এই লর্ড কার্লাইলের সংলাপেই যায় আওয়ামী লীগ

আপডেট: 02:26:43 25/03/2018



img

গোলাম মোর্তোজা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনও ইস্যুর অভাব হয় না। হঠাৎ করে লর্ড কার্লাইল চলে আসলেন আলোচনায়। বক্তৃতা, তর্ক-বিতর্কে জমজমাট হয়ে উঠল রাজনীতি। ‘উন্নয়নশীল উৎসব’ সবকিছুকে ছাপিয়ে আলোচনার স্থান দখল করে নিল। উৎসবের এই আমেজে বড়ভাবে আঘাত করল ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ’ সংবাদটি।
ক্যালেন্ডার বলছে, আজ ২৪ মার্চ। এই দিন ক্ষমতা দখল করেছিল এরশাদ। ‘স্বৈরাচার’ বলতে মানুষ এরশাদকেই বোঝে। জিয়াউর রহমানও সামরিক শাসক ছিলেন।তবে ‘স্বৈরাচার’ খেতাব পাননি। ৯০ সালে গণআন্দোলন- নূর হোসেন, সেলিম, দেলোয়ার, বসুনিয়া, দীপালি সাহা, ডা. মিলনদের রক্তের বিনিময় স্বৈরাচার পতন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ- বিএনপির ভুল- অনৈতিক রাজনীতি পতিত স্বৈরাচারকে পুনর্বাসিত করেছে। স্বৈরাচার এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।
গতকাল ২৩ মার্চ আন্তর্জাতিকভাবে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ বা ‘একনায়কতান্ত্রিক’ খেতাব পেয়েছে বাংলাদেশ। এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ২৮ বছর পর, দেশ আজ আবার স্বৈরতান্ত্রিক পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছে।
আর একটি বিষয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কিছুদিন ধরে একটি অদ্ভুত ধারা তৈরি হয়েছে। ‘অমুক আন্তর্জাতিক সংস্থা’- এই খেতাব দিয়েছে। ‘অমুক টেলিভিশন’ এই সংবাদ প্রচার করেছে। ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম’ এই বলেছে। এর মধ্যে কোনোটির অস্তিত্ব আছে, কোনোটির অস্তিত্ব নেই। তা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা চলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো আলোচনা চলছেই, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তথ্যহীন সংবাদ প্রকাশ করছে অনেক গণমাধ্যম। তার ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব বা প্রপাগাণ্ডা অনেক মানুষের মনে ভিত্তি পেয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের এই ভূমিকা নিয়ে নিশ্চয় এক সময় গবেষণা বা বিশ্লেষণ হবে। বিস্তারিত নয়, আজকে কথা বলব লর্ড কার্লাইল, তাকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি চলছে তা নিয়ে।
১. লর্ড কার্লাইল একজন ব্রিটিশ। যুক্তরাজ্য লর্ড সভার সদস্য এবং নামকরা আইনজীবী। হঠাৎ করে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হলো, লর্ড কার্লাইলকে বেগম খালেদা জিয়ার মামলার আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুরু হলো বিতর্ক। কেন লর্ড কার্লাইল, কে লর্ড কার্লাইল?
‘লর্ড কার্লাইল যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে বিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, তিনি জামায়াত ঘেঁষা, তিনি জামায়াত’- আওয়ামী লীগের ছোট-বড় নেতা, নাগরিক সমাজের অনেকে এই কথা বলতে শুরু করলেন।
সঙ্গে এই প্রসঙ্গগুলোও আসল, বিএনপির আইনজীবী প্যানেলের উপর কি খালেদা জিয়ার আস্থা নেই? ঢাকার নেতৃত্ব কি জানতেন লর্ড কার্লাইলের নিয়োগের বিষয়টি? ঢাকার আর লন্ডনের নেতৃত্বের মধ্যে অবিশ্বাস-বিরোধ কি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্নগুলো যে একেবারে ভিত্তিহীন নয়, রাজনীতির খোঁজ-খবর যারা রাখেন তাদের কেউ প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে স্বীকার করবেন।
লর্ড কার্লাইল একজন পেশাদার আইনজীবী। খালেদা জিয়ার মামলার আইনি পরামর্শ দেবেন অর্থের বিনিময়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাও নিশ্চয়ই অর্থের বিনিময়েই। এ কারণে কি একজন পেশাদার আইনজীবীকে বলে দেওয়া যাবে, তিনি জামায়াত বা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে? এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশের সব আইনজীবী অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ বা আইনজীবীর কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টির যে আবেগ, একজন ব্রিটিশ বা আমেরিকানের কাছে তো তা একই রকম হওয়ার কথা নয়।
তারপরও বলব, বাংলাদেশের প্রেক্ষিত-বাস্তবতা বিবেচনায় লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ দেওয়ার আগে বিএনপিকে অনেক কিছু ভেবে নেওয়া দরকার ছিল। বিচক্ষণ হলে, লন্ডনভিত্তিক নেতৃত্ব লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ দেওয়ার আগে, ঢাকার নেতৃত্বের সঙ্গে বিষয়টির ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করে নিতেন। তা করা হয়নি। লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ দিলে যে প্রচারণা- প্রপাগান্ডার মুখে বিএনপিকে পড়তে হবে, তা মোকাবিলার সক্ষমতা বিএনপির নেই। যা বিএনপির লন্ডনভিত্তিক নেতৃত্ব বিবেচনায় নেয়নি।
২. সাকা চৌধুরী ছাড়াও, জামায়াতের কারণে বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘আমরাও বিচার চাই’ বললেও, বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় না, জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। গনজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে জামায়াত-হেফাজত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘শাহবাগী’ উল্লেখ করে প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। এতেও বিএনপির ক্ষতিই হয়েছে, লাভ হয়নি কিছুই। হেফাজত পক্ষে ত্যাগ করে সরকারের সঙ্গে চলে যাওয়ায় বিএনপি নেতৃত্বের অদূরদর্শিতাই প্রমাণ হয়েছে।
৩. বিএনপির লন্ডনভিত্তিক নেতৃত্ব যদি মনে করেন, তারাই দল পরিচালনা করবেন, সামনের দিনগুলোতে ভুল সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিপদ শুধু বাড়বেই।
খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির ঢাকার নেতৃত্ব যদি নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে দল পরিচালনা করতে পারেন, বিএনপিতে ভাঙনের সম্ভাবনা কমে যাবে- দল শক্তিশালী হবে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরে বিএনপির যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, শতভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত। যারা বলছেন ‘বিএনপি কিছুই করতে পারল না, পারবে না’ তারা হয় ভুল বলছেন, অথবা উস্কানি দিচ্ছেন।
বিএনপির এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকার ইতিমধ্যে কিছুটা বিপদে পড়ে গেছে। ফলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করে, বিএনপিকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করার চেষ্টা চলছে। বিএনপি শান্তিপূর্ণ পথে থাকলে, সরকার ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়বে। যে কোনো সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হলে, বিএনপি ভালো করবে। কারচুপি হলে তাও প্রকাশিত হবে।এতে জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের উপর দেশি-বিদেশি চাপ বাড়বে।
সরকার যদি বিএনপিকে কোনও বড় সমাবেশের অনুমতি নাও দেয়, ছোট ছোট কর্মসূচি যদি দমন করে, তাতে বিএনপির শক্তি কমবে না, বরং বাড়বে। নির্বাচন কমিশনের উপর সরকারের যত নিয়ন্ত্রণই থাক, তফসিল ঘোষণার পরের তিন মাস বিএনপি নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারবে। সেই বিএনপিকে মোকাবিলা করা সরকার বা আওয়ামী লীগের জন্যে শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
৪. লর্ড কার্লাইল প্রসঙ্গ থেকে বিএনপির এসব বিষয় চলে এলো। যুক্তরাজ্যের লর্ড সভায় বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সংলাপের আয়োজন করা হয়, তাতে অংশ নেয় বিএনপি-আওয়ামী লীগ। আগে এই সংলাপ আয়োজন করতেন লর্ড অ্যাভেবরি। তার মৃত্যুর পর গত দুটি সংলাপ আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন লর্ড কার্লাইল। প্রথমবার কার্লাইলের আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান, ব্যরিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।দ্বিতীয়বার গিয়েছিলেন ড. গওহর রিজভী, মশিউর রহমান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি প্রমুখ।
বিএনপির পক্ষ থেকে গিয়েছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা প্রমূখ ।
প্রথম সংলাপটিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লন্ডনে তুমুল তর্ক-বিতর্ক হয় দু’দেশের নেতাদের মধ্যে।
দ্বিতীয় সংলাপটিতে জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানোয় আলোচনা বর্জন করে আওয়ামী লীগ। উল্লেখ যে, লর্ড কার্লাইল আয়োজক বা আমন্ত্রক বলে সংলাপ বর্জন করা হয়নি। বর্জন করা হয়েছে জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে। লর্ড কার্লাইলের আমন্ত্রণেই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ লন্ডনে গিয়েছিলেন। গিয়ে যখন তারা জেনেছেন জামায়াতও আমন্ত্রিত, তখন তারা বর্জন করেছেন। তার আগের সম্মেলনটিতে লর্ড কার্লাইলের আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতৃবৃন্দ লন্ডনে গিয়ে সংলাপে অংশ নিয়েছেন।
এই দুটি সংলাপের কোনোটির ক্ষেত্রেই লর্ড কার্লাইল জামায়াত বা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক, এই প্রশ্ন সামনে আনা হয়নি।
৫. বিএনপি যে লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ দিল, সেটা যতটা না আইনগত তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। ‘খালেদা জিয়া বিচার পাচ্ছেন না, সরকার বিচার প্রভাবিত করছে’- বিএনপির দাবির এই প্রসঙ্গটাই লন্ডন থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরবেন লর্ড কার্লাইল। এর প্রেক্ষিতে সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন।
লর্ড কার্লাইলের সঙ্গে জামায়াত বা যুদ্ধাপরাধীদের সম্পৃক্ততার যে বিষয় সামনে এনে আওয়ামী লীগ কথা বলছে, তার পেছনেও কাজ করছে মূলত রাজনীতিক সুবিধা নেয়ার মানসিকতা। জামায়াত বা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পৃক্তার অভিযোগ এখানে গৌণ।
‘বিএনপি এখনও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আছে’- এই প্রচারণাটা জনমনে ছড়িয়ে দিয়ে সুবিধা নিতে চায় আওয়ামী লীগ। মাঠের রাজনীতিতে সুযোগ না পাওয়ায় পিছিয়ে আছে বিএনপি। কথার রাজনীতিতেও বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের সক্ষমতা বেশি। ফলে আওয়ামী লীগ বা সরকার এগিয়ে আছে, ভালো অবস্থানে আছে- এমনটা মনে হলেও, জনমনে তা খুব একটা গুরুত্ব বহন করছে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কারণ প্রচার বা প্রপাগাণ্ডা যত সংগঠিতভাবেই চালানো হোক না কেন, মানুষের কাছে কোনো তথ্যই এখন আর গোপন নয়। অসত্য তথ্য, সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এখন প্রায় অসম্ভব।
[লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]

আরও পড়ুন