ঈদজামাতে বিদ্বেষ-হানাহানিমুক্ত দেশের প্রার্থনা

আপডেট: 01:42:42 16/06/2018



img
img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি আর কূপমণ্ডুকতার বিপরীতে মানবিক মূল্যবোধ আর পরমতসহিষ্ণুতার বারতা ছড়িয়ে দিয়ে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আহ্বান এসেছে বাংলাদেশের প্রধান ঈদ জামাতে।
শনিবার ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বয়সের হাজারো মানুষ দুই হাত তুলে এই মোনাজাত করে।
সকাল সাড়ে আটটায় অনুষ্ঠিত এই ঈদ জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তাসহ সব শ্রেণি-পেশার নানা বয়সী মানুষ নামাজ অংশ নেন।
নামাজ শেষে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় মোনাজাত করেন মাওলানা মিজানুর রহমান।
সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে দু’হাত তুলে তিনি বলেন, “হে আল্লাহ, তুমি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের ফয়সালা করে দাও, বরকতের ফয়সালা করে দাও।  শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দাও।”
এসময় বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের  জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও কল্যাণের জন্য যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য করা হয় বিশেষ মোনাজাত।
জামাত শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশলবিনিময়ের মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন সবাই।
এবার অনেক ঈদজামাত ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক ঈদগাহে ঢুকতে হয়েছে তল্লাশির মধ্য দিয়ে। জায়নামাজ ছাড়া আর কিছু যাতে কেউ সঙ্গে না আনেন, সে বিষয়ে আগেই সবাইকে সতর্ক করেছিল পুলিশ।
বরাবরের মতো জাতীয় ঈদগাহের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ছিল নারীদের নামাজ পড়ার বন্দোবস্ত।
রংপুর থেকে মেয়ের বাসায় বেড়াতে আসা নুরুন নাহার সরকার প্রথমবারের মতো ঈদের নামাজ আদায় করেছেন জাতীয় ঈদগাহে। মেয়ে নাসরিন ববি ঢাকা মেডিকেলে কলেজের এনেসথেসিয়া বিভাগের চিকিৎসক আর চার বছর বয়সী নাতনী আরিশাও এসেছিলেন প্রথমবারের মতো।
নুরুন নাহার সরকার বলেন, “জাতীয় ঈদগাহে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে জানতাম। এবার এসে মেয়েকে বললাম। মেয়েও রাজি হয়ে গেল।
“আমি বেশ কবার হজ করেছি। কিন্তু দেশে লাখো মানুষের সঙ্গে ঈদজামাত আদায়- এটা সত্যি অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।”
মগবাজার থেকে আসা গৃহিণী মিলি খান জানান, গত পাঁচ বছর ধরে তিনি জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতে অংম নিচ্ছেন। প্রতিবারই তার সঙ্গে আসেন স্বামী আবদুল আওয়াল খান। এবার তাদের সঙ্গী হয়েছে পাঁচ বছর বয়সী নাতনী আফরিন খান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী নুসরাত মাহমুদ জেমি বলেন, “প্রতিবার এখানে ঈদের নামাজ পড়তে আসি আম্মু-আব্বুর সঙ্গে। পড়াশোনার জন্য চলে যেতে হয়েছে ঢাকার বাইরে। এবারের ঈদটা তাই একটু বেশি স্পেশাল।  সবার জন্য দোয়া করেছি। আজকের দিনটা শুধু আব্বু-আম্মুর জন্য।”
নাজিরাবাজারের বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, “নিজের জন্য, পরিবারের জন্য দোয়া করেছি। আরো দোয়া করেছি, দেশের জন্য। দেশটা যেন সুন্দর থাকে।  আল্লাহ যেন বাংলাদেশকে সব বিপদআপদ থেতে হেফাজত করেন।”
মাদরাসা টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল হক বলেন, “এক মাস সিয়াম সাধনার পর এসেছে ঈদ। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, তিনি যেন রমজানের শিক্ষাটি সারা বছর আমাদের বয়ে নিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করেন। দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে যেন নিবেদন করতে পারি।”
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ল্যাবরেটরি সহকারী হাবিবুল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, “মানবতা, সৌহার্দ্য  আর শান্তির কথা বলে ইসলাম। ইসলামের এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা যেন আমরা আরো ছড়িয়ে দিতে পারি, সেই দোয়া করেছি।”
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত হয় সকাল সাতটায়। এরপর আরো চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করতে এসেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার্স  ইনস্টিটিউটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম মুনতাসীর।
তিনি বলেন, “আজ পুরোটা দিন আমার মায়ের জন্য। মা কোথাও ঘুরতে যেতে চান না। আজ মাকে নিয়ে সারা বেলা খুব মজা করব। তার জন্য সারপ্রাইজও আছে।”
বন্ধুদের বাবারা যখন রঙ-বেরঙের পোশাক, খেলনা নিয়ে ছুটে গেছে মফস্বলে, তখন নড়াইলের লোহাগড়া থেকে বাবার সঙ্গে ঈদ কাটাবে বলে ঢাকাতেই চলে এসেছে দুই ভাই মুহিন-মাহিন।
লোহাগড়ার দীঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র মাহিন বলে, “আব্বু ছুটি পায়  না সময়মতো। প্রতিবার তাকে বাড়ি যেতে কত কষ্ট হয়! তাই আব্বুর জন্য আমরা আম্মুকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছি।  আম্মুর কাছে অনেক বায়না করেছি। এবার আব্বুর পালা।”
পাশে দাঁড়ানো বাবা জাকায়েত খানের চোখে তখন লোনা জল ছলছল করছে।
সূত্র : বিডিনিউজ