কলা কথা : চার

আপডেট: 01:45:36 12/11/2016



img

সোহেল প্রাণন

[এ বচনগুচ্ছ যেন দার্শনিকের।কিন্তু এখানে বিস্তার করেছে চারু নির্মাণের সপ্রতিভ বয়ান। যার ভেতর দিয়ে একজন পাঠক অনাবিল একটা ঘোরের মধ্যে প্রবেশ করে। যেখানে তৈরি হয় চিত্রের মায়াজাল। এভাবেই হয়তো চিন্তার দরোজাগুচ্ছ খুলে দিতে চাইছেন সোহেল প্রাণন। তার ধারাবাহিক লেখার এই কাব্যময় বর্ণনাধারাকে তাই সাধুবাদ জানাই আমরা। খানিকটা বিলম্ব দিয়েই ছাপা হচ্ছে এই পর্ব। এতে হয়তো কিছুটা বিড়ম্বনা হচ্ছে পাঠকের। উদারচিত্তে তবু এর আনন্দটা রসিকজনেরা গ্রহণ করবেন আশা করি। বি. স.]

“নিগূঢ় পেখন”
প্রকৃতির রীতি-নীতি যাকিছু হোক না কেন ইচ্ছেই সবান্ধব বিহারে। চাতকের দু’ফোটা খসা জলে তৃষ্ণা নিবারণ। আপত্তি, বিপত্তি, নিষেধ-মানা কে কাকে শেখাল! হয় যদি দিবাঘুম ভ্রান্ত কি নিশিচাঁদ! হয়তো নিশি বা দিবাক্ষণের কোনো কালেই ছিল না কোনো পরিচয়! নিত্য ছায়াতে স্নান, সুমিষ্ট ঘ্রাণ পিছু ছাড়েনি। গোপন কথা বলব বলে গোপন করে বলি নিষ্ঠুর; তবে যে তিতে কথা! বুঝেছি বিষের বাটিটি দাও না, মৃত্যুই হোক অতি আপন। তাবৎ প্রকৃতির চরিত্রে যে মুহূর্ত রচনা হয় মানুষেরাই তা বোধ করে। তখন দরকার হয় স্ব-প্রকৃতির খোঁজ। কেউ প্রথম জীবনে টের পাই কেওবা পাই না। আর যখন উপলব্ধি হয় তখন জানান দেয় অন্তর আত্মার প্রস্থান পর্ব।
এ এমন এক বৃষ্টি দেখার দিনের গল্প। পথের সীমানা পরিমাপ না করেই বেরিয়ে পড়া। অতীতের কোন কালে কোন সে ঋষি ধ্যানে বসেছিল, কোন সে পণ্ডিত একে একে বলে লিখে গিয়েছিল-পথে ফেলে যাওয়া কাব্যিক নাম। সেই উৎস সন্ধানের সুঘ্রাণ যদি মেলে তবে তাই হোক। পাকা কাঁচা রাস্তার দু-ধারে বুনো সবুজের ছোট বড় স্তূপ। দেখা না দেখার যাত্রা পথে নানান গল্প শোনাচ্ছে।
রাজাপুর পেরিয়ে রাস্তায় একটি কালভার্ট চোখে পড়ল। একটু সরজমিনে দৃশ্যপট উপভোগের আশাই কংক্রিটের রেলিংয়ে বসে পড়লাম। অবিশ্বাস্যভাবে ক্রমেই শূন্যে উঠে যেতে থাকলাম। এ যেন দীর্ঘকায় এক জলরাশির পটচিত্রমালা মেলে আছে জমিনে। ক্ষণে ক্ষণে দূর দিগন্ত হতে সৃষ্ট ঢেউ নিজেকে মেঘের দেশে আছড়ে ফেলছে।
এমন অনুভূতিময় ভাবন হয়তো সত্য নয়-তবুও কল্পনাতে থেকে থেকে উথলিয়ে উঠছে। নিচের দিকে চোখ ফেলতেই চোখে পড়ল মাছেদের উজান স্রোতের যাত্রা। দিবালোক যখন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যায় তখন তাজা সবুজ হয়েও রঙের উজ্জ্বলতা হারায়, হাঁসেদের মতো মুখ লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বৃষ্টির গান শোনে।
নরম তুলতুলে দুটি হাতে টেনে তুলছে খ্যাপলা জাল তাতে ঝুলে নড়চড় করছে রুপালি কিরণে আঁকা যা আটকে থাকা মায়া, পুঁটি, ঝিয়া, চাঁদা, খয়রা, আরও কত শত মাছ। কিছুটা পথ পেরতেই নগরের কাঠামোগুলো ভেসে উঠতে লাগল হ্যাচারি, ইটের ভাটাসহ নানান কলকারখানা।আলীপুর পৌঁছাতেই মূল সড়কে পা-রাখতে হলো। শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি।
আশ্রয়স্থল খুঁজতে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে যেতেই মিলে গেল ছোট একটি চায়ের দোকান। খুব পরিপাটি লেপা-পোছা দোকানের ভেতরটা। বৃষ্টির কারণে কর্মবিরত মানুষেরা ভিড় জমিয়েছে। ঘন বৃষ্টির দিনটি উপভোগ করতে এসে শরীরটা ভিজে আবার শুকিয়ে গেছে। দোকানি একজন বৃদ্ধা ধীরে ধীরে তাল লয় মেনে তার নড়াচড়া। বললাম, এক কাপ চা হবে?
-হ্যাঁ হবে তো বইসো দিচ্ছি।
-বেশ!
বৃষ্টি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। দোকানের মানুষেরাও একে একে চলে গেল। চারদিকটা অনেক খোলামেলা, পরিবেশটাও বেশ শীতল, সামনের পাকা রাস্তার ধরে এই দোকানটি। থেকে থেকে গাড়িও চলছে। গরম ভাপ উড়ছে এমন এক কাপ চা এলো, কড়া মিষ্টি কড়া লিকার। খেতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। ঘন বৃষ্টির এমন মধ্যদুপুরে অনন্ত কালের ধ্যানে মত্ত থাকা যায়। কী যে রূপ লাবণ্যে মাখা কাদা মাটির এই দেশ!
সারাটা দিন বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপন ও ক্লান্ত হয়েছি। অতি মানুষের দেখাও মেলেনি। একটা গাড়ির আশা করছি; পেয়ে গেলে চড়ে বসবো। বিকেল বুঝবার কোনো উপায় নেই। আবারও ঝিরঝির বৃষ্টি। এবার প্রেমবাগে নদীর পাড়ে পৌঁছানোর পালা। বর্ষা ঋতু মানেই মনের আবেগকে দারুণভাবে ফুসলিয়ে দেয়। দৃশ্যপট পলেপলে রহস্যময় এক আবেদন সৃষ্টি করতে শুরু করে। তাই হয়তো এর ফলস্বরূপ এবারের এই নতুন রচন “প্রেমবাগ” শিরোনামে।।
কল্প রাজ্যের পদ্মবনে ফুটেছে যে কত শত শাদা রঙের ফুল। পরীরাও দল বেঁধে ভুবন দ্বারে খেলায় মেতেছে। কখন যে লীলা ঘোরে জলের উপর ভেসে আবার নিমেষে বিলীন হয়ে যাচ্ছ। হয়তো এমনি এই জগৎকূল শুধুই প্রেমের ছড়াছড়ি। প্রকৃতি-প্রেম, মানব-প্রেম, মা ও মাটির প্রতি প্রেম, দেবতা-প্রেম, খোদা-প্রেম জগত ভরা শুধুই প্রেম।
একটুও সময় নেই দেরি করবার। মনের ঘরের মন পাখিরে কবর দিয়ে বস্তু ঘরে স্বপ্ন বুনেছ। প্রশ্ন করেছ কি শত বছর পূর্বে এই স্থানে কেউ একজন ছিল এই স্বপ্নের মালিক। তারও কেটেছিল শৈশব যৌবন। তবে ঘরের প্রকৃত অধিকারী কোন সে আদি নর।
“স্বর্গলোভ নরকের ভয় ঘরের খোঁজে পরের উপর আশ্রয়”
এর মর্ম ভেদের গুণ বিচারে সভ্যতার যাত্রী হয়ে ধরেছ ভান! কুলের ঘাস কেটে নিয়ে দিয়েছ ভেতরের পালিত পশুরে। মানব-মানবীরা প্রেমতো বোঝ না, জান না ফসল ফলাতে। দেখোনি জরদে রাঙা বীজ সাধা হয়ে ধরে কোন মধুর চাকে। তবুও শরীরক্ষয়ে জেগে ওঠে প্রান্তে জীবসাধুগণ। ইচ্ছেগুলো দানা বাঁধে মনের কোণে; মনের ক্ষুধা না মিটালে যে জন্ম নেবে না আঁকিবুঁকির মুক্ত অনুভব।

লেখক : চিত্রকর

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আরও পড়ুন