এরশাদ ‘অসুস্থ’, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কে

আপডেট: 02:45:27 29/11/2018



img

রাকিব হাসনাত : নির্বাচনের আগে এরশাদের অসুস্থতা, হাসপাতালে, বিশেষত সিএমএইচে ভর্তি হওয়া- এর আগেও বিরাট আলোচনা, বিতর্ক, হাসিতামাশার জন্ম দিয়েছে।
এর আগে ২০১৪-র নির্বাচনের সময়কার সেই বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে রাখলে বলতে হবে, তা অকারণে নয়।
সুতরাং এবারো নির্বাচনের মাসখানেক বাকি, এবারো মি. এরশাদ সিএমএইচে- তাই তা আলোচনার বিষয় হওয়ারই কথা।
তবে এ গুঞ্জনের মধ্যেই বুধবার জাতীয় পার্টি সবাইকে আশ্বস্ত করেছে যে, 'তাদের প্রধান সুস্থ আছেন, তিনি অচিরেই হাসপাতাল ত্যাগ করবেন এবং চিকিৎসার জন্যে তাকে সিঙ্গাপুরে যেতে হবে না।'
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম অংশীদার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
এর আগে ২০০৮ সালে মহাজোটের হয়েই নির্বাচন করলেও, ২০১৪ সালে এরশাদ ও তার দল ঘোষণা করেন, তারা নির্বাচনের আগে মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
সেবার দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে পরে আবার নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন এরশাদ। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই নির্দেশ আর কার্যকর হয়নি। কারণ ওই ঘটনাপ্রবাহের এক পর্যায়ে তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছিল।
নির্বাচনের পরেও এক সপ্তাহ তিনি সেখানেই ছিলেন এবং নির্বাচনে তার দল থেকে ৩৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; যার মধ্যে এরশাদও ছিলেন।
এবারো মহাজোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগির আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন এরশাদ। এর মধ্যেই হঠাৎ করে দুই সপ্তাহ আগে আবারো সিএমএইচে ভর্তি হলে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
কারণ সিএমএইচ থেকে ফিরে তিনি কোথায় আছেন - সেটি নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরেই নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হাঁটুব্যাথাসহ নানা শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে সিএমএইচে নেওয়া হয়।
এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার কথা বলা হলেও জাতীয় পার্টির মুখপাত্র সুনীল শুভরায় জানিয়েছেন, নির্বাচনের কারণে তিনি সিঙ্গাপুর যাবেন না।

এরশাদের অসুস্থতার ব্যাপারে কী জানা যাচ্ছে
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়েই এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হবার আগে এরশাদের অসুস্থতার খবর আলোড়নই তুলেছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে।
এর মধ্যে তার অনুপস্থিতিতে গত কয়েকদিন ধরে দলের পক্ষ থেকে সিনিয়র নেতারাই মনোনয়নসহ বিভিন্ন বিষয় দেখছিলেন; যা নিয়ে দলের মধ্যেই ব্যাপক ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্ম হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে তার অসুস্থতার বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে বুধবার একটি নতুন বক্তব্য আসে।
দলটির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এখন আর সিঙ্গাপুরে নেওয়ার মতো অসুস্থ নন তাদের দলীয় চেয়ারম্যান। মি. হাওলাদার জানিয়েছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আছেন।
তিনি বলেন, এরশাদ দীর্ঘদিন ধরেই সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা নেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তার সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা দরকার নেই। তিনি সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন না।
দলটির আরেকজন নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, শিগগিরই আগের মতো সক্রিয় হবেন এরশাদ।

অসুস্থতা কি রাজনৈতিক
গত নির্বাচনের আগেও এইচ এম এরশাদকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল এবং পরে দলটির নেতারা এবং এরশাদ নিজেও জানিয়েছিলেন যে, স্বেচ্ছায় তিনি সেবার হাসপাতালে যাননি।
সে কারণে এবারো নির্বাচনের আগে তার অসুস্থতার খবরে গতবারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেছিলেন।
এমন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বয়ং এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে 'হাস্যরস না করার' অনুরোধ করেছেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারও বলেছেন, এরশাদ সত্যিকার অর্থেই অসুস্থ হয়েছিলেন বলেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং এখন তিনি ভালো বোধ করছেন।

মহাজোটের প্রার্থিতা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে কে
এরশাদের অনুপস্থিতিতে গত কয়েকদিনে জাতীয় পার্টিতে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তুঙ্গে উঠেছে।
এমনকি দলের নেতারাই শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। যদিও মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বুধবারের ব্রিফিংয়ে সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে এরশাদের অনুপস্থিতিতে মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারই আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।
যদিও সিনিয়র কয়েকজন নেতা নিশ্চিত করেছেন মনোনয়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আরো কয়েক নেতার সম্পৃক্ততাও রয়েছে।
এরশাদের অনুপস্থিতিতে দল চালাচ্ছেন কারা?- এমন প্রশ্নের জবাবে পার্টির সিনিয়র নেতাদের একজন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলছেন, সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এই বাবলুর বিরুদ্ধে বুধবার রংপুরে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। শেষে বাধ্য হয়ে বাবলুর পক্ষে তিন তরুণ অন্য একটি উপজেলায় সন্তর্পণে হাজির হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করে সটান ঢাকায় ফিরে গেছেন। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এরশাদের অনুপস্থিতিতে বাবলু স্বাক্ষর করা মনোনয়নপত্র চুরি করেছেন।
জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের বিরুদ্ধেও ঝাঁটা ও জুতামিছিল হয়েছে তার নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালীতে। তারা ওই এলাকায় হাওলাদারকে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দু-একজন নেতা জানিয়েছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি আসনসহ বেশ কিছু আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এরশাদ সন্তুষ্ট নন। সে কারণেই চাপ তৈরির জন্যই কিছুটা অন্তরালে গিয়েছিলেন এরশাদ।
তারা বলছেন, মহাসচিবসহ কয়েকজন সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালালেও আসলে সবকিছু সরকারের ইচ্ছে মতোই হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
সে কারণে এরশাদকেসহ কিংবা এরশাদকে ছাড়া- যেভাবেই হোক আসলে জাতীয় পার্টি কে চালাচ্ছে বা জাতীয় পার্টির নির্বাচনী সিদ্ধান্তগুলো কোথা থেকে আসে তা নিয়ে নিশ্চিত নন দলটির বহু নেতাকর্মীই।
সূত্র : বিবিসি