করোনারি কেয়ার ইউনিটে জোটে শুধু ব্যবস্থাপত্র

আপডেট: 02:53:22 29/08/2017



img

স্টাফ রিপোর্টার : হৃদরোগীদের জন্য স্থাপিত দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র করোনারি কেয়ার ইউনিটটি থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
যশোর জেনারেল হাসপাতাল কম্পাউন্ডে অবস্থিত সিসিইউ-টির জন্য সরকারিভাবে সরবরাহ করা কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে জনবলের অভাবে। ফলে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শরণাপন্ন হতে হয়। ইউনিটটিতে নেই প্রয়োজনীয় ডাক্তার, সেবিকা, কর্মচারী। জেনারেল হাসপাতালের জনবল দিয়ে কোনো মতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে ইউনিটটি। রোগীরা এখান থেকে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কার্যত আর কিছুই পান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের চেষ্টায় যশোর জেনারেল হাসপাতারে একটি করোনারি কেয়ার ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ২০০৫ সালে ২৮ শয্যাবিশিষ্ট স্বতন্ত্র করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) তিনতলা ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম  ছাড়াই ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর এটির উদ্বোধন করা হয়। এটি দক্ষিণাঞ্চলের প্রথম করোনারি কেয়ার ইউনিট।
সরকার বদলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ অঞ্চলের মানুষের কথা বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম বরাদ্দ করে সিসিইউ-টিতে ব্যবহারের জন্য। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটিতে সেবা কার্যক্রম চালুর জন্য ২৪ জন চিকিৎসক, ৫৬ জন নার্স ও ১৪৩ জন কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মন্ত্রণালয় দরকারি জনবল দিতে ব্যর্থ হয়।
জনবল না পেয়ে জেনারেল হাসপাতাল ও প্রেষণে আসা জনবল দিয়ে ২০০৯ সালে ১২ জুলাই এই সিসিইউ চালু করা হয়। তবে নানা সংকট থেকেই যায়।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২৮ শয্যার এই সিসিইউতে পর্যাপ্ত ডাক্তার, সেবিকা, কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এর কোনোটি নেই। হাসপাতালের ১৪ জন সেবিকা, আটজন চিকিৎসক এবং ১৬ জন স্বেচ্ছাসেবী কর্মচারী দিয়ে খুড়িয়ে চলছে এ ইউনিটটি।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খাতায় দেখা গেছে, ইউনিটটিতে প্রতিদিন ২০-২৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। শয্যা ২৮টি হলেও একন এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। গত ১ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ২৬ দিনে এই ইউনিট থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন সাড়ে ছয়শ রোগী। তবে রোগীরা এখান থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, সেবিকাদের কাছ থেকে ওষুধ নেওয়া এবং রক্তচাপ নির্ণয় ছাড়া কোনো সেবা পাননি। হৃদরোগীদের দরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়েছে হাসপাতালে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইটিটি, কার্ডিয়াক মনিটার, কালার ডপলার, ডিজিটাল ইসিজি মেশিন, পালস অক্সিমিটার, ভেন্টিলেটারসহ বিভিন্ন মেশিনারিজ বছরের পর বছর অকেজো পড়ে রয়েছে। জনবলের অভাবে এসব যন্ত্র কখনো ব্যবহারই করা য়নি। তিনতলায় ওঠার একমাত্র লিফটটি ও গত সাত মাস অকেজো হয়ে আছে। অথচ ফলে সিঁড়ি ভেঙে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ওঠা-নামা করতে হয়; যা হৃদরোগীদের জন্য বিপজ্জনক।
গেল সপ্তায় এ ইউনিটে চিকিৎসাধীন এক রোগীর ছেলে আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বাইরে থেকে শোনা যায় হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসা হয় এই ইউনিটে। কিন্তু বাবাকে এখানে ভর্তি করার পর দেখি, ধারণা ভুল। ওষুধ কিনতে হয়েছে ফার্মেসি থেকে। হৃদরোগের যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে বাইরে থেকে।’
এর ফলে আর্থিকভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
অপরদিকে ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও রক্তচাপ মাপা ছাড়া আর কোনো সেবা রোগীরা পাচ্ছেন না। তাও আবার সঠিক নিয়মে ওয়ার্ডে রাউন্ডে আসেন না চিকিৎসকরা।
হৃদরোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোশফেক উর রহমানের কাছে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে তার জবাব, ‘হৃদরোগীদের জন্য এখানে নেই ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, ইমার্জেন্সি ভাসকুলার ওয়ার্ড, আধুনিক কম্পিউটারাইজড রেকর্ড সংরক্ষণ সিস্টেম, বায়োকেমিস্ট, অক্সিজেন প্লান্ট, নেবুলাইজার ও কার্ডিয়াক মার্কার অ্যানালাইজার মেশিনারিজ। যার ফলে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া ছাড়া চিকিৎসকরা রোগীদের জন্য আর কিছুই করতে পারেন না। ফলে গুরুতর রোগীদের ঢাকায় রেফার করতে হয়।
সিসিইউ-এর প্রকল্প পরিচালক ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু বলেন, ‘বিভিন্ন সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যতটা সম্ভব রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
তিনি স্বীকার করেন, করোনারি কেয়ার ইউনিটে জনবল সংকট রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে জনবল দিয়ে কোনো রকম টিকিয়ে রাখা হয়েছে সেবা কার্যক্রম।
‘হৃদরোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম নষ্ট থাকার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। লিফট মেরামতের জন্য যশোর গণপূর্ত বিভাগকে অবগত করা হয়েছে,’ বলছিলেন ডা. বেনু।

আরও পড়ুন