ইটভাটার গরম ধোঁয়ায় পুড়েছে শত কৃষকের স্বপ্ন

আপডেট: 05:08:14 11/04/2019



img
img
img

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি : মণিরামপুরে কয়েকশ বোরো চাষির স্বপ্ন ফিকে করে দিয়েছে ‘গোল্ড ব্রিকস’ নামে একটি ভাটার মালিকপক্ষ। ভাটা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাকৃত অসচেতনতায় স্থানীয় হয়াতপুর-শাহপুর মাঠের এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ধানসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ভাটার গরম ধোঁয়ার কারণে এমনটি হয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। গত বছরও কৃষকরা একই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংশ্লিষ্ট অফিসাররা ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ পরিদর্শন করেছেন। ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মানববন্ধন করছিলেন।
কৃষকরা জানান, ভাটায় ইট পোড়াতে মেশিনের মাধ্যমে বাতাস সৃষ্টি করতে হয়। যে হাওয়ায় ইট পোড়ে। অবশিষ্ট হাওয়া চিমনি দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায়। আবার ইট পোড়ানোর মৌসুম শেষ হলে ভিতরে জমে থাকা গরম হাওয়া ঠান্ডা করে অন্তত ১৫-২০ দিন পরে বের করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু গোল্ড ব্রিকসের মালিকরা ইট পোড়ানো শেষ হওয়া মাত্রই ভেতরে জমে থাকা গরম ধোঁয়া বুধবার দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ বের করে দেন। আর ধোঁয়া যে যে জমির উপর দিয়ে বয়ে গেছে সেইসব জমির ফসল পুড়ে নষ্ট হয়েছে।
কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বুধবার বেলা ১১টায় ধান ভালো দেখে বাড়ি গেছি। তার পরপরই ভাটার গরম হাওয়া ছেড়ে দেওয়ায় আমার তিন বিঘা জমির ধানের শীষ পুড়ে গেছে। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে এসে দেখি আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
জুলফিক্কার নামে এক চাষি বলেন, ‘আমার দুই বিঘা ধানসহ ছয় কাঠা জমির পটলগাছ পুড়ে গেছে। গত বছর একবার ইট পোড়ানোর মৌসুম শেষে মালিকপক্ষ গরম ধোঁয়া বের করে দিয়েছিল। সেবারও অনেক ফসল পুড়েছে। ভাটামালিকদের জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা উল্টো আমাদের মামলার ভয় দেখায়।’
শুধু আব্দুর রাজ্জাক বা জুলফিক্কার না, ওই মাঠের আতিয়ার রহমান, নূর ইসলাম, শাহজাহানসহ শতাধিক কৃষকের ধান, পটল, বরবটি, আলু, পুঁইশাক ও কলাসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, অনেকদিন ধরে জমে থাকা ধোঁয়ার সঙ্গে ময়লা ও পাথুরে কয়লার কুঁচি থাকে; যা গায়ে লাগলে চোখমুখ জ্বালা করে। এই ধোঁয়ায় মাঠের পশ্চিম-উত্তর কোণ থেকে ঝাঁপা বাঁওড় পর্যন্ত অন্তত ৪০০-৫০০ বিঘা জমির ফসল পুড়ে একবারেই নষ্ট হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গোল্ড ব্রিকসের মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে ভাটার মালিক আবুল হোসেন মন্টুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
এলাকাবাসী বলছেন, সকালে গোল্ড ব্রিকসের মালিকপক্ষ ভাটায় অবস্থান করছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে গেলে হামলার ভয়ে তারা ভাটা ফেলে পালিয়েছেন। তাছাড়া শুরু থেকে ভাটা নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে এলাকাবাসীর বিরোধ চলে আসছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বাধার মুখে তারা এখানে ভাটা স্থাপন করেছেন। ফলে আশপাশের চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ। 
এদিকে, খবর পেয়ে সাতক্ষীরা থেকে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ব্রি ধান) ড. ইব্রাহীমসহ চার সদস্যের একটি টিম ও মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হীরককুমার সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
ড. ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি পরখ করে দেখেছি। ধানের কোনো রোগের কারণে এই সমস্যা হয়নি। এখন ধানের পরাগায়নের সময়। এসময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে ধানের শীষ সাদা হয়ে যায়। মূলত ভাটার গরম হাওয়াটা যে দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সেই জমিগুলোর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাটার বিপরীত পাশের জমির ধান কিন্তু অক্ষত আছে।’
মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হীরককুমার সরকার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটা তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। এসব কৃষককে আউশ ধান চাষের সময় বিনা মূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করা হবে। বিষয়টি ইউএন’ও সাথে আলোচনা করা হবে। ভাটার কাগজপত্র না থাকলে তা উচ্ছেদে ইউএনওকে অনুরোধ করা হবে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন