আশরাফ জুয়েলের গল্প

আপডেট: 02:47:00 10/03/2018



img

জাড়

আঙিনার ঠিক মাঝ বরাবর ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুত সংকোচন-প্রসারণের বিরতিতে দাঁড়িয়ে আছে ভাদু। ভাদু মণ্ডলের আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে রেখেছে তাঁর জীবনের চুয়াত্তরতম শীত। ভাদুও জীবনের অর্জিত সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে লড়ে যাচ্ছে মধ্য মাঘের আয়ু খেকো শীতের সঙ্গে। ইদানীং বয়সের ভারে মাঝেমাঝেই আপসের সম্মুখে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়তে বাধ্য হচ্ছে, যদিও কোনমতেই এই অমোঘ সত্যটাকে স্বীকার করতে রাজি না ভাদু। 
বাঁ পাশে ঘাড় ঘোরতেই গরু দুইটার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। শখ থেকে নয়— বরং গাঢ় একাকিত্বকে হার মানাতেই এই গরু পোষা। গত বাষট্টি বছরের অভ্যাস বাতিল করাও সহজ কাজ নয়— গরু দুইটা তার সন্তানের মতো, মেয়ে সন্তান। দুইজন যায়, দুইজন আসে।
‘হাম্বা হাম্বা’ ডাকে ভাদুর দৃষ্টি-কথার জবাব দেয় সকিনা আর সবেদা।
‘মাগে? ক্যামন আছেন? খুব জাড় পোড়্যাছে, না? আর কয়াকট্যা দিন সোহ্যা লে মা।’ আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে বাহু দুইটাকে বার কয়েক প্রসারিত করে ভাদু— তারপর ডান হাতের আঙুলের মধ্যে বাম হাতের আঙুলগুলোকে ঢুকিয়ে দিয়ে দুই হাতের তালুকে আকাশের দিকে মেলে ধরে হাত দুইটাকে মাথার উপর তোলে।
হঠাৎ চিরশত্রু শীতের মুখে শয়তানের প্রস্রাবসহ এক দলা থুথু ছিটিয়ে দেয়। উত্তরের অপেক্ষা না করেই দামুশের বিলের একরোখা বকের মতো লম্বা পা ফেলে হাঁটতে আরম্ভ করে। দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বালাতে তিনটা কাঠির আত্মত্যাগ দেখতে হয় তাঁকে। এবার দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বলে। নাসির বিড়ির ঠোঁটে দেশলাইয়ের চতুর্থতম কাঠির জ্বলন্ত বারুদ ঠুসে দিয়ে পৃথিবী ফুঁকতে ফুঁকতে এগোতে থাকে ভাদু।
নামোবাগান পার হলেই মেইন রোড। বাস-ট্রাকের অনবরত চোখ রাঙ্গানোকে মেনে নিয়ে রোডের ধারেই কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে চাটাই-বাঁশ দিয়ে বানানো কঙ্কালের উপর মরচে পড়া টিন দিয়ে বানানো একটা দোকানঘর। ভাদুর গন্তব্য আপাতত সেই পর্যন্ত।
‘কী জি কাকা? অ্যাতো পঁহ্যাতে কুণ্ঠে য্যাছো?’ কথাগুলো বলতে বলতে পাগলা নদীর দিকে দৌড়ের ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকে কাঁচু মাঝি। শব্দের উৎস-মুখের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না ভাদু। কথাগুলো ভাদু মণ্ডলের শ্রবণসীমা স্পর্শ করেছে কি না সেটা বুঝে ওঠার আগেই কুয়াশা-গহ্বরে অদৃশ্য হয়ে যায় কাঁচু মাঝি। খেয়া নৌকা না ছাড়লে পাগলার ওপারে চাষ করতে যাওয়া মানুষগুলো গালাগাল আরম্ভ করবে কাঁচু মাঝিকে। এই দৌড় তার জীবিকার তাগিদেও।        
নামোবাগানের কুয়াশার সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে অনেক কিছুই মনে পড়ে যায় ভাদু মণ্ডলের। এমনই এক কুয়াশাক্রান্ত শীত মৌসুমে ছাই পালার মতন আগুনে-আফসোসে ফেঁপে উঠছিল তাঁর মায়ের পেট। দাদির কাছে শোনা, জলাতঙ্কগ্রস্ত কুকুরের কামড়ের চাইতেও বিষাক্ত শীত পড়েছিল সেবার। মার পেটে থাকা নিরুপায় ভাদু— তার কষ্ট ঠিকই বুঝেছিল, কিন্তু কিছু করার সামর্থ্য তখনও তার হয়নি। অবশ্য পরেও আর কোনোদিনই মা’র জন্য কোনো কিছু করতে পারেনি সে। ভাদুর দুনিয়ায় জমাট বাঁধা মাড়ের মতন নৃশংস শীত ঢেলে দিয়ে, তাঁর জন্মের কিছু সময়ের মধ্যেই মায়ের বায়ুথলির বাতাসকে বরফ খণ্ডে পরিণত করে দিয়েছিল সেবারের শীত। এ কারণে জন্মের পর থেকেই ভাদুর চিরকালীন শত্রু হয়ে ওঠে মাঘ মাসের শীত।
‘মোনে হোছ্যে লোকা আর শীশে কাজিয়া ল্যাগ্যা য্যাবে জি দাদো।’ ফজরের হাত থেকে মাত্রই মাফ পেয়েছে সদ্য ডিম-ফাটা মুরগির বাচ্চার মতো বৃহস্পতিবারের ভোর। নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে কুয়াশার লেপে।
‘বালের ভোট! তোর খবর কী সেট্যা কহা? যে জাড় পড়্যাছে, শা...লা।’ মদুলের দিকে তাকিয়েই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেও মদুলকে দেখতে পায় না ভাদু মণ্ডল। এই তীব্র শীতে সে অতিরিক্ত একটা শব্দও খরচ করতে রাজি না।
ঘুঁটার ছাই দিয়ে মাজা পরিষ্কার দাঁতের হাসির রশ্মি ছড়িয়ে তিন পায়া মাটির চুলার উপর বসে আছে কেটলিটা। ইবাদতের একাগ্রতায় চুলার পাছায় তিনটা ঘুঁটাকে অনবরত ঠেলে যাচ্ছে মদুল। তার হাতে ছিদ্রযুক্ত ছিপি দিয়ে শক্ত করে আটকানো একটা এক লিটারের স্প্রাইটের বোতল— কেরোসিন ভর্তি থাকার কারণে সেটা নীলচে রঙ ধারণ করেছে। মদুল মাঝে মাঝে মিলাদে গোলাপ জল ছিটানোর মতো করে কেরোসিন ছিটিয়ে দিচ্ছে ঘুঁটাগুলোর উপোষ মুখে। কেরোসিনের ছিটা পাওয়ামাত্রই ঘুঁটাগুলো হেসে উঠছে সদ্য বিয়ে হয়ে শ্বশুরালয়ে আসা কিশোরী বধূর মতো— পরক্ষণেই এক অজানা আশঙ্কায় সেই হাসি নিভেও যাচ্ছে।
‘দাদো, সাব্জাদ কাকার ফিল্ড তো ভালোই মোন্যে হোছ্যে! কাকা এব্যার চিয়্যারম্যান হোত্যে পারবে জি দাদো? হামার মোন্যে হোছ্যে...’ নিজের কথাগুলোকে বিশ্বাস করে না মদুল। তারপরও মনের ভাবনাগুলোকে ভাদু মণ্ডলের শ্বাসনালীর থেকে বের হওয়া ঘন গরম বাষ্পের দিকে ছুড়ে মারে। এখন পর্যন্ত চুলার মুখাগ্নি করাতে না পেরে কিছুটা বিচলিতও দেখায় মদুল দোকানদারকে।
‘শোরের বাচ্চার’ঘে কথা কহিস ন্যা? ভোটের সময় অ্যালেই শালারা গহা মারামারি কোত্তে লাগে। আর তুই লোকা— শীশ কুণ্ঠে পালি বে? কাজিয়া তো ছাতা আর আনারসের মোধে। চা দে।’ ভাদুর মুখে কোনো কথাই আটকায় না। লাভাঙা ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি মানুষই একথা জানে। আবার একথাও মানে— অসীম সাহসী এই মানুষটা প্রয়োজনে অপরের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে এতটুকুও কার্পণ্য করবে না।
‘হামার এখ্যানে কত্তো মানুষ আসে, কত্তো কথা কহ্যে, হামি একটু কান প্যাত্যা থাকি দাদো। তুমি ফের রাগ কর্চ্ছো কেনে?’
‘তুই হোলি দু’টাকার চায়ের দোকানদার! এগ্ল্যাতে তোর এত ইন্টারেস কেনে বে? গরিবের প্যাট আর চ্যাট ঠিক থাকলেই হোল্যো।’ ভাদু মণ্ডলের মুখ যারপরনাই খারাপ। কোনো কথা তার মুখে ঠেকে না। কথাগুলো শুনে দপ করে নিভে যায় মদুলের মুখ।
‘এব্যারকার ভোটের ব্যাপার স্যাপার সুবিধ্যার লাগছে না তো, এল্যাগ্যাই কোহোছি জি। কাকার খবর কী? বাড়ার আখাটার ফের কি হোল্যো? গহাতে এত ত্যাল মাচ্ছি তাও জ্বোলছে না।’ মদুলের মুখ ফসকে বের হয়ে যায় শেষের বাক্যটা। চোরা দৃষ্টিতে মদুল তাকায় ভাদু মণ্ডলের দিকে। তড়িঘড়ি করে সেই অপ্রস্তুত দৃষ্টিকে গাঢ় থুথু দিয়ে গিলে ফেলে।
‘ভিতোরে ভিতোরে শভারই গোহ্যা জ্বোল্যা আছে, শালারা কখন যে ল্যাগ্যা জ্যায় আল্লা মালুম। মোদল্যা- দুনিয়া হোল্যো খহ্যাড় বে খহ্যাড়, সব কুদ্দাকুদ্দি ওই খহ্যাড়ের ভিতরেই। উপরের জোগানদার না চাহিলে কুনু লাভ নাই, কিছু বুঝলি বে?’ গত দশ বছরে এত শীত পড়েনি। ভাদু মণ্ডলের এতদিনের অভিজ্ঞতা বলে, যেবার যত বেশি শীত পড়বে সেবার তত বেশি অঘটন ঘটবে। মা মরার বার থেকেই এই ব্যাপারটা দেখে আসছে সে।
‘কে যে দান মারে? কিছু বুঝ্যা য্যাছে না। এক্যাক ঝন্যা এক্যাক রোকুম কথা কোহিছে। বধনাপাড়ার বুধু মোড়ল সাব্জাদ কাকার বিরুদ্ধে উঠ্যা পোড়্যা ল্যাগাছে জি দাদো। উঁ শালা খুব ধাত্যালছে। কাকাকে কোহ্যা দিবো নাকি সবকিছু?’ কে জিতলো কে হারল তাতে মদুলের কিছু যায় আসে না। ভোট মদুলের ব্যবসার জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। ইলেকশন আসলেই বিড়ি-সিগারেট-চা আর পানের বিক্রি বেড়ে যায় বহুগুণে। ভোটের আগের দেড় মাস প্রায় প্রতিদিন সব প্রার্থী আসে মদুলের কাছে। তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যায়, ভোটারের মতিগতি কোনো পক্ষে সেটা জানতে চায়। সব প্রার্থীর কাছেই এই সময়টাতে মদুলের খুব দাম। সব প্রার্থী তাদের নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য বলে, বিনিময়ে মদুলকে মুঠো ভর্তি টাকা-পয়সা দিয়ে যায়। এক প্রার্থী যাবার পর পরের প্রার্থী খোঁজখবর আর টাকা পয়সা নিয়ে না আসা পর্যন্ত আগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায় মদুল। এই দেড় মাসে তাই দিনে তিন চার বার প্রতীক পাল্টাতে হয় মদুলকে। গড়ে আড়াই-তিন বছর পরপর ভোট আসে, ভোটের আগের দেড় মাস মদুল তার সততাকে দোকানের তাকে রাখা টোস্টের ফাঁকা বোয়ামে বন্দি করে রাখে।
‘শততা কি ব্যাংকে জমা কোর্যা থুয়া টাকা, ইচ্ছ্যা হোল্যেই সেটা ভাঙিয়্যা খ্যাবো? প্যাঁতে দানা না পড়লে সততা টতটা দিয়্যা কি হোব্যে বাল!’ মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ঠেলে দেয় মদুল।
‘বাদ দে বাল, ব্যাঁড়ার ভোট। ভোটে যেই জিতুক তোকে তো সারাজীবন আখার গহ্যা ম্যারাই য্যাতে হোব্যে বে। আম্রিকার পেসিডিন কি কোহ্যাছে শুন্যাছিস? আবে ঐ বোকাচোদাটা! শুনিস নি? শুনবি কি? তুই নিজেও তো শালা একটা বোকাচোদা। এক বোকাচোদা কি আরেক বোকাচোদার খবর রাখে?’
‘কেনে দাদো? কি কোহ্যাছে?’
‘তুই তো আখার পুটকি গুঁতাইতে গুঁতাইতে সারাটা জীবন কাটিয়্যা দিলি আর ওই জারুয়ার বাচ্চারা যুদ্ধের!’ মলিন চেহারার ঘিয়া রঙের শালের ভেতর নিজের শরীরকে ভাঁজ করে রেখেছেন ভাদু মণ্ডল। বিড়ির আগুনে শালের শরীরে অসংখ্য ছিদ্র, নিচে মোটা উলের স্বাস্থ্যবান সোয়েটার— আগুনের ছিটাফোঁটা সেটাকেও চুমা দিয়ে গেছে, সোয়েটারর নিচে টেট্রন কাপড়ের একটা পাঞ্জাবি, যদিও শীতের ছোবল থেকে বাঁচতে পাঞ্জাবিটা নিজেই সোয়েটারের ভেতরে লুকিয়ে আছে। গুটিয়ে থাকা পাঞ্জাবির নিচে হাফহাতা লাল রঙয়ের একটা গেঞ্জি, তারও নিচে তেল চিটচিটে সাদা একটা স্যান্ডো, সবার নিচে ভাদুর শরীরের লোমশ চামড়া। সবকিছুকে লুঙ্গির ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে বস্তার মুখ বন্ধ করার মতো কায়দা করে লুঙ্গিটাকে শক্ত করে গিঁট দিয়েছে ভাদু মণ্ডল। লুঙ্গির নিচে একটা টাইস্টও পরেছে, গত বছর তার মেজো ছেলে ঢাকা থেকে কিনে এনেছিল এটা। মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। ক্যাপ সমেত মাথাটাকে আটকে রেখেছে হাতে বোনা নীল উলের একটা মাফলার। মাফলারের বর্ধিতাংশ ফাঁসিতে ঝুলানোর আসামির গলাকে দড়ি যেভাবে পেঁচিয়ে রাখে ঠিক তেমন করে পেঁচিয়ে রেখেছে ভাদু মণ্ডলের গলাটাকেও। ভাদুর ফাটা পায়ে কাদামাখা এক জোড়া কাপড়ের বাটা জুতা। ভাদু মণ্ডল ভালো করেই জানে এসবের কোনোকিছুই তাকে এই আয়ু খেকো শীতের ধারালো কুয়াশা-দাঁত থেকে রক্ষা করতে পারবে না, বরং তার শরীরের লোমশ চামড়া বরাবরের মতোই তাকে রক্ষা করবে শীতের তীব্রতা থেকে।
‘তোমাকে দেখ্যা বান্দরের মতন লাগছে দাদো, হে হে হে। হামি না হয় ভোট লিয়্যা আছি, তুমি তো আম্রিকার পেসিডিন লিয়্যা আছো। এদিকে গাঁয়ে কি হোয়্যা য্যাছে তার কুনু খবর রাখ্যাছো?’ তীব্র শীতে আক্রান্ত একজন বোকা মানুষ হাসলে যতটা বোকা দেখায় তার চেয়েও দ্বিগুণ বোকা দেখাচ্ছে মদুল দোকানদারকে। তীব্র শীত মদুলের শরীরটাকে কড়া করে দিয়েছে— ফলশ্রুতি তার ঠোঁট চিরে গেছে। মুখের লালা, থুথু, পানের রস আর চিরে যাওয়া ঠোঁটের রক্ত একে অপরকে চেটে খেতে ব্যস্ত। চিরে যাওয়া দুই ঠোঁটের ফাঁকে একটা বাঁশের চোঙাকে বহু কষ্টে আটকে রেখেছে বোকাসোকা গোছের মদুল দোকানদার— অনবরত ছোট ছোট ফুঁ দিচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই আগুন জ্বলছে না। অবশ্য মদুল দেখতে যতটা বোকা— ভেতরে ভেতরে ততটাই শেয়ানা।
গেঁয়ো একটা গন্ধ আশপাশের নাসারন্ধ্র খুঁজে বেড়াচ্ছে। কেরোসিন খাওয়ার পরও নেমকহারাম ঘুঁটাগুলো কিছুতেই কথা বলছে না।
‘হ্যাঁর চাঁছা কি কহিতোক জানিস? ব্যাঁড়া বিড়ি যে শ্যাষ হোয়্যা গ্যালো বে, এদিকে তুই আখার গহ্যা ম্যারাই যাছিস! আবে চা না খ্যালে তো রক্ত জোম্যা য্যাবে বে।’ শ্লেষ মেশানো কণ্ঠ ভাদুর, কথার ফাঁকে খুক খুক করে কেশে নেন তিনি। কাশিজনিত অতিরিক্ত পরিশ্রম তার শরীরে কিছুটা বাড়তি উত্তাপ সরবরাহ করে।
‘ফটিক জোগানদারের কাছ থ্যাক্যা কিন্যাছিনু ঘুঁইটা গ্যাল্যা, উ শালা যেমন চিপ্পুস ওর ঘুঁইটা গ্যাল্যাও তেমনি জি। কুনু কিছুতেই জ্বোলতে চ্যাহিছে না।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই এক এক করে দোকানে এসে বাঁশের ফালি দিয়ে বানানো বেঞ্চে বসবে কান্তু মামা, ফুঁকা মাস্টার, বিজোলী কাকা, হেতেম ভাই। তারপরেই আসবে হারেশ মেম্বার। চা না পেলেই যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ আরম্ভ করবে। গালাগাল না হয় সহ্য করে নেবে মদুল কিন্তু চুলা ধরাতে না পারলে যে ক্ষতি হবে, সেটা পূরণ করবে কীভাবে?  অনবরত ফুঁ দেবার পরিশ্রমে হোক অথবা চা বিক্রি করতে না পারার দুশ্চিন্তায় হোক— শ্বাস জমে যাওয়া এই শীতে ঘেমে যাচ্ছে মদুল। তার উপর গতরাতের ঘটনা মনে হতেই মদুলের চোয়ালের মাংসপেশিগুলো ধনুষ্টংকার রোগীর মতো টানটান হয়ে যাচ্ছে।
‘চাঁছা খুব জানেওয়ালা মানুষ ছিল। কাকা কহিতোক—  জীবন হোল্যো নোকার মতন, আর বিবেক হোল্যো দাঁড়, ঠিক মতো দাঁড় বাহিতে না পাল্লে লোকা পানিতে টাল খ্যাতেই থাকবে, খ্যাতেই থাকবে। পাড়ে পোঁছা সম্ভব হোব্যে না।’
‘তোমার চাঁছাকে তো হামি দেখিনি, কথা কিন্তু খুব খাঁটি জি দাদো।’
এবারের জাড় যাকে ধচ্ছে তাকেই খ্যায়া লিছে বে। কালু হাগড়া জাড়ের চোদনে তো মোর্যাই গ্যালো। লিউমোলিয়া না কি যেনে হোয়্যাছিল। ব্যাড়া, আখা ধল্লো বে?’ ভরা মাঘের এবারের জাড়টাকে লোকমান চোরের মতোই ভীষণ ধুরন্ধর মনে হচ্ছে ভাদু মণ্ডলের।
‘ক্যাইল নাকি ছাতা আর আনারস এক সোঁতেই মিছিল ড্যাক্যাছে! শালা কী যে হোব্যে...?’ বাঁশের চোঙায় ফুঁ দিতে দিতে মদুলের চোখমুখের দুশ্চিন্তা ঘাড়ের রক্তনালী বেয়ে নেমে পড়ে বুকের খাঁচার দিকে। হতবিহ্বল হয়ে পড়ে মদুল, ভাবে— গতরাতে সে যে ঘটনাটা দেখেছে, সেটা যদি কোনোভাবে জানাজানি হয়ে যায় তাহলে তো রক্ষা নেই! ফুঁ দেবার সামর্থ্য বাড়াতে বাড়াতেই মদুল দোকানদার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, ‘গতরাত’ বলে তার জীবনে কোনোকিছুই ছিল না।
 দুই
বিস্তর বেচা বিক্রি হয়েছে গতরাতে, তাই দোকান বন্ধ করতে দেরি হয়ে গেছিল মদুলের। কবরের মতো অন্ধকার নামোবাগানে নেমে পশ্চিম বরাবর আধ ঘণ্টা হাঁটলেই মদুলের বাড়ি। এত বড় বাগান এই অঞ্চলে একটাও নাই। গাছের পর গাছ। যতদূর দৃষ্টি যায়— বুকে বুক লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য আম গাছ। গাছগুলো গর্ভবতী নারীর মতো মুকুলে মুকুলে ভরে আছে। এবার কুয়াশা পড়ছে খুব, পুরুষের শুক্রাণুর মতো ঝরে পড়ছে অনেক মুকুল। বাগানে নামতেই মৃত মুকুলের আহত গন্ধ নাসারন্ধ্রে এসে জানান দিচ্ছে। আসলে সব মৃতের গন্ধেই লেগে থাকে বিষাদ। বাগানের গভীরে স্থির অন্ধকার ডানা মেলে উড়ছে। অবশ্য এসবে মদুলের ভয় পেলে চলবে না— গত সাড়ে সাত বছর থেকে প্রতি রাতেই পাড়ি দিতে হয় এই অন্ধকার। তিন ব্যাটারির লাইটটা জবান দিয়ে দিয়েছে। ভোটের কেনাবেচার ব্যস্ততায় লাইটের ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে সে দিকে মোটেও খেয়াল করার সময় হয়নি। সুইচ টিপলে যেটুকু আলো আসে সেটুকুকেও গিলে ফেলে কুয়াশা। লাইটটাকে হাতেই রাখে মদুল। অভ্যাসের বশেই বারবার সুইচে টিপ দিতে দিতেই এগোতে থাকে মদুল। এই কুয়াশা মোড়ানো অন্ধকারে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। তাই আধ ঘণ্টার রাস্তাকে মনে হয় আটাশ মাইলের। ভয় মিশ্রিত একাকিত্ব কাটাতে একটা গান ধরে সে, কিন্তু শব্দগুলো শীতের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পুনরায় ফিরে আসে তার মধ্যেই।
‘কারেন থাকলে সাহুসের পা দুটো আরাক্টু জোরালো হোত্যো। কিন্তু তা তো হোব্যার লয়।’ নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলতে থাকে। হঠাৎ হোঁচট খায়। উবু হয়ে বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে হাত দেয়— তর্জনী ভেজা, রক্তে নাকি কুয়াশায় তা বুঝে উঠতে পারে না মদুল। এই শীতে ব্যথার অনুভূতিগুলোও পাথর হয়ে গেছে। ডান হাতের তর্জনী জিভে ঠেকাতেই বুঝে যায় এটা কুয়াশা নয়। রক্তের স্বাদ আর কুয়াশার স্বাদ এক নয়। একটা লক্ষ্মী পেঁচা কেঁদে ওঠে। এই অসময়ে পেঁচার ডাক মোটেও ভালো লক্ষণ না।
‘কী আশার্য, নামে লক্ষ্মী প্যাঁচা, অথচ ডাক অলক্ষণের ইঙ্গিত।’ এবার দুরুদ শরীফ পড়ার চেষ্টা করে মদুল। ‘আল্লাহুম্মা ইনি নাস্তাইনুকা ওয়া নাসতাগ ফিরুকা... ওয়ানুমিনু বিকা ওয়ানাতা...ওয়ানাতাও...ও...য়া, ওয়া...ও...’ বারবার আটকে যায় সে। গোঁজামিল দিয়ে কোনোমতে দুরুদ শরীফ শেষ করে বুকে থুথু দেয় সে— এই শীতে মুখের থুথুও শুকিয়ে গেছে।
অন্ধকার হাতড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শতবর্ষী ইঁদারার কাছাকাছি আসতেই মদুলের চোখের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসীমা জমে যায়— প্রগাঢ় অন্ধকারের নৃশংস পর্দা তার লঘু দৃষ্টিকে শুষে নেয়। এক শ্বাসরোধী দৃশ্যে মদুলের হেঁটে আসা পথটুকু বিঁধে যাচ্ছে।
ইঁদারা পার্শ্ববর্তী সন্তান দানে অক্ষম আম গাছটার গোড়াতে দড়ি দিয়ে হাত-পা শক্ত করে বাঁধা একটা মানুষ পড়ে আছে। কারও গোঙানির শব্দ কানে আসে মদুলের। খুব নিকটের আরেকটা গাছের আড়াল থেকে মদুল চেনার চেষ্টা করে— গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা থাকার কারণে চিনতে বেগ পেতে হয় মদুলের। গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে রাখলেও মানুষের চেহারা পাল্টায় না— শঙ্খ পাড়ার সতীশ? হ্যাঁ, সতীশই। মদুল দেখে, কুয়াশার দৃষ্টিহীন জঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে দিনের ঈশ্বর, খোলস ছেড়ে পরে নিচ্ছে শয়তানের পোশাক। হাতে একটা হাইসা। তারপর নৃশংস কায়দায় কোপাচ্ছে সতীশকে। ঈশ্বরের হাতের তীক্ষ্ন ধারের হাইসাটার ঠোঁটে ততক্ষণে অম্লমিশ্রিত উষ্ণ রক্তের টাটকা স্বাদ। 
‘মালুর বাচ্চা বেশি ব্যাড়হ্যা গেছিল, কুত্তার বাচ্চার ঘেউ ঘেউ বন্ধ কোত্তে এট্যাঁ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।’ হাঁপিয়ে উঠেছে দিনের ঈশ্বর। রাগত অথচ চাপা স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে দিনের ঈশ্বর আর অন্ধকারের শয়তান কোপাতেই থাকে সতীশকে।
কোপানো শেষ। সতীশের নিথর দেহটা ঢলে পড়েছে। দেহটাকে একটা বস্তায় ভরে ঈশ্বরের সাগরেদরা। বস্তার মুখটাকে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। তারপর ফেলে দেয়া হয় পরিত্যক্ত ইঁদারার ভেতর। এই স্নায়ুনাশী মুহূর্তে হঠাৎ মদুলের আবছা দৃষ্টিসীমানায় ধরা পড়ে চারটে ভ্যান। ভ্যানে অনেকগুলো বস্তা, বোঝা যাচ্ছে না বস্তাগুলোতে কি আছে। অতীত হয়ে যাওয়া সতীশ যেন গন্ধের চিৎকার ছড়াতে না পারে তার জন্যই হয়তো— পরিত্যক্ত ইঁদারার ভেতর পনের বিশ বস্তা বালি ফেলা  হয়। গাছের গোড়ার রক্ত এবং সতীশ নামক চিহ্নকে চাপা দিতে এটাই সর্বোত্তম পন্থা। জমাট জাড়ের আঁধারেও আড়াল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মদুল। নিজের শ্বাসকে নিজেই চেপে ধরে, খুব ভয় পেয়ে গেছে সে, কেউ যদি দেখে ফেলে তাকে?
তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম দিন। মানুষের ভাবনা থেকে ভোটের উত্তেজনা একটু দূরে সরে গেছে। এলাকায় একটা চাপা উত্তেজনা। উত্তেজনায় বারুদ ঢালছে সতীশ। শত অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘটনাটা দেখতে হয়েছিল মদুলকে— ষাট বছর বয়সী নিঃসন্তান আম গাছটাকেও, প্রতিবাদের ভাষা জানা থাকলেও তা প্রকাশের উপায় জানা ছিল না তাদের, গিলে খেতে হয়েছে প্রতিবাদের ভাষাকে, গিলে খেতে হয়েছে বুক মোচড়ানো কষ্ট আর নাড়ী কাঁপানো ভয়কেও। সেদিনের সেই রাতে নিজেকে আম গাছটার চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারেনি মদুল।
‘মালু’র ব্যাট্যা শোরের চোদা সতীশ ইন্ডিয়া পালিয়্যা গেছে।’ কালু দফাদারের ছেলে সিগারেটে টান দিতে দিতে সতীশের ইন্ডিয়া পালিয়ে যাবার ঘটনাটাকে রসিয়ে রসিয়ে বলতে থাকে। সে নাকি সতীশকে সোনা মসজিদের ওদিকে বর্ডার পার করা রবু দালালের সঙ্গে দেখেছে। রবু দালাল নাকি সতীশকে বর্ডার পার হতে সাহায্য করেছে। কালু দফাদারের ছেলের পাশে হরি, ঝন্টু, সাহারুল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে।
‘হ্যামারও তাই মোনে হোয়্যাছিল জি। গত কয়েকদিন থ্যাক্যাই শালার ভাবসাব ভাল্লাগছিল না।’ সারি করে সাজানো আটটা হাফ সাইজের কাচের গ্লাসে টুং টাং শব্দ তুলে চিনি দিতে দিতে কথাগুলো বলে মদুল, মনে মনে মাফ চেয়ে নেয় ইঁদারার গভীরে চিরনিদ্রায় শায়িত সতীশের কাছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে কালু দফাদারের ছেলের দিকে তাকায় সে, এই তো সেই চেহারা— এরাই তো পাঁচ দিন আগে নামোবাগানে সতীশের লাশসহ বস্তাটার মুখে দড়ি বেঁধে ইঁদারার ভেতর ফেলে দিয়েছিল। হ্যাঁ জি মদুল ভাই? উ শালা ইন্ডিয়া পালিয়্যা ব্যাঁচ্যা গেছে। না হোল্যে শালা যা শুরু কর্যাছিল?’
‘ছ, সাত দিন আগে অ্যাসাছিল একবার হ্যাঁর দোকানে। শালা বাকি চাহাছিল জি। হামি বাকি দি নি শালাকে।’ শাহারুলের চোখে বারবার চোখ পড়ে যায় মদুলের। মদুল নিজের দৃষ্টিকে শাসাতে থাকে।
‘নেতা হোত্যে চ্যাহ্যাছিল? বোকাচোদা! ইন্ডিয়া পালিয়্যা গেছে।’
সতীশের না হয় ইন্ডিয়া আছে, মদুলের তো সে রকম কিছু নেই। তাই মদুল জোরেশোরে সতীশের ইন্ডিয়া পালিয়ে যাবার ঘটনাটা প্রচার করতে থাকে।
অতিরিক্ত কৌঁসুলি হতে হয় মদুলকে। যদি কেউ জেনে যায় যে মদুল সেই রাতে দিনের ঈশ্বর আর অন্ধকারের শয়তানকে চিনে ফেলেছে তাহলে তার পরিণতি কি হবে সেটা ভেবে গাঁ শিউরে উঠছে। খুব ভয় হয় তার, নিজের জন্য নয়— ভয় হয় চাটাই দিয়ে বানানো নড়বড়ে চায়ের দোকানটার জন্য। সেই দোকানটার আয়ের দিকেই ক্ষুধার অনুভূতি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মদুলের বউ, দুইটা মেয়ে, বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা।
ধরো, মদুল ভাই, দ্যাখোতো, এট্যা তোমার লই? ক্যাইল বাড়ি য্যাব্যার সময় মোনে হয় ফেল্যা থুইয়া গেছিল্যা।’
‘হ্যাঁ জি, এট্যা তো হামারি, কুণ্ঠে প্যাল্যা।’ শীত আর শঙ্কায় জমে যাওয়া হাতটা বাড়িয়ে মাফলারটা নেয় মদুল।
‘তুমি মন ভুলা মানুষ, কুণ্ঠে ফেল্যা থুইয়া আসসিলা? না জি মদুল ভাই অদ্দাখো ওখ্যানে পড়্যা প্যায়াছিনু।’ পরিস্থিতির ওপর তরল হাসি ছিটিয়ে দেয় কালু দফাদারের ছেলে।     
 তিন
হিম কুয়াশা আর বিদঘুটে আঁধারের রেশ কাটিয়ে ওঠা ভোর তখনো অন্ধকারের মাদুলিতে আটকানো। আচমকা চেঁচামেচির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় ভাদুর। লেপ ছেড়ে আঙিনা পেরিয়ে বাড়ির সামনের উঠোনে বেরিয়ে আসে সে। খড়ের পালার পাশেই রাখা ছিল তার কোদালটা। সেটা হাতে নিয়েই ভাদু হাঁটা আরম্ভ করে চেঁচামেচির উৎসমূল নামোবাগানের দিকে। চেক লুঙ্গি ছাড়া তার পরনে তখন আর কিছুই নেই। লেপের নিচে লুঙ্গি ব্যতীত পরনে আর কিছুই রাখতে পারে না ভাদু। হাঁটতে হাঁটতে লুঙ্গিটা মালকোঁচা করে গিঁট দিয়ে নেয় সে।
নিজের সঙ্গে কথা বলার পর্যায়ে চলে গেছে ভাদু মণ্ডল। এই পর্যায়টা খুব ভয়ঙ্কর। এই সময়ে ভাদুর সঙ্গে কথা বলার সাহস আর কারও থাকে না।
‘জাড় কী ফের কাহুকে খ্যায়া লিলে? এই চুতমারানি জাড় যে কত ঝনাকে খ্যায়া লিবে তার কুনু ঠিক নাই!’ ভাদুর পেছনে তখন প্রায় সাত আট জনের একটা মাঝারি বয়সের দল।
‘আল্লা যে কি কোত্তে এ দুনিয়্যাতে মানুষ পাঠিয়্যাছিল বাল? শালা মানুষেরা তো শোরের চ্যাহতেও আভারত হোয়্যা য্যাছে।’ নিজের সঙ্গে কথা চালিয়েই যায় ভাদু।
দৃশ্যটা ভয়ানক! নাকে কাপড় চেপে নিরাপদ দূর থেকে এক পলক দেখেই প্রায় সবাই সরে পড়ছে। এত ভয়ানক দৃশ্য এ গাঁয়ের মানুষ কোনোদিনই দেখেনি। গ্রামবাসীর অভিজ্ঞতার বাইরের এ ভয়ানক দৃশ্যটার সামনে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা উদ্বিগ্ন ভিড়। গ্রামে যা কোনোদিন হয়নি তাই হচ্ছে। এইতো পাঁচ দিন আগেই উধাও হয়ে গেছে সতীশ।
নামোবাগানের আম গাছটার গোঁড়ায় সদ্য মৃত শীতে শক্ত হয়ে যাওয়ায় একটা ধড় রশি দিয়ে শক্ত করে পিছমোড়া করে বাঁধা। মৃতদেহটার শরীরে কোনো কাপড়চোপড় নেই। কেউ যেন চিনতে না পারে এই জন্যই হয়তো, শরীরের সব কাপড়চোপড় খুলে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে নিথর দেহটার ভেতরে বরফ হয়ে যাওয়া চিৎকারগুলো বেরিয়ে আসবে, সবকিছু বলে দেবে। কিন্তু তা আর হয় না, হবার কথাও না। দেহ থেকে মুণ্ডুটা বিচ্ছিন্ন। মুণ্ডুটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নিঃসন্তান আম গাছটাও কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, পারছে না।
ভাদু মণ্ডলের অবশ্য ভয় ডর নেই। খুব কাছাকাছি গিয়ে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে মৃত দেহটাকে। কোন অভাগার মৃত দেহ এটা?   
‘চেনেন?’
‘অ্যাঁ? না, এট্যাঁ কি হামার কাম?’ হঠাৎ চিন্তার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসে ভাদু। থানা থেকে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে তিনজন কনস্টেবলসহ এসে পৌঁছেছে বিল্লাল এস আই। কে বা কারা থানায় খবর দিয়েছে তা কেউ জানে না। পুলিশ দেখেই নিঃসন্তান গাছটাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আশঙ্কা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে থাকলো। পুলিশের জেরার মুখে পড়াটাকে কেউই নিরাপদ ভাবছে না।
‘চাচা, আপনি সাহায্য করলে আমাদের একটু সুবিধা হয়।’ লাভাঙা ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যানের পিতা হিসেবে নয় বরং ভাদু মণ্ডলের আলাদা একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে এই গ্রামে, সেই সূত্রেই বিল্লাল এস আই কথাগুলো বলল ভাদু মণ্ডলকে।
‘হামি জানি না।’ ভাদুর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘এ কামটা করল কে?’
মুণ্ডুহীন ধড়ের মানুষটাকে শনাক্ত করা গেল না বা চেষ্টা করা হলো না। চাটাইয়ে পেঁচিয়ে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হলো ধড়টাকে। কুদ্দুস ঘরামুর ভ্যান প্রস্তুত ছিল। পুলিশের আদেশ অমান্য করার সাহস তার নেই। ধড়টাকে প্রথমে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে, পরে ময়নাতদন্ত।
চাটাইয়ে মোড়ানো মৃতদেহটাকে অপেক্ষা করতে হয় বাবলু চেয়ারম্যানের জন্য। অপেক্ষা করে নামো বাগানের নিঃসন্তান গাছটাও। অপেক্ষা করে শিবগঞ্জ থানা। বাবলু চেয়ারম্যানের হুকুম ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব হয় না এই ইউনিয়নে। ভ্যানে তোলা চাটাইয়ে পেঁচানো মৃতদেহের ডান পায়ের বুড়া আঙুলটার দিকেই বারবার চোখ চলে যায় ভাদু মণ্ডলের। নিজের সঙ্গে কথা বলাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না ভাদু মণ্ডল, ‘ব্যাঁড়ার বালের চায়ের মুখে পেসাব কোর্যা দিনু অ্যাইজ থ্যাক্যা।’
‘সাপ লুডু খেলা চলছে!’ একথা বুঝতে ভাদু মণ্ডলের এতটুকুও অসুবিধা হয় না, ‘কিন্তুক চাল দিলটা কে? আর সাপটাই বা কার? ওঝাই বা কে?’
নামবাগানের আম গাছের গোড়ায় বেঁধে রাখা মৃতদেহের খণ্ডিত মস্তকের সঙ্গে ভাদু’র কিছু কথা ছিল। কিন্তু মস্তকটা কোথায়?
গত ছয় দিন একেবারেই ঘুমাতে পারেনি ভাদু মণ্ডল, না জাড়ের কামড়ে নয় বরং নামোবাগানের অন্ধকার তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর সে অনবরত খুঁজে ফিরেছে সেই খণ্ডিত মস্তক। খুঁজেছে ইন্ডিয়া পালানো সতীশকেও।
‘বাপু? কি হোয়্যাছে জি? এরোকুম ঝিম ম্যার্যা আছো কেনে?’ সাব্জাদ চেয়ারম্যান কথাগুলো বলে। ‘ভোটের মাত্র মাস খানেক বাকি।’
‘মদুলকে ম্যার্যা ফেল্লো! কে এমন কামটা কল্লো?’
‘বাপু, হামিও হিস্যাব মিলাইতে পার্চ্ছি না জি বাপু।’
‘তোর কি মোনে হ্যোছে?’
‘এমন একটা সময়ে শালা খুন হোল্যো?’
‘মদুলকে ম্যার্যা ফেল্লো! কে এমন কামটা কল্লো? কোহাতো?’
‘বাপু, বড় ভাই কিন্তু হ্যাঁর পক্ষে!’
‘মানে? কি কোহছিস?’ অনিচ্ছাকৃতে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ভাদু মণ্ডল।
‘ওই ব্যাবল্যা শালা বড় ভায়ের পার্থী হোল্যো কি হবে? হামি বড় ভাইকে বিশ লাখ টাকা মাইর্যা অ্যাসসি। আর শালা ব্যাবল্যা বড় ভাইয়ের সঁতে দু’লম্বরীও কোর্যাছে।’
ছেলের কথাবার্তা ভাদু মণ্ডলের মাথায় ঢোকে না। সামনে যাকে দেখছে তাকেই মদুল ভেবে বসে ভাদু মণ্ডল।
গত ইলেকশনে হেরে গেলেও এর আগের বার জেতার সুবাদে চেয়ারম্যান নামটা পদাধিকার সূত্রে সেঁটে গেছে সাব্জাদ মণ্ডলের নামের সঙ্গে। এবার আনারস প্রতীকে ভোট করছে সাব্দাজ। ফিল্ডও ভালো। বাবলু চেয়ারম্যানের দুই নাম্বারিতে মানুষ অতিষ্ঠ, যেমন গতবার অতিষ্ঠ হয়েছিল সাব্জাদের অত্যাচারে। কিন্তু এলাকার মানুষের উপায় তো নাই। এবার দলের ইচ্ছার বাইরেও নমিনেশন পেয়েছে বাবলু চেয়ারম্যান, মানে টাকার জোরেই নমিনেশন নিয়েছে। চেয়ারম্যান হবার পর হেন কাজ নাই সে করেনি। দামুশের বিলের ইজারা, বাগান দখল, অন্যায়ভাবে ইটভাটা দেওয়া, খাস জমির সব গাছ কেটে ফেলা, সব।
‘শালা মোদল্যা খুন হোয়্যা য্যায়্যা তো হামাকে বিপদে ফেল্যা গ্যালো।’ বিড়বিড় করে সাব্জাদ চেয়ারম্যান।
 চার
বয়স হয়ে যাওয়ায় ভাদু মণ্ডলের ইচ্ছাকে তার তিন সন্তান মহারাজপুর মেলা থেকে কেনা কাঠবাক্সে শেকলবন্ধী করে রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। ভাদু মণ্ডল শুধু তার নিজের ইচ্ছা দাস, অন্য কাউকে পাত্তা দেয়া তার অভ্যাসের বাইরে।
ভাদু মণ্ডলের বাপ সেতাব মণ্ডল তার জন্য বিস্তর জমিজিরাত রেখে গেছিল। তার জন্মের দিন মা মরে গেলেও রেখে গেছিল বিঘা বিশেক আম বাগান। সেগুলোকে টেনেটুনে অনেক লম্বা করেছে ভাদু মণ্ডল। অত্র এলাকায় তার মতো সচ্ছল ব্যক্তি আর কেউ নেই সেটা সে ভালো করেই জানে, তবে এ নিয়ে তার কোনো গর্বও নেই। সম্পত্তি সাময়িক সময়ের জন্য, আর জীবন আরও ক্ষণিকের। সে চেয়েছিলও তার ছেলেরা পড়াশোনা করে মানুষ হোক। পড়াশোনা তারা ঠিকই করেছে কিন্তু মানুষ আর হলো কই? নাকি এ যুগের পড়াশোনা কাউকে মানুষ বানাতেই পারে না?
‘বড় ঝন্যা চিয়ারম্যান হোয়্যাছিল। চিয়ারম্যান হোলেই মানুষ আর মানুষ থাকে না, হারামি হয়্যা যায়। বাকি দু’ঝন্যা বড় ঝন্যার দুই নাম্বারি কাম গ্যাল্যার সবই করে।’  উত্তরমুখী বারান্দায় একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে কথাগুলো ভাবে ভাদু মণ্ডল। খুব দুশ্চিন্তা হয় তার। অধৈর্য হয়ে পড়ে ভাদু, হঠাৎ সমস্ত দুশ্চিন্তাকে ছুড়ে মারে তার নিজেরই অর্জিত অভিজ্ঞতায় ভরা পাগলা নদীতে, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ খেয়াজালের মতোই দুর্ভাবনাগুলো ফিরে আসছে বর্তমানের ডাঙায়।
পুরো এলাকা থমথমে। ঘনঘন পুলিশের ঘোরাঘুরি, কিছু ধরপাকড়ও হয়েছে। মিছিল-মিটিংয়ে-হাটে-বাজারে মানুষের মুখে মুখে রটে যায় মদুলের নৃশংস খুনের ঘটনা। বাবলু চেয়ারম্যানের লোকজন এলাকার মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করে সাব্জাদ চেয়ারম্যানের লোকজন মদুল দোকানদারকে হত্যা করেছে। তাতে যা হয়েছে তা হলো, ভোটের পাল্লা ঝুঁকে পড়ছে বাবলুর ছাতার দিকে।
ভাদু মণ্ডলের তিন ছেলে সারা দিন পুরো এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। ভোটারের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। গভীর রাতে বাড়ি ফিরে বৈঠক ঘরে গুজর গুজর ফুসর ফুসর করছে সকাল অব্ধি। ঘুম-খাওয়া-দাওয়া সব বাদ। ইলেকশনের মাঠে ভালো অবস্থায় ছিল আনারস। তিন বিঘা আম বাগান বিক্রি করে প্রায় সাতান্ন লাখ টাকা হাতে, সেগুলোর পুরোটাই ইলেকশনের জুয়ায় খাটাতে চায় সাব্জাদ, এ কাজে সায় আছে ভাদুর বাকি দুই অকর্মণ্য ছেলেরাও। ভোটের আগে আগে ভোটারের হাতে ক্যাশ টাকা গুঁজে দিতে পারলে কাজ হবার সম্ভাবনা জোরালো। যদিও এখনকার ভোটার খুব সেয়ানা। টাকা খাবে, ভোট দেবার কথা দিবে কিন্তু কেন্দ্রে গিয়ে তার পছন্দমতো প্রার্থীর মার্কাতে সিল মেরে আসবে। কিন্তু মদুলের খুন সব এলোমেলো করে দিয়েছে, যেন সব দোষ মদুল দোকানদারের। 
বোঝা যাচ্ছে না লোকাল প্রশাসন আনারসের দিকে নাকি ছাতার তলে। এসবের ডামাডোলের ভেতরেই গোপনে দুই পক্ষই নিজেদের সামর্থ্যকে ঘষা মাজা করতে থাকে।
মদুলের মৃত্যুর চতুর্থ দিন। মাগরিবের আজানের পর আনারস আর ছাতার মশাল মিছিল। দুই প্রতীকের মিছিল আলাদা আলাদা রাস্তা দিয়ে যাবার কথা ছিল। ছাতার মিছিল মুন্সী পাড়া দিয়ে বকুলতলা হয়ে বেরিয়ে যাবার কথা ছিল কহারোল বাজারের দিকে। আর আনারসের মিছিল ঘুঘুপাড়া হয়ে মেইন রাস্তা পার হয়ে যাবার কথা ছিল বনগাঁর দিকে। কিন্তু কোন এক পক্ষের ষড়যন্ত্রে মিছিল দুইটি মুখোমুখি হয়ে যায় মিয়াপাড়া মোড়ে। আনারস আর ছাতার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক গণ্ডগোল হয়। হাসিয়া, লাঠিসোটা নিয়ে এক পক্ষ চড়াও হয় অপর পক্ষের ওপর। কয়েকটা ককটেলও ফোটে। আনারস আর ছাতা— দুই পক্ষের বেশ কিছু মানুষ আহত হয়। ককটেলের আঘাতে মারাত্মক জখম হয় দুইজন। তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। বাকিরা সদর হাসপাতালে ভর্তি। এদের মধ্যে আনারসের পক্ষের সাত জন আর ছাতার পক্ষের চার জন। সাধারণ ভোটাররা এই ঘটনায় ছাতার ছায়া খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একথা তো সবার জানা, ‘জোর যার ভোট তার।’
এলাকায় কত কিছু হয়ে যাচ্ছে, ভাদু মণ্ডলের এসবে কিছুই যায় আসে না। ছেলেরা ক্ষমতার লোভে বিপজ্জনক খেলায় জড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় যে কারো জীবনহানি ঘটতে পারে। ভাদুর সমস্ত চিন্তা মদুল দোকানদারকে নিয়ে। ভাদু মণ্ডল এখন প্রায় সবার চেহারাতে মদুলকে দেখতে পাচ্ছে। কিছুতেই মদুলের কাটা মুণ্ডু’র সন্ধান পাচ্ছে না ভাদু।
জাড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত রাতে প্রায় পুরোটা সময় গ্রাম থেকে একঘরে হয়ে থাকা খুন্তীপাড়া কবরস্থানে কাটিয়েছ