একজন জজ মিয়া

আপডেট: 02:52:57 21/08/2017



img

নাসির উদ্দিন বাদল

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আলোচিত এক নাম জজ মিয়া। সে সময় সিআইডির সাজানো নাটকে গ্রেফতার হওয়া নোয়াখালীর আলোচিত সেই জজ মিয়া আজ সর্বহারা।
নোয়াখালীর সেনবাগ কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের  টেন্ডল বাড়ির জালাল আহমদ জজ মিয়া দীর্ঘ কারাভোগের পর গ্রাম ছেড়েছেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় এক বস্তিতে বসবাস করছেন। জজ মিয়া বাঁচার তাগিদে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করছিলেন। কিন্তু স্বল্প বেতনে তার পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে অন্য কোথাও চাকরির আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সারা দেশে জজ মিয়া আলোচিত হলেও এলাকায় বা আত্মীয়স্বজনদের কেউই তার পরিবারের খোঁজখবর জানেন না। বীরকোট গ্রামের মৃত আবদুর রশিদ ও জোবেদা খাতুনের চার ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে জজ মিয়া দ্বিতীয়। প্রায় একযুগ আগে তার বাবা মারা যাওয়ার পর সামান্য পুঁজি নিয়ে ঢাকার মতিঝিলে ফলের ব্যবসা করতেন জজ মিয়া। ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার নয় মাস পর সেনবাগ থানার এএসআই কবির হোসেন গ্রামপুলিশ মোকছুদ মিয়ার সহায়তায় বীরকোট গ্রামের রাজামিয়ার চা দোকান থেকে গ্রেফতার করেন জজ মিয়াকে। পরে থানা থেকে জজ মিয়াকে সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক দিনের মাথায় জজ মিয়া ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িত বলে স্বীকারোক্তির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নানা নাটকীয়তার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন আদালতে সিআইডির দাখিল করা চার্জশিটে ২২ জনকে আসামি করা হলে অব্যাহতি দেওয়া হয় জজ মিয়াকে। তখন জজ মিয়া মুক্তির বিষয়টি আটকে যায় ঢাকার সূত্রাপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা (১০৮, তারিখ ২৭-১২-৯৮) মামলায়। এ মামলায় কোনোদিন জজ মিয়াকে আদালতে হাজির না করা হলেও ২০০৫ সালের ২ নভেম্বর আদালত তাকে সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘ তদন্তের পর সিআইডির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল জজ মিয়া ওই হামলায় জড়িত। যদিও তখনই এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন মহলে।
এর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তদন্তের মূল রহস্য বেরিয়ে আসে। মামলা ভিন্নখাতে নেওয়ার অভিযোগে তৎকালীন সিআইডির তিন তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আবদুর রশিদ, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও বিশেষ পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে সরকার মামলা করে। সেই সময়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের সঙ্গে অভিযুক্ত করা হয় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে জজ মিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ চার্জশিট দিলেও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তদন্ত শেষে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয় জজ মিয়াকে। দীর্ঘ চার বছর দুই মাস ২৫ দিন কারাভোগের পর ২০০৯ সালের ২০ জুলাই কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জজ মিয়া।
কারামুক্তির পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে বীরকোট তার পৈত্রিক বাড়িতে এসে আত্মীয়দের ঘরে ওঠেন জজ মিয়া। কারণ মামলার ব্যয় বহন করতে গিয়ে ভিটেমাটিসহ সবকিছুই হারাতে হয়েছে জজ মিয়ার পরিবারকে।
গত ২০ আগস্ট রোববার জজ মিয়ার পৈত্রিক নিবাস বীরকোট গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রি হয়ে যাওয়া বসতঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জজ মিয়া জেলে থাকা অবস্থায় তার পরিবার বসতবাড়ির জায়গাটুকু তার চাচাতো ভাই রফিক উল্যার কাছে বিক্রি করে দেয়।
জজ মিয়ার মামলার সাক্ষী বীরকোট গ্রামের সাবেক মেম্বার গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী জানান, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় জড়ানো জজ মিয়া ঘটনার দিন ও সময়ে তার বাড়ির পাশে বাবুলের দোকানে তাদের সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে টেলিভিশনের পর্দায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঘটে যাওয়া গ্রেনেড হামলার দৃশ্য দেখছিলেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে জড়িয়ে তার পরিবারটিকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। এর পর কেউই তার খোঁজখবর রাখেননি। তার মা জোবেদা বেগমের আবেদনের প্রেক্ষিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে গত ২৫ রমজান দুই লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।
জজ মিয়া ও তার পরিবারের দুঃখ-দুদর্শার কথা একে একে তুলে ধরলেন চায়ের দোকানদার বাবুল মিয়া, রাজা মিয়াসহ এলাকার বহু নারী পুরুষ। এক আত্মীয়ের ফোনে জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমার নিরপরাধ ছেলেটিকে ধরে নিয়ে কত নাটক সাজাইছে। আমার পুরো পরিবারটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাড়িঘর বিক্রি করে দিতে হয়েছে। জোট সরকারের আমলে সর্বস্বান্ত হয়ে বর্তমান সরকারের কাছে একটু মাথা গোঁজার জায়গার জন্য বহু আবেদন করেছি। না পেয়ে বর্তমানে বস্তিতে বসবাস করছি।'
ছেলের ভবিষ্যৎ পথ চলা ও নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করলেন মা জোবেদা।
এদিকে বহুল আলোচিত জজ মিয়ার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি বলেন, 'আমাকে নিয়ে সিআইডির নাটকের কথা এদেশের মানুষ জানে। মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো চলে গেছে।' কেঁদে ফেললেন জজ মিয়া।
তিনি বলেন, 'আমি কখনো কোনো রাজনীতি বা দলাদলিতে ছিলাম না। টুকটাক ব্যবসা করে কোনো রকম পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতাম। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সিআইডি কর্মকর্তাদের সাজানো মামলায় আমাকে বলি দেওয়া হয়েছে। তাদের নাটকের বলি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর বর্তমানে আমি নিঃস্ব। সরকারের কাছ থেকে একটু মাথা গোঁজার জায়গা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি চাকরি পেলে সংসার জীবনে পদার্পণ করে সুখী জীবন যাপন করতে পারবো।'
[মানবজমিন থেকে]