ঈদআনন্দ নেই ননএমপিও শিক্ষক পরিবারে

আপডেট: 08:07:35 12/06/2018



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : ঈদের আনন্দ নেই মণিরামপুরের এমপিওবহির্ভূত শিক্ষক পরিবারে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন ভাতা না থাকায় এসব পরিবারের ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, বেতন-ভাতাবিহীন শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচশ। আর ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮৮টি। এরমধ্যে রয়েছে ৩৯টি এবতেদায়ি, ছয়টি নিম্নমাধ্যমিক, ১৯টি মাধ্যমিক, আটটি দাখিল, পাঁচটি কলেজ এবং চারটি আলিম ও ফাজিল মাদরাসা। যার মধ্যে দশটি এবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা নামমাত্র (এক হাজার ২০০ টাকা) ভাতা পান।
বেতন ভাতাবিহীন এসব শিক্ষকের কেউ কেউ কাজ করছেন ১০-১২ বছর, কেউবা আবার ২১। ননএমপিও এসব শিক্ষক কেউ কেউ গ্রাম্য চিকিৎসক, ছোট ব্যবসা এমনকি মাঠে বর্গা দিয়ে সংসারে কোনো রকম দুই বেলা অন্ন যোগান। সারা বছর একটা ধারায় চললেও বিপত্তি ঘটে ঈদের মতো বড় উৎসবে। এই সময়ে বেতন-ভাতা না পাওয়ার কষ্টে এসব শিক্ষকের দম বন্ধ হয়ে আসে। একই সঙ্গে চাকরি করা অন্য শিক্ষকরা যখন বেতন তুলে বাসায় ফেরেন তখন তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে এমনটিই জানা গেছে।
উপজেলার এইচ আর এইচ সম্মিলনী নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বেতন বাদে জীবন কেমন চলে সেটা অবশ্যই আপনাদের জানা আছে। তার পরও বলছি, এই ঈদ আসলে কোনো ঈদই না। মাসিক বেতন ছাড়া একজন শিক্ষকের জীবন কীভাবে কাটে সেটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। ঈদ আসাটা আমাদের জন্য অভিশাপ। সবাই যখন হাসি-খুশি মনে ঈদের মাঠে যান, সেটা দেখে এসব শিক্ষকরা যে স্ট্রোক করে মারা যান না, সেটাই আল্লাহর একটা রহমত।’
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘২০০০ সালে এমএ পাশ করে এই প্রতিষ্ঠানে জয়েন্ট করেছি। ১৮ বছর ধরে বিনা বেতনে খাটছি। আমার প্রতিষ্ঠানে আটজন শিক্ষক কর্মচারী আছেন। তার মধ্যে দুই-তিনজন ধান কাটার মৌসুমে দিনমজুরির কাজও করেন।’
ইত্যা স্লুইসগেট দাখিল মাদরাসার সুপার রুহুল আমিন বলেন, ‘ঈদ বলতে চোখের পানি ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈদ এলে আমরা ছেলে-মেয়েদের সামনে দাঁড়াতে পারি না। কষ্টে আমাদের চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। অনেক আশায় ছিলাম এবার এমপিও পাব। কিন্তু বাজেট ঘোষণা হওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না। ২১ বছর ধরে আমরা ১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী এখানে কাজ করছি। আর শিক্ষকতা করার ইচ্ছা নেই।’
হাসাডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসার সুপার আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘১০-১২ বছর বিনাবেতনে চাকরি। পল্লীতে চিকিৎসা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে। আমার প্রতিষ্ঠানের আলমগীর নামের এক শিক্ষকের দুইটা সন্তান। মাঠে কাজ না করলে তার ভাত জোটে না। এসব পরিবারে আবার ঈদ!’
ধলিগাতী সুন্দলপুর আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ এসএম ওয়াদুদ বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে আলিম পর্যায়ে ছয়জন শিক্ষক-কর্মচারী আছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা বেতন ভাতা পান না। ওদের সামনে আমরা যখন বেতন নিয়ে বাড়ি যাই, তখন সত্যিই লজ্জায় পড়তে হয়। এতবড় একটা উৎসবে তাদের হাতে কিছু দেওয়ার সুযোগ হয় না। ওরা খালি হাতে বাড়ি ফেরে। ভাবাই যায় না!’
তিনি বলেন, ‘শুনেছি, পাড়দিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার শিক্ষকরা অর্থের অভাবে কেরোসিনও কিনতে পারেন না। রাতে তাদের সন্তানদের আলোর অভাবে পাটকাঠি জ্বালিয়ে ভাত খেতে হয়। এটা সত্যিই লজ্জার ও দুঃখের।’
তবে বেতন-ভাতা ও বোনাসবিহীন এসব শিক্ষকদের ঈদ কষ্টে কাটলেও সবাই আশায় বুক বেঁধে আছেন; হয়তো সরকার তাদের দিকে তাকাবে। দ্রুতই তাদের দুঃখ ঘুচবে। না হলে তারা আবার আন্দোলনে নামবেন বলে জানিয়েছেন এমপিওবহির্ভূত শিক্ষকরা।

আরও পড়ুন