বাঘও উদ্ধার করা হয়েছিল। সেগুলো ঢাকা থেকে পরিবহন করে আনা হয়েছিল ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে।
এই ঘটনার সঙ্গে একই গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।
যশোরের বন কর্মকর্তা সরোয়ার আলম খান বলেন "এগুলো অবশ্যই বাইরের দেশ থেকে এসেছে। কার্গো বিমান বা জাহাজযোগে এসেছে মনে হচ্ছে। এগুলো আফ্রিকার জেব্রা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।"
একটি জেব্রা মারা যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে বন কর্মকর্তা মি. খান বলেন, সাধারণত দুটি কারণে এসব জেব্রার মৃত্যু হতে পারে। যদি কোনো রোগ থাকে অথবা জার্নি শক বা ভ্রমণ ক্লান্তির কারণে মারা যেতে পারে।
বাংলাদেশে এভাবে জেব্রা উদ্ধারের খবর এর আগে শোনা যায়নি বলেও তিনি জানান। দেশে এধরনের প্রাণীর খামার নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
"আমার জানা মতে, বাংলাদেশে জেব্রার কোনো খামার গড়ে ওঠেনি। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখন কোর্টে মামলা যাবে। আদালত এরপর বন বিভাগের জিম্মায় দিলে জেব্রাগুলো সাফারি পার্ক বা চিড়িয়াখানায় পাঠানো হবে।"
জার্নি শক বা ভ্রমণ ক্লান্তি থাকায় জেব্রাগুলোর বিশেষ যত্নের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন এই বন কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, পানি ও ঘাস দিয়ে এগুলোকে চাঙ্গা রাখা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ফ্যানের বাতাস দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রাণীগুলো খুব ক্লান্ত, বিশেষ যত্ন দরকার। নাহলে আরো মারা যেতে পারে।
মাঝারি আকৃতির এসব জেব্রা 'সাব-অ্যাডাল্ট' বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ এগুলো আরো বড় হবে।
এধরনের একেকটি জেব্রার মূল্য দশ লাখ টাকার কম হবে না বলে অভিমত এই বন কর্মকর্তার।

আরও পড়ুন