এক উন্মাদের জীবনকাহিনি

আপডেট: 08:43:16 27/11/2016



img
img

বেনজীন খান

এক.
দুই হাজার সাল। আমি তখন বসতাম যশোর জিলা স্কুলের সামনে বটতলায়। চঞ্চলের ছিলো চায়ের দোকান। চা পান করতাম আর মানুষের সাথে গল্প করতাম। আমার ছোটো, বড়, সমবয়সী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চাকরিজীবী, বেকার তথা নানা পেশার মানুষ এসে বসতো আমাদের আড্ডায়। প্রখররোদে ক্লান্ত পথিক এই বটগাছের ছায়ায় দুদণ্ড বসে বেশ মজাই পেতো। ফলে আমার আড্ডায় সদস্যের অভাব হতো না। তারা চা-বিড়ি খেতো আর আমাকে নানা প্রশ্নও করতো। এক পর্যায়ে বটতলার এই শীতল মায়াবি ছায়াকে মানুষ নাম দিলো 'শান্তিতলা'। এই শান্তিতলায় আমাদের আড্ডায় যখন ক্রমান্বয়ে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগলো তখন দোকানদার চঞ্চল কাঠের বেঞ্চ-টুলের ব্যবস্থা করলো। চঞ্চলের বাবাও এক পর্যায়ে আমার আড্ডার সদস্য হয়ে গেলো। যখন কেউ থাকতো না বা অন্যরা এখনো এসে পারেনি তখন তিনি হিন্দু শাস্ত্রীয় কিছু গুপ্ত বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতেন। আমি শুনতাম, ভালই লাগতো। একদিন সন্ধ্যায় চঞ্চলের বাবা বললেন, কাল উনাকে দেখা গিয়েছিলো এখানে। এখানে বসা কি ঠিক হবে! বললাম, উনাকে মানে? চঞ্চলের বাবা থতমত খেয়ে গেলো। সে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝানোর চেষ্টা করছিলো। এক পর্যায়ে আমিও বুঝেছিলাম কিন্তু ধরা দিইনি! দেখি- তিনি কী করেন! অন্ধকার আরো ঘনিয়ে আসলো, আমাদের আড্ডার সদস্যরাও একে একে আসা শুরু করেছে। আড্ডা জমে উঠলো। চঞ্চলের বাবা চায়ের দোকানে নজর দিলো। পরের দিন সকালে বাসা থেকে নাস্তা সেরে শান্তিতলায় গেছি চা খেতে। চঞ্চলের বাবা তখন একা ছিলো। আমি আসাতে দু'জন হলাম। স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি আমায় বললেন, কাল রাত বলে বলিনি। রাতে উনার নাম বলতে নেই তাই বলিনি। কালকে আমি মা মনসা দেখে ছিলাম এখানে। আমি বললাম, মানে? মানে জাতসাপ! কোথায় ছিলো? এই যে, এই ডাল বেয়ে নেমে এই আপনি যেখানে বসেন এখান দিয়ে গড়িয়ে ওই ফোকড়ের মধ্যি চলে গেলো। তাই বলছিলাম কোনো সমস্যা হয় কি না! বললাম, কোনো সমস্যা হবে না, দাদা। আমরাতো খারাপ লোক না। দেন, চা দেন। চা খেয়ে বাড়ি চলে এলাম। সন্ধ্যা সাতটার দিকে যথারীতি গেলাম শান্তিতলায়। দেখলাম অন্যরকম পরিবেশ। বটগাছের গোড়ায় ঢালু জাইগাটিতে মাটি দিয়ে সমান করে লেপে শুকিয়ে সেখানে একটি নতুন বস্তা পেড়ে রাখা হয়েছে। কী ব্যাপার! দাদা, এত পরিপাটি, গোছানো আবার বস্তাপাড়া? বললেন, আপনার বসতে কষ্ট হয় তাই... এর আগে আমি আমার চামড়ার স্যান্ডেল বিছিয়ে তার উপর বসতাম। ভাবলাম, আমাদের কারণে অনেক চা-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে, সে জন্যই কি এই যত্ন! অথচ গতকাল যখন তিনি সাপের কাহিনি বলছিলেন তখন ভেবেছিলাম, আসলে আমাদের কারণে এই দোকানে অনেক ধরনের কাস্টমার বিশেষ করে ছোটো ছেলেরা চা-সিগারেট খেতে আসতে পারে না সে জন্যই কি আমাদের এখান থেকে উঠিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন? এখন দেখলাম, আমার ভাবনার কোনোটাই ঠিক না। আসলে আমরা মধ্যবিত্তরা সব সময়ই সন্দেহপ্রবণ! আর নিজের থেকে কোনো কারণে একটু ছোটো বা কথিত নীচ দেখলেই আন্ডারমাইন্ড করি, এটা মধ্যবিত্তের নিকৃষ্টতা। এখন থেকে এই বস্তার উপরেই আমি আসন গেড়ে বসি। আর আড্ডার সকল সদস্যরা গোল হয়ে মুখোমুখি থাকি। এ আড্ডা চলতো কখনো কখনো রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্তও। আমরা এতটায় মশগুল থাকতাম আলোচনায় যে, আশপাশের কোনো কিছুতেই আমাদের মনোযোগ থাকতো না।

দুই.
আমি মাঝে মধ্যে খেয়াল করি একজন পাগল আড্ডাবাজদের পিছে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আনুমানিক ৪৫/৫০ বয়স হবে। খুবই কালো গায়ের রং, এলোমেলো মাথার চুল, কখনো খালি গা, কখনো বোতাম ছেঁড়া হাতালম্বা শার্ট, পরনে মাজায় দড়ি দিয়ে বাঁধা চেইন ছেঁড়া এক পা গোটানো ফুলপ্যান্ট। পায়ে জুতা ব্যবহারের কোনো চিহ্নই নেই। স্নান যে সে জীবনে কবে করেছে, হয়তো ঈশ্বরও এখন আর তা বলতে পারবেন না। প্রায়ই দেখি এমনি চুপচাপ সে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ তাড়াও দেয়- যাও যাও অন্য দিকে যাও। এক পর্যায়ে সেও চলে যায় অন্যদিকে। পাগলটাকে শহরের অধিকাংশ মানুষই চেনে। ও থাকে জিলা স্কুলেরই পাশে সার্কিট হাউজের সামনে একটি পাবলিক যাত্রীছাউনিতে। রোটারি ক্লাব অফ যশোর এর নির্মিত এই ছাউনিটি নির্মাণে আমারও একটু সম্পৃক্ততা আছে। কেননা, তখন আমি রোটারি ক্লাবের অঙ্গ সংগঠন ইন্টারএক্ট ক্লাব অফ যশোর এর চার্টার্ড প্রেসিডেন্ট। এক চালা টিনের এই ছাউনিটির চারিপাশেই খোলা। কনকনে শীত, কাঠফাটা রোদ, তুমুল ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও এই ছাউনিই পাগলটির আশ্রয়। তাকে আরো বেশি চিনতো মানুষ যে কারণে, তা হলো সারা শহরের দেয়ালে যত পোস্টার আছে সিনেমা, রাজনৈতিক দল, পণ্যের বিজ্ঞাপন সবই সে ছিঁড়তো। কিন্তু ছড়াতো না, ফেলে দিত না। খুব সযতনে ছেঁড়া পোস্টারগুলো সে বগলদাবা করে কখনো কখনো পরিধানের ছেঁড়া লুঙি বা গায়ে জড়ানো কম্বলে বেঁধে পিঠে করে তার আশ্রয়ে নিয়ে আসতো। এসবই ছিলো একজন পাগলের জন্য খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু আমার বাড়ি পাগলের আশ্রয় থেকে প্রায় ৩০০ গজ মত দূরে থাকায় আমি দেখতে পেতাম বাড়তি কিছু! দু'পা দু'দিকে ছড়িয়ে দিয়ে মাঝখানে ছেঁড়া পোস্টারগুলো রেখে এবার সে টুকরো করতো। কিন্তু লক্ষ করেছি সে টুকরোগুলোর মধ্যে ছিলো জ্যামিতি। প্রতিটি টুকরাই হতো একই মাপের অথচ চার কোণা, আয়তক্ষেত্রবিশিষ্ট, যেনো টাকা। আমি প্রবেশ করি আরো রহস্যে! দেখি এবার সে কথিত টাকা গুণতে থাকে! বার বার গোণে। আবার মেশায়, আবার গোণে। তার পর করুণ দৃশ্য! দু'হাত দিয়ে আপন মুখমণ্ডলের দুই চোয়ালে বেদম চড়াতে থাকে। ফুলে পড়ে মুখ, চোখ। রক্তাক্ত হয়ে যায় নাক ও চোখের কোণা! দুপুরে প্রায়ই দেখা যায়, ছাউনি থেকে নেমে এসে রাস্তার ধারে মাটিতে পা দিয়ে প্রথমে ধুলাবালি সমান করে নেয়। তার পর পা দিয়েই সে আঁকতে থাকে ম্যাপ! সেখানেও সুনিপুণ জ্যামিতি। আয়ত ও বর্গক্ষেত্রের মিশেল। না, হলো না, যেন মিললো না! পা দিয়ে সবই মুছে ফেললো। মনে হলো আগুন ধরিয়ে দিলো ঘরে অথবা পানিতে ভাসিয়ে দিলো সাধের ভিটে-বাড়ি-জমিন! তার পর মারামারি নিজের সাথে! চোখে মুখে আবারও রক্ত! গভীর রাতে সে কাঁদে! হু হু করে কাঁদে, চিৎকার করে কাঁদে! আর গালাগালি করে, পরিষ্কার বুঝা যায় মুখ খিস্তি। কিন্তু অপরিচিত তার ভাষা।


তিন.
একদিন দুপুরে বসে আছি শান্তিতলায়। চঞ্চল দোকান বন্ধের আয়োজন করছে, দুপুরে খেতে যাবে বাড়ি। বললাম, শেষ আর এক কাপ চা দিয়ে যা। চঞ্চল চা বানাচ্ছে। কেন জানি একটু আনমনা ছিলাম। হঠাৎ দেখি, সামনে এসে দাঁড়ালো পাগলটি। আজ বেশি ছন্নছাড়া মনে হলো তাকে। খালি গা। পরনে একটি কমলা রঙের কম্বল। যাত্রিছাউনির সমস্ত ধুলা-বালিই আজকে ওর গায়ে। কম্বলটি এত ময়লা হয়েছে যে, যেনো কমলা পচে গন্ধ বের হচ্ছে। হেয়ালি করে বললাম, কিয়া বাত? আশ্চর্য! খুবই মৃদুসুরে ও বললো, কই বাত নেহি। আমি বললাম, কী দরকার? কোনো কথা নেই। নীরব দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ঘনঘন চঞ্চলের দিকে তাকাচ্ছে। এ সময় চঞ্চল আমাকে চা দিলো। পাগল আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বললাম, পিয়ে? ও বললো, নেহি। আশ্চর্য! তবে কী চায় ও! চঞ্চল বললো, বিড়ি চাচ্ছে। বললাম, তা দে একটা। চঞ্চল, দেয়া যাবে না। প্রত্যেক দিন কতবার বিড়ি নিতি আসে জানেন? আমি বললাম, দে, এক প্যাকেট বিড়ি দে, আমি দাম দেবো। চঞ্চল এক প্যাকেট বিড়ি দিতে গেলো কিন্তু পাগলটি 'নেই' বলে আমার দিকে বাম হাতের এক আঙুল উঁচিয়ে দেখালো। চঞ্চল বললো, ও একটা বিড়ি নেবে। বললাম, তাই দে। আর এখন থেকে প্রতিদিন যতগুলো বিড়ি নেবে, দিবি। আমি আসলে জানাবি কয় টাকা হলো। চঞ্চল একটা বিড়ি দিলো। বিড়ি নিয়ে পাগলটি দাঁড়িয়ে আছে। আবারও একবার আমার দিকে আর একবার চঞ্চলের দিকে তাকাচ্ছে। আমি বললাম, আওর কুচ? পাগল চঞ্চলের দিকে তাকালো। চঞ্চল বললো, চুন চাচ্ছে। বললাম, দে। চুন পেয়ে খুব খুশি। চলে যাচ্ছে সে। কী মনে হলো জানতে চাইলাম, তোমারা নাম কিয়া হ্যায়? বললো, 'লালমোহন'! এত মৃদু সে উচ্চারণ যে ঠিকমতো শোনাও গেলো না। আবার জানতে চাইলাম, নেই সামস্তে ফেরছে বুলাও? বললো, লালমোহন। সেই একই রকম উচ্চারণ! বুঝে নিলাম আর কী। পাগলের নাম, লালমোহন। লালমোহন চলে গেলো। চঞ্চল চলে গেলো। একটু পরে আমিও উঠে গেলাম। দেখি, যথারীতি লালমোহন তার আশ্রয়ে বসে আছে দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে, আর গভীর মনোযোগের সাথে মাথা নিচু করে কী যেনো করছে। আমি আস্তে করে পিছু যেয়ে দাঁড়ালাম। দেখি, বিড়ির তামাক বের করে তার সাথে চুন মিশিয়ে ডান হাতের তালুতে নিয়ে বাহাতের আঙুল দিয়ে ডলছে। মনে পড়লো হিন্দি সিনেমা 'সোলে'তে গব্বার সিং এর খৈনি বানানোর দৃশ্য। বুঝলাম, এই পাগল লালমোহন, বাঙালি নয়। রহস্য যেমন আরো ঘনীভূত হচ্ছে, আমার আগ্রহও তেমন আঠালো হচ্ছে।

চার.
এক দিন বিকালে চোখে পড়লো এক অদ্ভুত ঘটনা! এক পাগলি এসে জুটেছে লালমোহনের আশ্রয়ে। পরনে তার হাঁটুর উপর পর্যন্ত উঠানো একটা ময়লা, ছেঁড়া কাপড় জড়ানো। শরীরের উপর অংশ নগ্ন। স্বাস্থ্য তার যেনো হাড়ে চামড়া জড়ানো। স্তন শুকিয়ে বুকের সাথে মিলিয়ে গেছে, যেনো কোনোদিনও তা দুধ ধারণ করেনি! বিন্দুমাত্র ঝুলে পড়া চামড়ারও কোনো চিহ্ন নেই! মাথার চুল, কপাল, আর মুখের গড়নই কেবলমাত্র সে যে পাগলি, তার স্বাক্ষর বহন করছে। মুশকিল হলো, লালমোহন যেমন কোনো কথাই বলে না, তেমনি পাগলিটি এক মুহূর্তেও মুখ বন্ধ রাখে না। অনর্গল সে বলে চলেছে। রীতিমতো ঝগড়া। কী বলছে, কাকে বলছে আমি আর লালমোহনতো দূরের কথা হয়তো ঝগড়াটি নিজেও জানে না। খেয়াল করলাম, সমস্যা আমার কাছে মনে হলেও লালমোহনের কাছে না। যেনো, তার আশ্রয়ে কেউই আসেনি। কোনো কথা, চিৎকার, ঝগড়া-ঝাটির কোনো কিছুই হচ্ছে না। লালমোহন দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে যথারীতি দুপুরের সংগৃহিত কাগজগুলো সাইজ করছে। মুখের ভিতরে জিহ্বা দিয়ে চোয়ালের এপাশ ওপাশ ফুলিয়ে তুলছে। কিছুক্ষণ পরেই শেষ অংশ শুরু করলো সে। চিৎকার, হিজিবিজি গালিগালাজ আর নির্মমভাবে আঘাত করছে অপরাধিকে যেনো সে বসে ছিলো আপন চোয়ালে। হড় হড় করে রক্ত বের হলো নাক দিয়ে, চোখ লাল আর মুখ ফুলে পড়লো। আশ্চর্য! পাগলের এহেন আচরণ যখন আমাকে দুমড়ে, মুচড়ে, কুঁকড়ে তুলছিলো ঠিক তখন পাগলির দৃশ্য ছিলো, যেনো জীবনের মহাআনন্দ এসে কড়া নেড়েছে তার দুয়ারে। সে দাঁড়িয়ে নাচা শুরু করলো। আর অশ্রাব্য সব অস্পষ্ট বাংলা ছুড়ে দিতে লাগলো সার্কিট হাউজের দিকে। ভাবলাম, সার্কিট হাউজের দিকে কেন?

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন