কারাগারের আদালতে যাবেন না খালেদা জিয়া

আপডেট: 08:16:29 12/09/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : কারাবন্দি খালেদা জিয়া কারাগারের ভেতরে বসানো আদালতে হাজির হতে ‘অনিচ্ছুক’ জানিয়ে বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের কাছে জানতে চেয়েছেন, এ অবস্থায় প্রধান আসামির অনুপস্থিতিতেই জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার চালিয়ে নেওয়া যায় কি না।
এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীর বক্তব্য শোনার জন্য বৃহস্পতিবার দিন রেখেছেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী আদালতে একটি পিটিশন দাখিল করে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন ছাড়া এভাবে কারাগারের ভেতরে একজন বন্দির বিচারের ব্যবস্থা করা ‘সংবিধান ও আইনপরিপন্থী’।
জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিনেরও আবেদন করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
পরিত্যক্ত কারাগারের ভেতরে অস্থায়ী আদালত স্থানান্তর নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো সেখানে আদালতের কার্যক্রম চলে।
সকাল দশটায় বিচারকাজ শুরুর সময় থাকলেও সময় লেগে যায় বেলা ১২টা ২০ মিনিট অবধি। যদিও বেলা ১১টা থেকে অস্থায়ী আদালতের পাশের খাস কামরায় উপস্থিত ছিলেন বিচারক আখতারুজ্জামান।
শুরুতে আদালতের অবস্থা নিয়ে খালেদার পিটিশন এবং জামিন আবেদন নিয়ে বক্তব্য দেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া।
আদালত স্থানান্তর নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনেই এটাকে কারাগার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এতো ছোট আদালত আমরা চারজন আসলেও বসতে পারছি না। সাংবাদিকসহ অন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ডিফেন্সের সবাই আসলে এখানে এতো সাফোকেশন হবে, বিচারকাজ চালানো সম্ভব না।
সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, “এই অবস্থায় এখানে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না, এটা সংবিধানপরিপন্থী কি-না- সে বিষয়ে আমরা পিটিশনে উল্লেখ করেছি।”
এই আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং খালেদার চিকিৎসা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি।
“বেগম জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আর এই আদালত করার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। এ অবস্থায় কারাগারের ভেতরে আদালত বসানো যায় কি-না… এখন যেহেতু তার কাছে আইনজীবীরা গিয়েছেন, তিনি একটি সিদ্ধান্ত দেবেন।”
সাধারণত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিচারকের নাম থাকলেও এবারের প্রজ্ঞাপনে তা ছিল না কেনো, সেই প্রশ্ন তোলেন সানাউল্লাহ মিয়া।
তারপরে দেওয়া বক্তব্যে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার অপর দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে এই আদালত ‘আইনসম্মত’ না হওয়ায় এখানে মামলার বিচারিক কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা না করার আবেদন পড়ে শোনান আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।
এভাবে আদালত বসানো সংবিধানের ৩৫(৩) ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারার সাংঘর্ষিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
“বেআইনিভাবে গঠিত অত্র আদালত ও বিচারিক কার্যক্রম স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বরাবর একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে। এই রূপ অবস্থায় আইনসম্মত আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অত্র মামলার কার্যক্রম ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্থগিত হওয়া আবশ্যক।”
তিনি বলেন, “আদালত কক্ষটি আনুমানিক ১২ বাই ২৪ ফুট সরু আয়তনের। এবং এই ছোট্ট কক্ষে বিচারকের আসন, আইনজীবীদের বসার স্থান, পাবলিক প্রসিকিউটর, সাক্ষী ও বিচারপ্রার্থীদের বসার স্থানসহ আদালতের স্টাফ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকলের একত্রে আদালত কক্ষে অবস্থান বিচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ মোটেই সম্ভবপর নয়।”
আদালত কক্ষ সংকীর্ণ হওয়ায় সাফোকেশন ও গরমের কারণে যে কেউ যে কোনো সময় মারা যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।
“এ আদালত গুহার মতো। স্যাৎসেতে অবস্থা। এখানে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যায় না। যেকোনো সময় যে-কারো ‘সাফোকেশন’ হতে পারে।”
আমিনুল ইসলাম বলেন, গেজেটে বলা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগার স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বকশীবাজারের আদালত থেকে যতবারই সময় পেছানো হয়েছে, ততবারই বেগম জিয়ার অসুস্থতার কারণে সেটা করা হয়েছিল। নিরাপত্তার বিষয়টিতো একবারও উঠেনি। বা প্রসিকিউশন থেকেও বলা হয়নি।
তিনি বলেন, কারাগারে থাকা আসামিকে উপস্থিত করানোর দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রসিকিউশনের। কিন্তু এখানে বেগম জিয়া উপস্থিত নাই। তিনি অনুপস্থিত থাকাবস্থায় কোরাম নন-জুজিস হওয়া স্বত্ত্বেও বিচার কার্যক্রম চলছে। প্রসিকিউশনের সেটা বলার কথা থাকলেও, তারা কিছু বলছে না।”
এরপর রাষ্ট্রপক্ষে দেওয়া বক্তব্যে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, “‘আইন মেনে এ আদালত গঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার সুবিধার জন্য এখানে আদালত বসেছেন।
“বেগম খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের আইনজীবীরা এই আদালতকে সংবিধানপরিপন্থী, আইনপরিপন্থী ও অবৈধ বলছেন। আবার তারাই সেখানে দাঁড়িয়ে জামিন আবেদন করছেন। এই আদালত যে কোনো আইনে বৈধ। বৈধ আদালতে দাঁড়িয়ে তারা জামিনের জন্য শুনানি করছেন। কিন্তু বৈধ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন না।”
আদালতের গঠন নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যকে ‘আষাঢ়ে গল্প’ হিসেবেও অভিহিত করেন তিনি।
“আদালত গঠনের ক্ষেত্রে পাবলিক হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বিচারের কথাও আছে। তারা দ্রুত বিচারের বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না। দ্রুত বিচারের স্বার্থে এখন যে অবস্থা আছে, সেই অবস্থায়ই আদালতের কার্যক্রম শুরু হোক।”
পরে বিচারক আখতারুজ্জামান আদালতে খালেদার হাজির না হওয়া প্রসঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের চিঠির বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, উনি (খালেদা জিয়া) কোর্টে আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তার মানে, আসতে অনিচ্ছুক।”
এরপর বিচারক খালেদার আইনজীবীর কাছে জানতে চান, খালেদা যদি না আসেন তাহলে জামিন শুনানি কীভাবে হবে এবং আর এভাবে আসতে অনিচ্ছুক হলে, কোরাম নন-জুডিস রেখে বিচারকাজ চালানো যাবে কি-না।
এর জবাবে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বেগম জিয়া যেহেতু কারাগারে আছেন আর আদালত কারাগারের ভেতরে। দুইটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
“সে কারণে উনি কেনো আসতে পারেননি, কী বলেছেন সেটা আমরা এখনো নিশ্চিত না। আবার উনি যেহেতু আগের দিন বলেছেন অনেক বেশি অসুস্থ। উনার শারীরিক অবস্থা কী, সেটাও তার সাথে দেখা করা ছাড়া বলা সম্ভব না।”
আর কারাগারে থাকা আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না সে বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিতে পড়াশোনা করার সময় প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন জানান সানাউল্লাহ মিয়া।
খালেদার অসুস্থতার উপর তার আইনজীবীদের জোর দেওয়ার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, “বারবার বলা হচ্ছে খালেদা অসুস্থ। ওনারাতো (খালেদার আইনজীবীরা) ওইদিন ছিলেন না। উনি (খালেদা) কীসের অসুস্থ? হুইল চেয়ারে ওনাকে আনা হয়েছে। উনি আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সবাই দেখেছে।”
খালেদা অনুপস্থিত থাকলেও বিচারকাজ তার আইনি গতিতে চলবে বলে আদালতে মন্তব্য করেন তিনি।
উভয়পক্ষের বক্তব্যের পর খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে কি-না এবং এই অবস্থায় জামিন শুনানি হবে কি-না সে বিষয়ে বক্তব্যের জন্য বৃহস্পতিবান দিন ঠিক করে দেন।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, “আদালত প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি কাস্টডিতে আছেন, কিন্তু আসতে ইচ্ছুক নন। খালেদা জিয়ার প্রকৃত তথ্য হলো, তিনি গুরুতর অসুস্থ। যার কারণে তিনি আসেন নাই।
“আদালত ভবন এবং জেলখানা একই জায়গায়, দুইটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কারা কর্তৃপক্ষের কি দুটি মাথা আছে, আদালতের কি দুইটা মাথা আছে অন্য কিছু লিখে দিবে।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, “কাস্টডিতে থাকাবস্থায়, তাকে হাজির করার দায়িত্ব হচ্ছে জেল কর্তৃপক্ষের। জেল কর্তৃপক্ষ তাকে হাজির করবেন, মাননীয় আদালত তার বিচার করবেন। এক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া যদি না আসেন, তিনি যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, সেক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিতিটাকে উপস্থিতি ধরে নিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করব।
“মাননীয় আদালত বলেছেন, আপনারা একদিকে জামিন চাচ্ছেন, আবার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলছেন, আবার আপনারা সেখানে আসছেন না, সেক্ষেত্রে কীভাবে আমি জামিন বর্ধিত করব, সে ব্যাপারে আপনারা আইনগত ব্যাখ্যা দেন। উনারা আইনগত ব্যাখ্যা কালকে দেবেন।”
আদালত ঘিরে নাজিমউদ্দিন রোড এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আদালতকক্ষেও অনেক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। আসামিপক্ষের পাঁচ আইনজীবীর সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষে আটজন আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র : বিডিনিউজ

আরও পড়ুন