ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ

আপডেট: 02:37:10 08/01/2017



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রামের সোমারানী দাস পড়ছেন যশোর পলিকেটনিক ইনস্টিটিউটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বলাকান্দর গ্রামের ঝুমরা খাতুন পড়াশোনা করেন যশোর সরকারি মহিলা কলেজে মাস্টার্সে, ঝিনাইদহ কিশোরচন্দ্র কলেজে বাংলায় অনার্স পড়ছেন আরজুফা।
প্রীতিলতা, আফরোজা পারভীন, সামারানী, সাহানা, বীথি, পিংকি, পুষ্প, বিজলী ও জলির মতো স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ৪৫ জন মেয়ে নিেেজরা ঠিক করেছেন পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। তাদের বিশ্বাস, মেয়রা এগিয়ে গেলে, এগিয়ে যাবে দেশ।
আর এমন মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া মেয়েদের সহযোগিতার হাত নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও জাপানি নারী হিরোকো কোবাইসি।
মিজ কোবায়েসি ৮৮ বছর বয়সী একজন জাপানি, নারী যিনি ইকেবানার (ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট) শিক্ষক এবং ৪৫ বছর যাবত এই কাজটি করছেন। এছাড়া তিনি একজন ফটোগ্রাফার। তার ছবির মূল উপজীব্য নারী। ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশের (কালীগঞ্জ ও বোদা উপজেলায়) দুটো এলাকার প্রায় ১০০ জন মেয়ের পড়ালেখায় সহায়তা করছেন তিনি।
২০১৬ সালে কালীগঞ্জে ৪৫ মেয়ে শপথ নিয়েছেন লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে করবেন না। তারা আরো শপথ নিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা সমাজে সমাজের অসহায় গরিব মেধাবী মেয়েদের শিক্ষার জন্য সহযোগিতা করবেন। মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার এই উদ্যোগকে ‘হাঙ্গার ফ্রি ওমেন স্কলারশিপ’ নামে একটি কর্মসূচি হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড চলমান রেখেছে।
হাঙ্গার ফ্রি ওমেন স্কলারশিপ কর্মসূচি দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হাফিজুর রহমান জানান, ২০০৩ জাপানি নারী হিরোকো কোবাইসি বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন। ওই সময় কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তবাপুর গ্রামের খাদিজা খাতুন এইচএসসি পড়ার সময় টাকার অভাবে পরীক্ষার ফি না দিতে পারায় গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এমন খবর জানার পর জাপানি মহতী নারী হিরোকো কোবাইসি খাদিজা খাতুনের বাড়িতে যান এবং প্রতিশ্রুতি দেন অসহায় গরিব মেধাবী মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার। এর পর থেকে প্রতি বছর তিনি ৪৫ জন মেয়েকে স্কুল পর্যায়ে টাকা ও কলেজ পর্যায়ে টাকা প্রদান করে আসছেন।
হাফিজুর রহমান আরো জানান, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কর্মীরা কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ও স্কুলে গিয়ে এসব গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে। ২০১৬-১৭ সালে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ঝুমুরা খাতুন, আরজুফা খাতুন, প্রীতিলতা বিশ্বাস, আফরোজা পারভীন, সাহানা খাতুন, সোমারানী, বীথি খাতুন, পিংকি খাতুন, পুষ্প বিশ্বাস, জলি খাতুন, বিজলী খাতুন, সুমি খাতুন, অনামিকা সরকার, শিলা খাতুন, ফারজানা আক্তার, স্মৃতি বিশ্বাস, রহিমা খাতুন, নাসরিন খাতুন, শান্ত¦না ইয়াসমিন, মাধবীলতা বিশ্বাস, সোহাগী খাতুন, মালেকা খাতুন, শান্ত¦না খাতুন, আঁখি খাতুন, ফারাফি নুসরাতসহ ২৫ জন শিক্ষার্থী ও স্কুল পর্যায়ে বিনা খাতুন, শম্পা খাতুন, বৃষ্টি খাতুন, জিনিয়া খাতুন, কণিকা খাতুন, হাফিজা খাতুন, অর্পিতা খাতুন, তামান্না খাতুন, হীরা খাতুন, রুপালি খাতুন, নাজমিন খাতুন, মুক্তা খাতুন, শারমিন জানান, হোসনে আরা বর্ষা, রিমি খাতুন, শিউলিরানী, স্বপ্না বিশ্বাস, চামেলী খাতুন, মল্লিকা বিশ্বাস, নাসরিন আক্তারসহ ২০ জন মেয়েকে এ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি তিন মাস অন্তর বৃত্তিপ্রাপ্ত সব মেয়ে এক জায়গায় হয়। তিন মাসের টাকা একবারে প্রদান করা হয়। শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার পর সংগঠনের কর্মীরা নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন যে বৃত্তির টাকা নিয়ে তারা ঠিকমতো পড়াশোনা করছেন কি-না, ঠিকমতো স্কুল-কলেজে যাচ্ছে কিনা।
তিনি আরো জানান, যে সব মেয়েকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয় তারা শপথ নেন লেখাপড়া শেষ না করা পর্যন্ত তারা বিয়ে করবে না। এমনকী তারা প্রতিষ্ঠিত হলে গরিব ও মেধাবী মেয়ের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করবে।
জাপান থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসে হিরোকো কোবাইসি আসেন এইসব মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।
হিরোকো কোবাইসি কেন মেয়েদের বৃত্তি দেন- এই প্রসঙ্গে হাঙ্গার ফি ওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আনজুমান আক্তার জানান, জাপানি এই নারী পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। তিনি খুব গরিব পরিবারের সন্তান ছিলেন। অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি লেখাপড়া করেছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, যদি কখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন তাহলে তিনি গরিব মেধাবী মেয়ের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করবেন। সেই প্রতিজ্ঞা থেকে কোবাইসি এই শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে থাকেন।
তিনি আরো জানান, এই কার্যক্রম এখন আর শুধুমাত্র বৃত্তিপ্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বৃত্তিপ্রাপ্ত মেয়েদের জীবনদর্শন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের জীবনকে সুন্দর করার স্বপ্ন ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। মিজ কোবায়েসির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের মানুষও এখন এই কর্মসূচি এগিয়ে নিতে মেয়েদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কোবায়েসির মতোই বাংলাদেশে এরই মধ্যে ১১ জন মিলে প্রতি বছর মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে নিতে এবং কোবায়েসির পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন, মেয়েদের পড়ালেখাসহ তাদের ভালো-মন্দ খোঁজ খবর নিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
তিনি আশা করেন এমন একটি প্রক্রিয়া বৃত্তিপ্রাপ্ত মেয়েদের পড়ালেখা শেষ করা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং একটি সুন্দর জীবন গড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
‘আমরা সবাই চাই মেয়েদের এই দীক্ষা বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হোক, আমরা সবাই তাদের পাশে দাঁড়াই। মেয়েরা এগিয়ে গেলে, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ’, বলছিলেন আনজুমান।