আমেরিকান সুপারম্যান বনাম জেরুজালেমের পাথর-বালক

আপডেট: 02:14:31 22/12/2017



img

ফারুক ওয়াসিফ

শৈশবে টেলিভিশনে দুই হিরোকে খুব দেখতাম, সুপারম্যান ও ইয়াসির আরাফাত। এইজন আমেরিকার শক্তিমত্তার হলিউডি প্রতীক, ওইজন ফিলিস্তিনের সংগ্রামের নায়ক। কোমরে ল্যাঙ্গট আর পেছনে কেপ ঝোলানো সুপারম্যান দুর্ধর্ষ। মাথায় কেফিয়াহ পরা ইয়াসির আরাফাত ছত্রভঙ্গ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াইয়ে নামানোর নায়ক। আমার ছোট মনে বড় আশা জাগত, ফিলিস্তিনিরা যদি এ রকম একজন সুপারম্যান পেত? আরাফাত যদি কোনোভাবে সুপারম্যানের ক্ষমতা পেতেন, তাহলে তো ইসরায়েলকে এমন মার দিতেন...
বড় হতে হতে বুঝলাম, সুপারম্যান কখনো ফিলিস্তিনিদের হবে না, যেমন র্যাম্বো কখনো ভিয়েতনামি বা আফগান ছাড়া মারত না। যার কিছু নেই, তার আশা থাকে। আমাদের আশা ছিল একদিন নিশ্চয়ই সত্যের জয় হবে। যেভাবে বাংলাদেশ ইয়াহিয়ার ঘাতকদের পরাজিত করেছিল, সেভাবে ফিলিস্তিনও জায়নবাদী সেনাদের হারাতে পারবে বলে ভাবতাম। ফিলিস্তিনি লেখক রামজি বারুদ লিখেছিলেন, ছোটোবেলায় তিনিও স্বপ্ন দেখতেন একদিন আরব সেনারা সীমান্ত উজিয়ে এসে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে। তারা এসেছিল ঠিকই—১৯৪৮-এ, ১৯৬৭তে। কিন্তু নিজেদের অনৈক্য নিয়ে ইসরায়েল-ইউরোপ-আমেরিকার ঐক্যের মুখে পরাজিত হয়েছে। এখনো অনেক মুসলমান তরুণ আশা করেন, সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করে জেরুজালেম উদ্ধারকারী সালাহদিন আইয়ুবির মতো কোনো বীর মুসলমানদের সম্মান ও ভূমি ফিরিয়ে আনবেন। সেই আশার গুড়ে এখন শুধু বালি নয়, প্রমাণ সাইজ পাথর।
পাথরের মতো অটুট এই হতাশা। সেই পাথরই হাতে তুলে নিয়েছে হতাশ ফিলিস্তিনি কিশোর-তরুণেরা। জর্জ বুশ ইরাককে বোমা মেরে প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠানোর হুমকি দিয়েছিলেন। কথাটা পুরো মিথ্যা হয়নি। হাতে পাথর ছাড়া ফিলিস্তিনিদের আর কিছু নেই। যে আরব ও মুসলিম জনতা দেশে দেশে ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণার প্রতিবাদ করছে, তাদের হাতও ফাঁকা। যেসব দেশের রাজধানীতে তারা চিৎকার করছে, সেসব দেশের রাজা-বাদশা-প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্টরাও পাথরের মতো নিরাবেগ, অচল এবং নিষ্ফলা। দেশ, জাতি, উম্মাহ বা মানবতার প্রতি নয়, তাঁদের আনুগত্য পরাশক্তির প্রতি। যাঁরা দেশবাসীকে ভয়ের শাসনে রাখেন, তাঁরাই জাতীয় ঐক্য ও সংকল্পকে ভয় পান। পুতুপুতুচিত্তে পরাশক্তির সুপারম্যানদের কুর্ণিশ করে চলাতেই তাঁদের ইহজন্মের সার্থকতা। তাই ওআইসিতে ও জাতিসংঘে ট্রাম্পের ঘোষণার বিরোধিতার ফল শূন্য। কথায় চিড়া ভিজবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ জেরুজালেমকে সম্পূর্ণতই ইসরায়েলের করে দিয়েছেন। আরও আরও ফিলিস্তিনি জমিতে ইসরায়েলি জবরদখলে মদদ দিচ্ছেন। সর্বশেষ তিনি হুংকার দিয়েছেন, যেসব দেশ জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের তিনি দেখে নেবেন। এমনকি সাহায্যও বন্ধ করে দেবেন। এক ডলার সাহায্য দিয়ে বহু ডলার ফায়দা লোটা বন্ধ হলে ক্ষতি আমেরিকারই। সে যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেশে দেশে মোসাহেব নেতাদের দিয়ে ওই সব দেশের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে মার্কিন স্বার্থ হাসিল করে; তা এমন খোলাখুলি জানানোর জন্য ট্রাম্প সাহেবকে ধন্যবাদ। ইসরায়েলকে দেওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্যের অঙ্ক আরও বাড়ালেও কার কী বলার থাকতে পারে। কারণ তিনিই তো আমেরিকার নতুন সুপারম্যান আর ইয়াসির আরাফাতের সন্তানদের হাতে তো শুধুই পাথরের ঢিল।
ইতিহাস বড় লীলাময়। বাইবেলে ইহুদি কিশোর ডেভিডের সঙ্গে ফিলিস্তিনি বীর গোলিয়াথের লড়াইয়ের কথা আছে। কৌশলে ডেভিড হারিয়ে দিয়েছিল গোলিয়াথকে। আজ ফিলিস্তিনি কিশোর-তরুণেরাই যেন ডেভিডের ভূমিকায়। আর ইসরায়েল হলো আধুনিক গোলিয়াথ। কোনো আরব রাষ্ট্রনেতা নন, ওই সব কিশোরই ফিলিস্তিনের মর্যাদা আর ইয়াসির আরাফাতের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছে। এটুকুই সান্ত্বনা।
শুধু এটুকুই? অনন্তকাল পাথর ছুড়ে গেলেও ইসরায়েলের বর্মে আঁচড়ও লাগবে না, তাদের বানানো বর্ণবাদী দেয়ালের একটা ইটও খসবে না। আরবদের সঙ্গে যা খুশি তা করা চলতেই থাকবে, কারণ তাদের সরকারগুলো তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। পাশ্চাত্য আরবকে অবিরত তছনছ করে যেতে পারছে এ জন্যই যে আরবদের তারা গোনে না। গুনত, যদি সালাহদিন আইয়ুবির সময়কার মতো ঐক্য আসত। সেই সময়কার মতো উন্নত সভ্যতা তারা লালন করত। অথচ আইয়ুবির বংশধর যে কুর্দি জাতি, তারা আজ ইরাক-সিরিয়া ও তুরস্কের অধীন এবং পশ্চিমাদের দাবার ঘুঁটি। আরব শাসকেরা শাদ্দাদের বালাখানা বানিয়ে নিজ নিজ দেশে মার্কিন-ইসরায়েলের পাহারাদারি করে যাচ্ছেন। যারা নিজেরাই মুক্ত নয়, তারা কীভাবে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে? কোনো জাতি নিজেদের মুক্ত করে প্রগতি ও গণতন্ত্রের পথে যাওয়ার সংকল্প না করলে তাদের ভেতর থেকে মুক্তিকামী নেতার আগমন ঘটে না। তাই সালাহদিন, খেলাফত কিংবা সুপারম্যানের আশা না করে আরবসহ মুসলিম দুনিয়ার উচিত সবার আগে নিজেদর সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্যায় ও দুঃশাসনমুক্ত করা। ইসরায়েলের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের মুক্তি আর স্বৈরতন্ত্রের হাত থেকে অধিকাংশ আরব ও মুসলিম দেশের মুক্তি পরস্পরের পরিপূরক। স্বদেশের দুঃশাসন নিয়ে চুপ থেকে বিদেশির জুলুমের প্রতিবাদ করায় তাই কোনো লাভ নেই।
শিগগির এই পরিস্থিতি বদলাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিরাপত্তা নীতি, অভিবাসন নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্টভাবেই আরব ও মুসলিম বিরোধী। নতুন বছর তাই ফিলিস্তিন ও আরবের আরও বিপদ বয়ে আনবে। দখলাধীন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে বাস্তবায়নের চেষ্টা আরও এগোবে। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্ন, তার মানে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথও বন্ধ হবে। তাহলে কি এক রাষ্ট্র সমাধান, অর্থাৎ ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমির সব আরব ইসরায়েলের অধীনে চলে যাবে? সেটাও হওয়ার নয়। সীমান্ত বাড়াতে বাড়াতে জর্ডান নদী থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত (ফিলিস্তিন, মিসর, সিরিয়া ও জর্ডানের বিস্তীর্ণ এলাকা) সাম্রাজ্য কায়েম করলেও নিরাপদ হবে না ইসরায়েল। বর্তমান ইসরায়েলের মতো সেখানেও আরবরাই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এত বিপুল মানুষকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী কায়দায় কিংবা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কায়দায় দাবিয়ে রাখা সম্ভব না। আবার গণতান্ত্রিকভাবে আরবদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার দিলে ইসরায়েলের নেসেট (সংসদ) অচিরেই আরবপ্রধান মজলিশে পরিণত হবে। সেটাই হবে জায়নবাদী ইসরায়েলের (শুধু ইহুদিদের আবাসভূমি) পরিসমাপ্তি। সুতরাং ইসরায়েল এক রাষ্ট্র বা দ্বিরাষ্ট্র কোনো সমাধানই হতে দেবে না। তারা চালিয়ে যাবে অনন্ত যুদ্ধ, চেষ্টা করবে সব আরবকে দেশান্তরী করে দিতে। লাগাতার গণহত্যা ছাড়া সেটাও সম্ভব হওয়ার না। সুতরাং সংঘাত চলতেই থাকবে। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফিলিস্তিনি কিশোরেরা লড়তে লড়তে আরও মরিয়া হবে, আরব জনতা আরও অস্থির হবে, দুনিয়ার মুসলমানরা অপমান-লাঞ্ছনায় আরও বিক্ষুব্ধ হবে। হয়তো এ পথেই মেকি আরব বসন্তের বদলে সত্যিকার আরব জাগরণ ঘটবে। তা শুধু ইসরায়েল-আমেরিকার দোস্তালির বিরুদ্ধেই দাঁড়াবে না, নিজ নিজ দেশের বিশ্বাসঘাতক নেতাদের সঙ্গেও বোঝাপড়া করে নেবে।
এটা আশা নয়, ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম। কোনো জাতিকেই সুদীর্ঘকাল পদদলিত করে রাখা যায় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প পাহাড়ের ঢাল দিয়ে যে পাথর গড়িয়ে দিয়েছেন, তলায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তা থামবে না। পরিবর্তন কেবল মহান লোকের কর্মফলে হয় না, হিটলার কিংবা ট্রাম্পের মতো হঠকারী নেতাদের ভুলের দ্বারাও ইতিহাস ধাক্কা খেয়ে এগোয়। যখন গতির আশা নেই, তখন দুর্গতিই সম্ভাবনার বীজ বপন করে। দুর্গতির মধ্যেও সম্ভাবনা থাকে, অগতির মধ্যে থাকে কেবলই মৃত্যু। কমেডিয়ান থেকে সুপারম্যান বনে যাওয়া ট্রাম্প আর জেরুজালেমের পাথর-বালকেরা সম্ভাবনাময় দুর্গতিরই প্রতীক।
[ফারুক ওয়াসিফ : লেখক, সাংবাদিক। প্রথম আলো থেকে।]