কমেছে পয়লা বৈশাখ ঘিরে ইলিশ-উন্মাদনা

আপডেট: 03:09:36 13/04/2018



img

নাজনীন আখতার : দুটি ইলিশ এক হাতে উঁচু করে দেখিয়ে কামরুজ্জামান বললেন, ‘বিক্রি কইমা গেছে, দামও কম।’ গলায় ছিল হতাশার সুর। তার ভাষায়, এখন আর কেউ আগের মতো পয়লা বৈশাখে ‘দৌড়াইয়া’ ইলিশ কেনে না।
তবে এ ঘটনাকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন ইলিশ উৎপাদন ও গবেষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সচেতন লোকজন। তাদের মতে, দু-তিন বছর ধরে বৈশাখে ইলিশবিরোধী প্রচার ধীরে ধীরে হলেও সফলতা পাচ্ছে। ইলিশ রক্ষার প্রয়োজনে সচেতন অনেকে এখন বৈশাখে ইলিশ মাছ কেনা থেকে বিরত থাকছেন।
বৈশাখ ঘিরে আগের চেয়ে ইলিশের উন্মাদনা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে বাজারে ইলিশ উঠছে, বিক্রি হচ্ছে, অভিযানে ধরা পড়ছে নিষিদ্ধ জাটকাও।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আশির দশকে হঠাৎ করেই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার চল শুরু হয়। শহুরে ‘এলিট শ্রেণি’ ছিলেন এই চল শুরুর পেছনে। পরে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর আগে পান্তার সঙ্গে ডিম ভাজার প্রচলন ছিল বেশি। পরে ডিমের জায়গায় জাতীয় মাছ ইলিশকে স্থান দিলে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে। এই শ্রেণি পয়লা বৈশাখের দিন রমনায় পান্তা-ভাত, কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচ ভাজা, ইলিশ আর পেঁয়াজ ভাজা নিয়ে হাজির হন ভোরবেলা। মাটির সানকিতে করে তা খাওয়া শুরু হয়। পরের বছরগুলোতে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পয়লা বৈশাখে রমনায় শিক্ষার্থীরা পান্তা-ইলিশ দেদার বিক্রি করেন। ক্রমেই তা মধ্যবিত্তের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনে ‘অপরিহার্য’ হয়ে দাঁড়ায়। স্থান পায় পাঁচতারকা হোটেলের বৈশাখ মেন্যুতেও। এই সময়ে ইলিশের উৎপাদন কম থাকলেও চাহিদা বেশি থাকায় অস্বাভাবিকভাবেই দাম চড়তে থাকে।
বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে বাড়তে থাকে জাটকা নিধন। জাটকা নিধন বন্ধ ও মা ইলিশ রক্ষা করে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচার চালানো হয়। দু-তিন বছর ধরে সচেতন লোকজন এ সময়টায় ইলিশের পরিবর্তে পান্তার সঙ্গে অন্য মাছ খাওয়া শুরু করেছেন। এরপরও একটি অংশ এখনো পয়লা বৈশাখে খাবারের তালিকায় ইলিশ রাখছেন।
পান্তা-ইলিশের বিরোধিতা করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাঙালির পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের সঙ্গে পান্তা ও ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে একধরনের নব্য-বাঙালিয়ানা চল তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। নববর্ষ পালনে পান্তা-ইলিশের প্রচলন কখনোই ছিল না। এভাবে পান্তা ইলিশ খাওয়ার মধ্য দিয়ে দরিদ্র মানুষদের প্রতি ঠাট্টা করা হয় বলে মনে করি। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষের ইলিশ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তারা শুকনা মরিচ পুড়িয়ে পান্তা দিয়ে খেতেন।
ইলিশ রক্ষার জন্য পয়লা বৈশাখে ইলিশ বর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়ামুল নাসের। তিনি বলেন, এ সময়টায় ইলিশ মাছ ধরা উচিত নয়। এখন নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছগুলো সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। মাছগুলোকে বড় হতে দেওয়ার সুযোগ দিলে ক্রেতাদের জন্যই লাভ। বড় ইলিশ সুস্বাদু হয়। আর ইলিশের প্রাচুর্য বাড়লে দামও কমবে। আর দেড়-দুই মাস অপেক্ষা করলে বর্ষায় আসল ইলিশের স্বাদ পেতে পারবেন ক্রেতারা।
তিনি আরো বলেন, বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে ইলিশ খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। ইলিশ খেলে সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই এ সময়টায় ইলিশ খেলে তা মোটেও স্বস্তিদায়ক হবে না।
বৈশাখ ঘিরে ইলিশের চাহিদা মেটাতে জাটকা নিধন বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। ঢাকা জেলায় এই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা (ঢাকা) মৎস্য কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আলমগীর। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইলিশ রক্ষার প্রয়োজনে এই সময়ে জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সময়ে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। জাটকা ধরার ওপর এক বছরের অক্টোবর থেকে পরের বছরের জুন মাস পর্যন্ত আট মাস নিষেধাজ্ঞা থাকে। ইলিশ মাছ এখন কম পাওয়া যায়। তাই এই সময়টায় চাহিদা বেশি হলে ইলিশ সরবরাহের জন্য জাটকা ধরার প্রবণতা বেড়ে যায়। এ কারণে পয়লা বৈশাখে ইলিশ খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, এরপরও অনেকে ইলিশ খেতে চান বলে অসাধু মাছ ব্যবসায়ীরা জাটকা ধরে এই সময়ে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। এই সপ্তাহে পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাট থেকে ৮৫০ কেজি জাটকা আটক করা হয়েছে।
গোয়ালন্দের মাছ ব্যবসায়ী মো. বাদল বিশ্বাস বলেন, এখন যে ইলিশ বিক্রি করছেন, তার বেশির ভাগই হিমায়িত। মৌসুমের সময় প্রতিদিন ৫০-৬০ মণ ইলিশ কিনে তারা বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করতেন। কখনো কখনো সেটা ৮০ থেকে ১০০ মণও হতো। এখন সেটা ছয়-সাত মণে নেমে এসেছে।
তিনি জানান, বরিশাল থেকে ইলিশ কিনে ঢাকায় সরবরাহ করছেন। গোয়ালন্দ থেকে ঢাকার নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে প্রতিদিন দুই মণ করে মোট চার মণ ইলিশ সরবরাহ করছেন তিনি। এসব ইলিশের মধ্যে বেশির ভাগ ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের। স্থানীয় বাজারে এই ওজনের ইলিশের কেজি ক্ষেত্রবিশেষে এক হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া তিনটি ইলিশ মিলে এক কেজি হলে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। বড় ইলিশ সংখ্যায় খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো কেজিপ্রতি তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মো. বাদল বিশ্বাস জানান, স্থানীয় বাজারে মিয়ানমারের ইলিশ কম দামে পাওয়া যায়। এ ছাড়া ওমান থেকে আমদানি করা শ্যাড ফিশ, যেটা স্থানীয়ভাবে চন্দনী ও কলম্বো নামে পরিচিত, তা অনেক সস্তায় বিক্রি হয়। মৌসুমি মাছ বিক্রেতারা পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে এ মাছগুলোকে ইলিশ নামে গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে বিক্রি করেন। মাছগুলো কেটে লবণ দিয়ে বরিশালের লোনা ইলিশ বলে গ্রামের সাধারণ ক্রেতাদের ঠকানো হয়।
গত বছর ভরা মৌসুমে ইলিশের আধিক্য ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা। চার দশকে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে তিন লাখ ৯৮ হাজার টন ইলিশ মাছ উৎপাদিত হয়েছে। আর এবার ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে চার লাখ ৯৪ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ নদ-নদী থেকে যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ করা হয়, এর দ্বিগুণ পরিমাণ সাগর থেকে আহৃত হচ্ছে।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তথ্য অনুসারে, ইলিশের আমদানি গত বছর হঠাৎ করে অনেক বেশি বেড়ে যায়। তবে এবার তা লক্ষণীয় মাত্রায় কমে এসেছে। টেকনাফ স্থলবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৭৫ শতাংশ মাছ আমদানি হয়। বরফায়িত ও হিমায়িত—এই দুই অবস্থায় বেশির ভাগ ইলিশ মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকেও ইলিশ আসে। এ দুটি বন্দর দিয়ে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে আমদানি হয়েছে চার কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি ৪৭৯ দশমিক ৯৪৫ মেট্রিক টন ইলিশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আট হাজার ১১৫ দশমিক ৬১৭ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়। টাকার অঙ্কে যা ৫১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৪৫৪ দশমিক ২৭৯ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়।
এর বাইরে ওমান থেকে শ্যাড ফিশ নামে ইলিশসদৃশ একটি মাছ আমদানি করা হচ্ছে। এটা স্থানীয় বাজারে চন্দনী ও কলম্বো নামে বাজারজাত হয়। ইলিশ ভেবে এ মাছগুলো কিনে প্রতারণার শিকার হন ক্রেতারা। এ মাছ স্বাস্থ্যকর নয় বলেও মনে করছে মৎস্য অধিদপ্তর।
সূত্র : প্রথম আলো

আরও পড়ুন