আম, আমাদের প্রিয়তম ফল

আপডেট: 07:50:46 04/07/2017



img

আইয়ুব হোসেন

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আছে জাতীয় উদ্যানও। আর আমগাছ জাতীয় বৃক্ষ। আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণার পেছনে ফল আমের অবদানই বোধহয় বেশি। কারণ, আম খেতে ভালোবাসেন না, এমন বাঙালি কেন, ভিনদেশেরও কাউকে পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের অনুভূতির সঙ্গে আম ও আমগাছের সম্পর্ক আছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ব্রিটিশদের হাতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে যে বেদনার ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল, ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার শপথ নেয় এই আম্রকাননে। আমাদের জাতীয় সংগীতে আছে '...ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে, ঘ্রাণে পাগল করে...'। এখানে আমগাছের উপস্থিতি দেশপ্রেমের অনুষঙ্গ হিসেবে। এটা আমাদের সৌভাগ্য যে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেনি। আমের সুখ্যাতি ও প্রয়োজনীয়তা নূতন করে বলার প্রয়োজন নেই।
আমাদের দেশে আমের বনজ প্রজাতি রয়েছে। সে অর্থে আমরা আমের আদি মালিক। আমগাছ চিরসবুজ, সুদর্শন ও দীর্ঘজীবী। আম আমাদের সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। আমপাতা হিন্দু ও বৌদ্ধরা ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চায় বহুলভাবে ব্যবহার করে। আম আমাদের সাহিত্য ও লোকগাথায় নিবিড়ভাবে যুক্ত। পৃথিবীর অনেক দেশেরই জাতীয় বৃক্ষ রয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা ও জার্মানির জাতীয় বৃক্ষ হচ্ছে ওক গাছ। কানাডার ম্যাপল, ভারতের বট, পাকিস্তানের সেড্রাস ডিওডর, শ্রীলঙ্কার নাগেশ্বর, ভুটানের সাইপ্রেস, সৌদি আরব, লেবানন, আফগানিস্তান, ইতালি, নরওয়ে ও সুইডেনের খেজুরগাছ, লেবাননের সেডার এবং কিউবার জাতীয় বৃক্ষ কিউবান রয়াল পাম।
আম ও আমগাছের ইতিহাস সম্পর্কে দু'চার কথা বলা যাক।
আম অতি প্রিয় ফল এবং একে 'ফলের রাজা' বলে অভিহিত করা হয়েছে অনেক আগে। মুঘল সম্রাট বাবর একে ভারতবর্ষের সর্বোৎকৃষ্ট ফল বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের ছাপা কাপড়ে যে জাঁকজমকপূর্ণ নকশা তাতেও আমের ছবি থাকে। যেসব দেশে এই ফলটি রপ্তানি হয়, সেখানেও এ ফল বিশেষ সমাদৃত। অবশ্যই, যারা শৈশব থেকে এর সঙ্গে পরিচিত তারাই এটি অনেক বেশি উপভোগ করেন।
আম প্রাচীনতম ফলগুলির অন্যতম। খ্রীষ্টপূর্ব যুগেই ভারতে এর স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আমের চাষ শুরু হয়েছে প্রায় চার হাজার থেকে ছয় হাজার বছর পূর্বে বলে অনুমান করা হয়। রামায়ণ ও মহাভারতেও আম্রকানন ও আম্রকুঞ্জের উল্লেখ আছে। হিন্দু সম্প্রদায় একে উচ্চ মর্যাদা দেন। দেবী সরস্বতীর পূজার উপকরণ হিসাবে আম্রমুকুল ব্যবহার করা হয়। যে কোনো শুভ অনুষ্ঠানে প্রবেশদ্বারে মাঙ্গলিক চিহ্ন হিসাবে আম্রপল্লব ঝোলানো হয়। আমাদের মানসিকতায় যুগ যুগ ধরে আম বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে এবং একে কল্পবৃক্ষ বা ইচ্ছাপূরক বৃক্ষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সাধারণ বাংলায় এর নাম হল আম। 'আম' শব্দের অর্থ সাধারণ। এটি কেবলমাত্র সাধারণ ফল নয়, এটি সাধারণ মানুষেরও ফল।
সংস্কৃত সাহিত্যে এর নাম 'আম' এবং এই শব্দটি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর বিশিষ্টতম বোঝাবার জন্য এবং সম্মান প্রদর্শনের জন্য প্রত্যয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কালিদাস তার 'মেঘদূত' নামক সংস্কৃত কাব্যে একটি পর্বতের নাম দিয়েছেন আম্রকূট। বৈয়াকরণ পাণিনির রচনায় আম্রগুপ্ত নামক ব্যক্তি এবং আম্রপুর নামক নগরীর উল্লেখ আছে। আম্রপাল নামে রাজা ও আম্রপালী নামে বারবণিতাও ঐতিহাসিক চরিত্র। অনেক গাছকেও মর্যাদা দেবার জন্য আম্রগন্ধক, আম্রনিশা ও আম্রগন্ধির হরিত্র প্রভৃতি নাম দেওয়া হয়েছে। কাঞ্চীর মন্দিরও প্রাচীন যুগে আমের ধর্মীয় মর্যাদার সাক্ষ্য দেয়।
শৈব সাহিত্যে লিঙ্গকে বলা হয়েছে আম্রতাকেশ্বর। বৈদিক যুগেও আমের প্রাধান্য ছিল। বাল্মীকির মহাকাব্য রামায়ণেরও বহু শ্লোক আমের প্রশস্তিতে পূর্ণ। প্রেমার্ত হৃদয়ে আম্রমুকুলের সৌরভ যে বেদনা সৃষ্টি করে তার বর্ণনা বহু লোকগীতিতে স্থান পেয়েছে। কবি কালিদাস আম্রমুকুলকে হিন্দুদের প্রণয় দেবতা মন্মথর পঞ্চশরের একটি শর বলেছেন। বৌদ্ধযুগে অমর সিংহ রচিত অমরকোষ গ্রন্থে এই রসাল ফলের একটি অবিস্মরণীয় প্রশস্তি লিপিবদ্ধ রয়েছে। ভারতীয় শিল্পকলাতেও আম একটি বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছে। খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০ সনে নির্মিত সাঁচীর বৌদ্ধ স্তূপের ভাস্কর্যে আম্রবৃক্ষ ও তার ফল দেখা যায়। এমন একটি ফল যা প্রায় প্রত্যেকেই উপভোগ করে। বেশি লোকে খায় রসালো জাতের আম। একসঙ্গে বারোটি আপেল খাবার কথা কেউ ভাবতেই পারে না, কিন্তু যে আম ভালোবাসে সে সানন্দে একবেলার খাওয়া বাদ দিয়ে ৫ পাউন্ড আম চুষে খেয়ে নিতে পারে। আম থেকে নানা ধরনের আচার, মোরব্বা, আমচুরও প্রস্তুত করা হয়।
আম গাছের কিছু কিছু ভেষজ মূল্যও আছে বলে ধরা হয়। পাকা আম মেদ বাড়ায় এবং এটি মূত্রনিঃসারক ও রেচকগুণ সম্পন্ন। পোড়া আমপাতার ধোঁয়া হিক্কা এবং কিছু কিছু গলরোগ নিরাময় করে। আঁটির শাঁস উদরাময় ও হাঁপানিতে কার্যকর। পোড়া আমের মন্ড চিনি দিয়ে কলেরা ও প্লেগাক্রান্ত রোগীদের দেওয়া হয়। আমগাছের ছাল থেকে রজন ও আঠা তৈরি হয়। পাড়া ফলের বোঁটার আগায় লেগে থাকা আঠা ও রজন পদার্থের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খোশপাঁচড়া প্রভৃতি চর্মরোগে ব্যবহার করা হয়। চামড়া পাকা করার জন্যও গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়। আম কাঠ নানা কাজে লাগে। ঘর তৈরি করতে এই কাঠ ব্যবহার করা যায়। তবে সব সময় যেন এ কাঠে জলের ছোঁয়া না লাগে, কারণ জল লেগে কাঠ ক্ষয়ে যেতে পারে। প্যাকিং বাক্স ও ঢাকঢোল তৈরি করতেও এর ব্যবহার হয়। গবাদি পশুর খাবার হিসাবে আমপাতা ব্যবহৃত হয়। এইভাবে ভারতে আমগাছকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়।
আমের উৎপত্তি স্থান নিয়ে কিছু সংশয়ের অবকাশ আছে। আম 'ম্যাঙ্গিফেরা' নামে যে প্রজাতির অন্তর্গত সেটি ভারতের পূর্বদিকের দেশগুলোর কোনো একটিতে উৎপন্ন হয়। যাহোক, আম সম্ভবত, ব্রহ্মদেশ-সংলগ্ন ভারতেরই কোনো অংশে প্রথম উৎপন্ন হয়েছিল। অন্যান্য ভাষায় এই ফলের যেসব নাম পাওয়া যায়, যেমন ইংরেজীতে ম্যাঙ্গো, মালয় ও জাভায় ম্যাঙ্গা বা ম্যাঙ্গ গা চীনা ভাষায় ম্যাংক-কাও ইত্যাদি। সেগুলো মনে হয় তামিল নাম ম্যাংকে বা ম্যাঙ্গে থেকে এসেছে। এর ইংরেজী নামটি বোধহয় পর্তুগীজদের মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছে।
ভারতবর্ষে অতি প্রাচীন কালেই আম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৭ সনে ভারত আক্রমণের সময় আলেকজান্ডার দি গ্রেট-এর সেনাবাহিনী সিন্ধু-উপত্যকায় আমের প্রচলন দেখেছিল। এটি এখন মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে একটি সাধারণ ফল। ব্রাজিল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ার কুইনসল্যান্ড প্রভৃতি দেশেও আম চাষ শুরু হয়েছে। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দের আগেই আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে এবং ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই আম জন্মায়। আমাদের দেশে বাগান, বাড়ির উঠোন বা রাস্তার ধারে বা মাঠের সীমানায় বিচ্ছিন্নভাবে অনেক আমগাছ জন্মায়। এগুলোর হিসাব রাখা খুব কঠিন। সার দেওয়া, জলসেচ বা গাছের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বাড়তি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। কাঠের জন্য বা অন্যান্য কারণে প্রায়ই পুরনো গাছগুলোকে কেটে ফেলা হচ্ছে এবং তাদের জায়গায় যে নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে সেগুলো অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রোপণ করা হচ্ছে ও সেগুলোর দেখাশোনাও করা হয়।
যেসব জায়গায় মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩০ ইঞ্চি থেকে ৭৫ ইঞ্চি সেখানে কোনো জলসেচ ছাড়াই বা সামান্য জলসেচ করলেই আমের ফলন ভালো হয়। যথেষ্ট সেচ দিলে শুকনো অঞ্চলেও আম হতে পারে। যদি ফুল ধরার বা ফল পাকার সময়ে না হয়, তাহলে বেশি বৃষ্টিতেও অসুবিধা হয় না। বিশেষ করে ফুল ধরার সময়টিই বেশি জরুরি। এই অঞ্চলে অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে কিন্তু পরিণত ফলগুলোর কিছুটা ক্ষতি হয়। ফল পাকবার সময় ঝোড়ো বাতাস বইলেও ফল নষ্ট হয়, কারণ এই বাতাসে অনেক ফল পড়ে যায়।
ভারতবর্ষে প্রচুর জাতের আম ফলে। এখানে আমের বড় বেশি বৈচিত্র্য দেখা যায়। ব্যবসা করা হয়, এমন জাতের আমের সংখ্যাই এক হাজারের ওপর বলে অনুমান করা হয়। এইসব জাতের আমের একেকটি বীজ (আঁটি) থেকে স্বতন্ত্র মূল নিয়ে কয়েকটি চারা জন্মায়। এই চারা থেকে, যে গাছ হয় তা বৃক্ষ-মাতা থেকে আলাদা। অন্যান্য সমস্ত চারাই বৃক্ষ-মাতার অঙ্গজ উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়। এগুলো থেকে যে নতুন গাছ হয় তার ফল ঠিক তার বৃক্ষ-মাতার ফলের অনুরূপ। এই অবস্থায় বীজ থেকেই গাছ করা হয় এবং উদ্ভিজ্জ বংশবিস্তার দরকার হয় না।
অতীতে সাধারণত বীজ থেকে আম গাছের প্রসার ঘটত। পুষ্পরেণুর সংকর মিশ্রণের ফলে বীজ তৈরি হয় বলে, অর্থাৎ ফুলের স্ত্রীকোষের সঙ্গে অন্য গাছের পুংপরাগের মিলনের ফলে কোনো চারা থেকে যে গাছ হয় তা মূলত একটি নতুন জাতের গাছ হয়ে দাঁড়ায়। তারই ফলে নানা ধরনের উৎকৃষ্ট স্বাদের, রঙের ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বিচিত্র জাতের আমের বিরাট সমারোহ আমরা দেখতে পাই। গত দুশ' বছরের উদ্ভিজ্জ বংশবিস্তার এই নানা জাতের আমকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। এই সময় বাগান করা ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের একটি বিশিষ্ট শখ, তারাই নানাজাতের আমের বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছিল। এই ধরনের একটি উদাহরণ হলো বিহারের দ্বারভাঙ্গার কাছে 'লাখবাগ'। মুঘল সম্রাট আকবর এই বাগান তৈরি করেছিলেন এবং এখানে এক লক্ষ ধরনের গাছ আছে। ১৫৯০ সালে প্রকাশিত আকবরের স্মৃতিকথা আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে ভারতের আমের জাতি-বৈচিত্র্যের প্রথম বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়।
নার্সারীওয়ালারাও তাদের আমের নানা জাতের বিপুল সম্ভার দেখিয়ে ক্রেতাদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করে। নানা ধরনের আমে তারা নানা কাল্পনিক গুণাবলী আরোপ করে। এর ফলে কতকগুলো জাতের আমের আবার নানা নাম। যেমন, বোম্বাই-এর আলফনসো আমকে বিভিন্ন জায়গায় হাকুস, আফুস এবং বাদামি বলে অভিহিত করা হয়। পিটার, পিটার পসন্দ এবং পায়রি একই জাতের ফল; কালেক্টর, বাঙ্গালোরা ও তোতাপুরিও তাই। বঙ্গানপল্লি, বেনিশান, সফেদা ও চাপ্তা একই জাতের আমের বিভিন্ন নাম। গোপাল ভোগ, মোহন ভোগ, ক্ষিরসাপাতি, ফজলি ইত্যাদি নানা নামের এবং নানা জাতের আম আমাদের সকলকেই প্রলুব্ধ করে। আমের মওসুমের জন্য আমরা প্রতীক্ষায় থাকি।
আম আমাদের প্রিয় নয় কেবল, প্রিয়তম ফলই বটে।

ayubhoss@gmail.com