একজন ডা. প্রভাত দাশের অবসর

আপডেট: 06:25:30 12/02/2018



img

এসএম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : দীর্ঘ কর্মময় জীবনের ইতি টেনে অবসরে গেলেন পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনপ্রিয় ডাক্তার প্রভাতকুমার দাশ।
ডা. দাশ হাসপাতালকে মন্দির ও রোগীকে দেবতা মনে করে পুরোহিত হয়ে সারাজীবন পূজা করে এসেছেন। সরকারি বিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে চলে যেতে হচ্ছে ‘হাসপাতাল’ নামের মন্দির থেকে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে সোমবার তিনি শেষ অফিস করেন।
একজন ডাক্তার যে সব শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে পারেন, তার অনন্য দৃষ্টান্তপ্রভাতকুমার দাশ। জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সর্বোপরি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় একজন ডাক্তার ছিলেন প্রভাতকুমার। যিনি ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা না করে কর্মময় জীবনের বেশিরভাগ সময় পড়ে থেকেছেন নিজ এলাকায়। সেবা করেছেন এলাকার মানুষের। যখন দেশের চিকিৎসা সেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন, তখন ডা. প্রভাতের সেবা ও আদর্শ নবাগত চিকিৎসকদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
জেলার পাইকগাছা উপজেলার কাটিপাড়া গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন দাশের মেজ ছেলে প্রভাতকুমার দাশ ১৯৮৫ সালে তারিখে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সহকারী সার্জন (ইনসার্ভিস ট্রেইনি) হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। পরে ফরিদপুর, সাতক্ষীরার তালায়, খুলনার পাইকগাছার কাটিপাড়ায় এবং ১৯৯৮ সালে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইওসি (গাইনি ও অবস) প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৯৯ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ২০০০ সালে ডুমুরিয়া, পরে পাইকগাছা-কয়রায় ২০০৩ থেকে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর পাইকগাছায় ফিরে আসেন।
গুণী এই ডাক্তার চাকরি শেষ করলেন নিজ এলাকা পাইকগাছায়। চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময় অবশ্য তিনি তিনি নিজ এলাকায় কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ এই সময়কালে ডা. দাশ তার এলাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন। গর্ভবতী নারী, শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আশ্রয়স্থল। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুরোধে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি সারা দেশের সেরা দশটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে দক্ষিণের প্রত্যন্ত জনপদ পাইকগাছাকে টেনে তুলতে সক্ষম হন। তার বিদায়লগ্নে অনেকেই তাই অশ্রুসিক্ত হয়েছেন।
পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার নার্গিস বানু বলেন, ‘স্যার আমাদের একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন। তিনি একজন চিকিৎসকের পাশাপাশি দক্ষ প্রশাসক ছিলেন।’
উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতা ফোরামের সভাপতি জিএমএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ডা. প্রভাত সব সময় সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছেন। যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি একজন আস্থাভাজন চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।’
পৌরসভার মেয়র সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘চিকিৎসা নয়, অনেক সময় তার ব্যবহারেই অনেক রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন।’
উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী বলেন, ‘ডা. প্রভাত সাধারণ মানুষের জন্য ছিলেন নিবেদিত। তার কর্ম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ অ্যাডভোকেট শেখ মো. নূরুল হক বলেন, ‘ডা. প্রভাত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাণ। তিনি পরিবার-পরিজন ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা না করে সারা জীবন এলাকার মানুষের সেবা করেছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী তাকে অবসরে যেতে হচ্ছে। কিন্তু তার সেবা ও কর্ম এলাকার মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
জনপ্রিয় এ চিকিৎসককে বিদায়বেলা বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা মানউন্নয়ন কমিটির সভাপতি এমপি নুরুল হক জানিয়েছেন।