একের পর এক জাহাজডুবি, সুন্দরবনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আপডেট: 01:58:21 17/04/2018



img

এস এম সামছুর রহমান, বাগেরহাট : সুন্দরবনের পশুর নদীর হারবারিয়া এলাকায় ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় লাইটার কার্গো জাহাজ ‘এমভি বিলাস’। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে বারবার জাহাজ বা কার্গোডুবির ঘটনা পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত। এর ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়াসহ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে সুন্দরবনের পরিবেশ।
জানা গেছে, সুন্দরবনের হারবাড়িয়া এলাকার ছয় নম্বর অ্যাঙ্করেজে থাকা লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি অভজারভার’ ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা নিয়ে মোংলা বন্দরে আসে। জাহাজটি থেকে রোববার (১৫ এপ্রিল) ভোরে কয়লা নেওয়া হয় ঢাকার ইস্টার্ন ক্যারিয়ার নেভিগেশনের মো. সোহেল আহম্মদের ‘এমভি বিলাস’ কার্গো জাহাজে। ইট ভাটা ও সিরামিক কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী কয়লা খুলনার দুলাল এন্টারপ্রাইজের জন্য নিয়ে কার্গো জাহাজটি রাজধানীর মিরপুরের পথে রওনা দেয়। কিছু দূর এগোনোর পরই ডুবোচরে ধাক্কা লেগে তলা ফেটে ডুবে যায় এমভি বিলাস।
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘কয়লার জাহাজডুবিতে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীদের অস্তিত্বসহ জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। কারণ এ কয়লা সাধারণত ইট ভাটাগুলোতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব কয়লায় সালফারের পরিমাণ বেশি থাকায় তা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।’
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো জাহাজ ডুবলে তার ভেতরে থাকা তেল বা মবিলও পানির সঙ্গে মিশে যায়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা বা তেলবাহী কার্গো জাহাজডুবির ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে, ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে ডুবে যায় তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন। ২০১৫ সালের ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবে যায় সার বোঝাই কার্গো জাহাজ এমবি জাবালে নূর। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের শরণখোলার রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবতে ডুবতে অন্য কার্গোর সহায়তায় মোংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় আরেকটি কয়লা বোঝাই কার্গো। ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সুন্দরবনের পশুর নদীতে ৫১০ মেট্রিন টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় এমভি জিয়া রাজ। পরের বছরের ১৯ মার্চ বিকেলে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর ‘হরিণটানা’ বন টহল ফাঁড়ির কাছে এক হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি সি হর্স-১ ডুবে যায়। ২০১৭ সালের ৪ জুন দিবাগত রাতে হারবারিয়া চ্যানেলে ৮২৫ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল স্লাগসহ এমভি সেবা নামে আরেকটি কার্গো জাহাজ তলা ফেটে ডুবে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা বা তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এমন কয়লাবাহী জাহাজের যাতায়াত আরো বাড়বে। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়বে। সুন্দরবনের সুরক্ষায় তাই এখনই সরকারকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।
ড. ফরিদ বলেন, ইউনেস্কো তাদের গত বাৎসরিক সভায় বড় ধরনের কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে সরকারকে একটি কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সরকার এখনো তা করেনি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও সার্বিকভাবে সুন্দরবনের সুরক্ষায় এটা যত দ্রুত সম্ভব করা উচিত।
কয়লার কারণে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দীলিপকুমার বলেন, কয়লায় সালফার থাকে। সেই সালফার পানিতে মিশলে পানির পিএইচ মাত্রা কমে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনা বেশি বেশি ঘটতে থাকলে বড় ধরনের ক্ষতিই হবে। গত কয়েকবছর ধরে তো এমন দুর্ঘটনা বারবারই ঘটছে। ফলে এ বিষয়ে আরো সতর্ক হওয়া দরকার। বিকল্প রাস্তা দিয়ে কয়লা পরিবহনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন