এনজিওর ঋণ নিতে বাধ্য হন না এই নারীরা

আপডেট: 07:18:58 15/02/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : আর দশটা গ্রামের মতোই সাদামাটা জনপদ যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বারবাকপুর।
গ্রামের অধিকাশ মানুষের পেশা কৃষি। ধান, পাট আর বিভিন্ন ধরনের সবজি তাদের প্রধান ফসল। বাণিজ্যিকভাবে তারা সবজি চাষ করেন। এ সব সবজিতে তারা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন।
তবে এই গ্রামেরই কয়েক নারী ব্যতিক্রম। তাদের একজনের নাম কল্পনা। বারবাকপুর গ্রামে কল্পনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতবাড়ির ভিটেয় বিষমুক্ত নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন সবজি চাষ করেছেন তিনি। শুধু সবজি নয় কল্পনার বাড়িতে আছে গাভি, হাসঁ, মুরগি।
তিনি জানান, ক্ষেতের সবজি বিষমুক্ত না হওয়ায় তিনি নিজ উদ্যোগে এ চাষ শুরু করেন; যা পরিবারের চাহিদা মেটায়। আর গাভির দুধ তার পরিবারের চাহিদা মেটাচ্ছে। চারটি হাঁস ও পাঁচটি মুরগি রয়েছে তার। ফলে বাজারের মাংস-ডিম না কিনলেও চলে। কল্পনার দাবি, এর ফলে ভেজালমুক্ত খাবার পাচ্ছে তার পরিবার। আর নিরাপদ সবজি চাষের জন্য কল্পনা বাড়িতে উৎপাদন করেন কম্পোস্ট সার।
কল্পনার মতো আরো কয়েক নারী একই পথ অবলম্বন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কল্পনা বেগম, নাজমা বেগম, খালেদা খাতুন, শারমিন, ইয়াসমিন আরাসহ ২০ জন মিলে গড়ে তুলেছেন ‘সাধারণ উপকার ভোগী’ (সিআইজি) নামে একটি সমিতি। এ সমিতির সদস্যরা আধুনিক চাষাবাদের পদ্ধতি রপ্ত করে বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলছেন নিরাপদ সবজি বাগান।
বছরখানেক আগেও তারা ছিলেন সাধারণ গৃহিণী। এখন দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। এখন তারা সবাই পুরোদমে কিষাণী। এসব নারী সামান্য জমিতে চাষাবাদ করে বদলে নিয়েছেন নিজেদের জীবন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় এখন তারা শিম, বেগুন, টমেটো, থানকুনি, লালশাক, পুইশাক, ধনেশাকসহ নানা জাতের সবজি চাষ করে নিজ নিজ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছেন। উদ্বৃত্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে আয় করছেন বাড়তি টাকা।
কিষাণী খালেদা খাতুন বলেন, ‘কোনো ধরনের রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না এসব সবজিতে। শুধু জৈব সার দিয়ে ফলানো হয় এসব সবজি। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে জৈব সারের প্লান্ট।’
সিআইজি সভানেত্রী ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘আমাদের সমিতিতে এখন ২০ নারী সদস্য রয়েছে। প্রতিমাসে সঞ্চয় হিসেবে তারা ৫০ টাকা করে জমা দেয়। বর্তমানে মূলধন এক লাখ টাকা।’
হাজার হাজার এনজিও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে রমরমা ঋণবাণিজ্য করছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অনেকের যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন বহু মানুষ। এনজিওর ঋণের কিস্তি শোধে ব্যর্থ হয়ে প্রায়ই নারীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। এই ধরনের সমিতি নারীদের এনজিও ঋণের হাত থেকে রেহাই দিতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিআইজি সভানেত্রী ইয়াসমিন জানান, এখন আর এ সমিতির সদস্যরা কোনো এনজিও থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন না। নিজেদের সঞ্চয় থেকে তাদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে। সবার বসতবাড়ির ভিটেয় বিষমুক্ত নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন সবজি চাষ করেন। পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পালন করছেন গাভি ও হাসঁ-মুরগি।
ঝিকরগাছা উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘পুরুষের পাশাপাশি বসতবাড়ির ভিটায় নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন ফসল চাষাবাদে নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।’
পুষ্টিনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে আধুনিক এ চাষাবাদের কৌশল দেশের অন্যান্য জেলাতে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করেন তিনি।