উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান

আপডেট: 01:56:56 04/01/2017



img

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফিলিপাইনে রডরিগো দুদার্তে, রাশিয়ায় ভ্লামিদির পুতিন, ভারতে নরেন্দ্র মোদি, জাপানে শিনজো অ্যাবে, চীনে শি জিনপিং, তুরস্কে রজব তাইয়্যেপ এরদোগান, মিসরে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, …। তালিকাটা ছোট নয়। তাদের মধ্যে মিল কোথায়?
সবাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়ী। তবে উদার, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশের যে স্বপ্ন তাদের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছিল, তারা এখন সবাই ওই পথের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকের যাত্রী। যুক্তির কথা, সহমর্মিতার ভাষা, ভালোবাসার স্বপ্নের বিপরীত পথের অগ্রগামী পথিক। শঙ্কা জাগছে, ১৯৩০-এর দশকের পর উদার গণতন্ত্র এখনই সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে পড়েছে। অবশ্য কারো কারো মতে, পরিস্থিতি এখনো তত খারাপ হয়নি; বরং সামনে আরো খারাপ দিন আছে। কিছু দিনের মধ্যে ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ ৯টি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এগুলো ইউরোপকে বদলে দিতে পারে। সেই স্রোত পৃথিবীর প্রতিটি কোণে অনুভূত হতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সে নির্বাচন হবে আগামী এপ্রিল-মে মাসে; অস্ট্রিয়ায় ডিসেম্বরে। সেখানে নাৎসিদের প্রতিষ্ঠিত কট্টর অভিবাসনবিরোধী, মুসলিমবিদ্বেষী ফ্রিডম পার্টিই ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এবং তা বেশ বড় ব্যবধানেই। জার্মানিতে নির্বাচন অক্টোবরে। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী ‘আলটারনেটিভ ফর জার্মান পার্টি’ বেশ ভালো ফল করেছে। অ্যাঙ্গেলা মারকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির করুণ অবস্থা ফুটে ওঠেছে। উদার অভিবাসননীতির কারণেই তার এই দশা হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। ইতালিতে ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হবে। ডিসেম্বরের গণভোটে হেরে গেছে প্রধানমন্ত্রী ম্যাত্তিও রেনজির দল। সেখানে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট ভালো ফল করতে পারে।
তা হলে কী ফরাসি বিপ্লব যে স্বপ্নের হাতছানি দিয়েছিল, সেটির অবসান হতে চলেছে? ফরাসি বিপ্লবে কেবল প্যারিসের নয়, সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ছিল। নেপোলিয়নের রাজকীয় সেনাবাহিনী ফ্রান্সের সাথে সাথে মুক্তি, সাম্য আর ভ্রাতৃত্ববোধের গৌরবও প্রচার করেছিল। অবশ্য মনে রাখতে হবে, এর কয়েক দশক পর ঐক্যবদ্ধ জার্মানিতে যে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়, তা বিশ্বের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর জয়ধ্বনি তোলা হয়। জাতীয়তাবাদের উপাদান কোনো না কোনোভাবে সব সমাজেই ছিল এবং রয়েছে। রাষ্ট্র, নাগরিক এবং বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য এর দরকার রয়েছে বলেই মনে করা হয়।
কিন্তু এখন অনেক দেশই সর্বজনীন, নাগরিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি উদারনৈতিক চেতনা প্রত্যাখ্যান করে একই রক্ত ও একই মাটিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের দিকে ছুটছে। সবাইকে নিয়ে, সবার সাথে এগিয়ে যাওয়ার নীতি বাদ দিয়ে নিজেরা আরো জমাটবদ্ধ হয়ে অন্যদের দূরে ঠেলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
তাহলে কি নাৎসিবাদের মতো উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসছে? ১৯৩০-এর দশকের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। উত্তর কোরিয়ার মতো দুই একটি দেশ বাদ দিলে সর্বগ্রাসী, সর্বব্যপ্ত একনায়কতন্ত্র অন্য কোথাও নেই। কিন্তু তবুও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের স্রোত বইছে বিপুল বেগে; কিন্তু অন্যভাবে; তবে এখানেও মিল আছে। হিটলার, মুসোলিনিরা ভোটে জয়ী হয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এখনকার সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ভোটেই তারা নির্বাচিত হচ্ছেন। আর যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি, সেখানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা উন্নয়নের কথা বলছেন, অনেক সময় অন্ন, বস্ত্র নিশ্চিত করার কথা বলে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে? প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই ঘোরাফেরা করছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৬১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ভাবনাটি জোরালো করেছে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার করার মতো ঘোষণা জোরেসোরে দিয়েই তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটে জয়ের জন্য জাতিগত বা বর্ণগত সংহতি কাজে লাগানোর চেষ্টা একেবারে নতুন নয়। এই ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও তা করেছেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট বাগাতে তিনি একবার বলেছিলেন, মিট রমনি পাস করলে ‘আবার তোমাদের শৃঙ্খলে বাঁধবেন।’ তবে সেটা ওই একবারই; সেটা তেমন জোর পায়নি। আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসে ট্রাম্পের মতো উগ্র স্লোগান আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী দেননি। তার কথা আর কাজের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু হবে, কেউ জানে না।
ট্রাম্পের জয় বিশ্বজুড়ে সমমনা নেতাদের উৎসাহিত করেছে। যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির নাইজেল ফারাগে, বেক্সিটের অন্যতম পুরোধা, ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের সাথে দেখা করে তাকে অভিনন্দিত করে এসেছেন। হাঙ্গেরির অভিবাসনবিরোধী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান উল্লসিত হয়ে বলেছেন, ‘আমরা আসল গণতন্ত্রে ফিরতে পারি… কী সুন্দর পৃথিবী!’
এই ফলাফল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। ফরাসিরা এখন ধরে নিতে পারে আগামী বছরের নির্বাচনে ন্যাশনাল ফ্রন্টের ক্যারিশমেটিক নেতা ম্যারিঁ লে পেন হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। এর মানে বিশ্বায়ন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ফ্রান্সের সরে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। লে পেন আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ফ্রান্সকে ইউরো থেকে সরিয়ে আনবেন, ইইউ’র সদস্যপদ থেকে বের হওয়ার জন্য ফ্রেক্সিটের ব্যবস্থা করবেন। ফ্রান্সের বিদায় মানে একক ইউরোপিয়ান মুদ্রারও পতন। আবার ফ্রান্সের সরে যাওয়া মানে ইইউ’র নিশ্চিত মৃত্যু।
অথচ মাত্র কিছু দিন আগেও ইউরোপিয়ান এলিটরা মনে করেছিলেন, জাতীয় পরিচিতি লুপ্ত হয়ে মহাদেশীয় চরিত্র রূপ নেবে। কিন্তু ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, হাঙ্গেরির ফিদেজস, পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টি, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি তাদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দিয়েছে। মিস লে পেনের কথাই মূলত তাদের মুখ দিয়েও উচ্চারিত হচ্ছে। ফ্রান্সকে আবার গ্রেট করার বুলি কপচিয়ে তিনি মাত করতে যাচ্ছেন।
ট্রাম্পের মতো মুসলিম অভিবাসীবিরোধী কথা খোলামেলাভাবে লে পেন বলেন না। আইনজীবী হওয়ার কারণে তিনি আইনের মারপ্যাঁচ ভালোই জানেন। তিনি কেবল জানিয়েছেন, তিনি প্রকাশ্য জীবন থেকে ধর্মকে সরিয়ে রাখবেন। তবে আসলে তিনি কী চান, তার একটা মহড়া হয়েছে ২০১৫ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনের সময়। তখন দুই নারীকে সামনে আনা হয়েছিল। একজনের গালে ছিল তিন রঙা ফরাসি পতাকা আঁকা, অপরজন বোরকা পরা। দুজনের সামনে লেখা ছিল : ‘প্রতিবেশী হিসেবে কাকে চান, তার আলোকে ভোট দিন।’
অভিবাসীবিরোধী অবস্থান থেকে সুইডেনও পিছিয়ে নেই। ২০১০ সালে জাতীয়তাবাদী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটস বলেছিল, মুসলিম ঢলের কারণে তাদের কল্যাণ তহবিলে অর্থের টান পড়ছে। অভিবাসীবিরোধী স্লোগানের জেরেই দলটির জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়ছে।
নেদারল্যান্ডসের গির্ট উইল্ডার্সও মুসলিমবিরোধী নেতা। তিনিও তার দেশে বেশি মুসলিম দেখার আশা করছেন না। আগামী মার্চের নির্বাচনে তার দল প্রথম না হলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার জাতীয়তাবাদী স্লোগান। দেশটি নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও ক্রিমিয়া দখল করে নেওয়া, ইউক্রেনের একটি অংশে হামলা চালানো রুশদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীনের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। সেখানেও শি জিনপিং ‘চীনা স্বপ্ন’ দেখাচ্ছেন। সেখানে দেশপ্রেম শিক্ষার আয়োজন চলছে প্রাথমিক থেকে ডক্টরেট পর্যায় পর্যন্ত। চীনারা মনে করছে, তার হাত ধরে আবার মহাচীন বাস্তবে ধরা দেবে।
মিসরের স্বৈরতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসি দেশের সব সম্পদ ব্যয় করছেন এই আইডিয়া প্রচার করতে যে, তিনিই তার জাতির পিতা। তার সরকার সবকিছুর জন্যই ইসলামপন্থীদের দায়ী করছেন। এমনকী গত বছর আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবল বর্ষণের পর বন্যা দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুসলিম ব্রাদারহুডকে দায়ী করে বলেছিল, তারা সব ড্রেন বন্ধ করে দিয়েছে। নিজেকে ফারাওদের সমমর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই মূলত তিনি মহা-জাকজমকের সাথে ৮ শ’ কোটি ডলারের নতুন সুয়েজ খালের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন করেছেন।
তুরস্কের রজব তাইয়েব এরদোগান ‘নতুন তুরস্ক’ গড়ার পথে এগুচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ১৪৫৩ সালের কনস্টানটিনোপল জয়ের বার্ষিকীতে বিশাল সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেকেই বলছে, তিনি বিরোধীদের নির্মূল করতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন।
ভারতে ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল বিজয় ঘটে। নরেন্দ্র মোদির হিন্দুৎভায় বা হিন্দুত্ববাদিতায় অহিন্দুদের স্থান রয়েছে অতি সামান্যই। সর্বগ্রাসী হিন্দুত্ব থেকে কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে সেক্যুলারবাদীদের কোণঠাসা করে ফেলছে।
এমনটা কেন হচ্ছে? অনেক তত্ত্বের কথাই বলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়া। উন্নত দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি যত কমছে, বৈষম্য তত বাড়ছে, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও পাল্লা দিয়ে হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষিতরা হয়তো ভালোই করছে, কিন্তু কায়িক শ্রমিকদের অবস্থা করুণ হচ্ছে। আউটসোর্সিং উন্নত দেশের গরিবদের অবস্থা আরো খারাপ করে দিচ্ছে। দায় চাপছে বিশ্বায়নের ওপর। এর বিরুদ্ধে কথা বলে এই কায়িক শ্রমিক শ্বেতাঙ্গ ভোটাররাই জিতিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্পকে। লে পেনও এই সূত্র ধরে আগামী নির্বাচনে ভালো করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোনো কোনোটিতে প্রবৃদ্ধি উচ্চতর মাত্রায় দেখা যায়, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও বেশি মনে হয়। কিন্তু লোভাতুর কর্মকর্তা, নোংরা বাতাস লোকজনকে ভয়ঙ্কর সমস্যায় ফেলছে। সিসি কিংবা পুতিনের মতো জাতীয়তাবাদী লৌহমানবেরা সব ভুল থেকে দৃষ্টি সরাতে সস্তা জাতীয়তাবাদকে ভালোভাবেই ব্যবহার করছেন।
আবার মুসলিম সংখ্যা বড় করে দেখিয়েও উগ্রপন্থীরা ভীতি ছড়াচ্ছে। মুসলিমরা ইউরোপ, আমেরিকা দখল করে নেবে- এমন ভয় সেখানকার লোকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।
আরেকটি কারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও নতুন জাতীয়তাবাদের গতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক আর টুইটার লোকজনকে মূলধারার মিডিয়ার পরিশীলিত তথ্যকে এড়িয়ে সমমনা গ্রুপ তথ্যের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগও থাকে না। আবার যখন যাচাই-বাছাই হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ট্রাম্পের টুইট মুহূর্তেই কোটি কোটি লোকের কাছে চলে যায়।
অর্থনীতি একটা বড় কারণ। একটা কথা অনেকেই জোর দিয়ে বলছেন, উদীয়মান মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা ক্ষমতাসীনেরা পূরণ করতে পারছে না। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত যেভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তা এখন আর কোনোভাবেই হচ্ছে না। অনেকে এর দায়ভার সরলভাবে বিশ্বায়নের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বায়ন নয়, বরং নতুন নতুন প্রযুক্তিই সম্ভবত এর জন্য দায়ী। প্রযুক্তি নিজের কাজটি করছে ঠিকই, কিন্তু আগের সময়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আয় যেভাবে বাড়তো, এখন তা হচ্ছে না। প্রযুক্তি আর জীবনমানকে সেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে না।
তাছাড়া মানুষের প্রত্যাশা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে তারা পাচ্ছে না। ফলে যে ব্যবধান বাড়ছে, তা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, তাদের সন্তানরা তাদের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়বে; এটা তাদেরকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তথা নিজেরা ভালো থাকাটা আমাদেরকে সংকীর্ণ লাভ-লোকসানের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে থাকে। আমরা নিজেরা যখন ভালো করতে থাকি, তখন কিন্তু অন্যরা কে কী করলো, তা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাই না। ওই সময়টাতেই আমরা কিন্তু বঞ্চিত, অভাবগ্রস্তদের দিকে তাকাই, তাদের প্রতি উদার, সহিষ্ণু হই। কিন্তু আমরা যতটুকু পাওয়ার আশা করি, ততটা না পেলে অন্যদের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত হই। তখনই আমাদের নবাগতদের দেখলে ভয় জাগে, মনে হয় তারা বুঝি আমাদের অধিকারটাই কেড়ে নিচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকারজুড়ে অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ দেখা যায়, তার নেপথ্যে এই কারণটিই সক্রিয় বলে অনেকের ধারণা। সেখানকার মানুষজন মনে করছে, তারা বুঝি চাকরি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেড়ে নেবে।
চরম ডানপন্থীরা এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে। আর তাদের বিরুদ্ধে উদারপন্থীরা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। কারণ বন্ধ্যাত্ব তো তাদের আমলেই হয়েছে। অবস্থা আরো করুণ হচ্ছে, তারা যেন নেতৃত্বশূন্যও হয়ে পড়ছে। বিকল্প যেন চোখেই পড়ছে না। ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে উদার গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অনেকে বলেছিলেন, উদার গণতন্ত্রই ইতিহাসের শেষ কথা। কিন্তু ইতিকথার পরও যে আরো কথা থাকে, সেটাই যেন সামনে এসে পড়েছে।
তবে আশার কথাও আছে। উদারমনারাও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার করতে পারে। ফেসবুক, টুইটারকেন্দ্রিক স্রোত হয়তো স্থায়ী হবে না। আবার মূলধারায় ফিরে যেতে পারে সবাই।
আরেকটি আশার কথা হলো, শিক্ষিত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে মাত্র ৫ ভাগ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত, বর্তমানে যায় ৪০ ভাগ; তারা উদার ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য।
আর যে অভিবাসীসহ যেসব কারণে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেটাও নতুন পথে চলতে শুরু করেছে। তরুণরাও কিন্তু ঠিকই উদার পথে ঝুঁকবে। কারণ ওটাই হচ্ছে আশার, প্রত্যাশার, প্রাপ্তির; আর ওই পথই- নিজকে, সমাজকে এবং সমন্বিতভাবে ভালোবাসার পথ!
(আমাদের বুধবার থেকে)

আরও পড়ুন