কালীগঞ্জে বাসকপাতার বাণিজ্যিক চাষ

আপডেট: 09:54:13 11/12/2016



img
img

তারেক মাহমুদ : বাসকপাতা অনেকের কাছে ফেলনা মনে হলেও ভেষজ চিকিৎসায় এর জুড়ি নেই। বহুকাল থেকে ঠাণ্ডা কাশির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসলেও আমাদের দেশে বাসকের বাণিজ্যিকভাবে চাষ নেই বললেই চলে।
সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এই বাসক পাতার চাষ হতে দেখা যাচ্ছে। প্রথম দিকে গবাদি পশুর হাত থেকে জমি রক্ষার জন্য বেড়া এবং সৌন্দর্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হলেও এখন ধারণা পাল্টেছে। দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে কৃষকদের কাছ থেকে এই পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে কৃষকরাও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া সারা বছরই স্থানীয় মানুষ ঠাণ্ডা কাশির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেন।
এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি বাসকগাছ চাষের জন্য উপযোগী। ফলে রাস্তা ও বাড়ির পাশে পড়ে থাকা অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
মহামূল্যবান ওষধি গুণের এই বাসকপাতার চাষ সম্প্রসারণ ও বাজারজাতকরণ এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড কাজ শুরু করেছে। এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট। তারা ইতিমধ্যে দেশের রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকার চাষিরা বাসকপাতা চাষ ও সংগ্রহ করার কৌশল রপ্ত করতে প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কালীগঞ্জ এলাকা বাসকপাতা চাষের উপযোগী হওয়ায় এখানে তারা কাজ শুরু করবেন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তবাপুর গ্রামে গত সাত বছর ধরে এই বাসকপাতার চাষ হচ্ছে। এ গ্রামের প্রায় ১২ জন কৃষক তাদের কেউ বাড়ির চরাপাশ, আবার কেউ ফসলি জমির চারপাশে এই বাসক গাছের ডাল রোপণ করেছেন। এই গ্রামের আশাদুল ইসলাম সাত বছর আগে প্রথম তার বাড়ির ২০ শতক জমির চারপাশে বাসকপাতার গাছ লাগান। উদ্দেশ্য ছিল বেড়া দিয়ে জমি রক্ষা, অন্যদিকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি। দুই বছর পর কুষ্টিয়া থেকে আসা কিছু লোক বাসকের সবুজ পাতা কিনে নিয়ে যান। এরপর থেকে নিয়মিত তারা এসে টাকার বিনিময়ে বাসকের পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে থাকে।
আশাদুলের দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই বাসক গাছের চাষ শুরু করেন। এই বাসকগাছ একদিকে গবাদি পশুর হাত থেকে জমির ফসল রক্ষায় বেড়া হিসেবে কাজ করে অন্যদিকে এর পাতা বিক্রি করেন। ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা এসে কৃষকদের কাছ থেকে এই পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। এই গ্রামের কৃষকরা বছরে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত এই বাসকপাতা বিক্রি করেন। এছাড়া সারা বছরই স্থানীয় অধিবাসীরা ঠাণ্ডা কাশির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোস্তবাপুর গ্রামের আশাদুল ইসলাম, অজিতকুমার সাহা, ইউনুছ আলী, শহিদুল ইসলাম, মকছেদ খাঁসহ প্রায় ১২ জনের মতো কৃষক তাদের বাড়ি ও ফসলি জমির পাশে এই বাসকপাতা গাছের চাষ করছেন।
এছাড়া উপজেলার ষাটবাড়িয়া গ্রামের লিটন, রাড়িপাড়ার ইসলাম, অনুপমপুর গ্রামের আবুল হোসেন, ফরাসপুর, রায়গ্রাম ঘোষপাড়ার সুনীল ঘোষ, রবিন ঘোষ, দুলালমুন্দিয়ায় মজনুর রহমান, মফিজুর রহমান, মান্নান হোসেন ও রহিমা, একই গ্রামের দাসপাড়ার বাসুদেবকুমার ও গীতারানী, পাখাপাড়ার জাকির হোসেন, খামারমুন্দিয়া গ্রামের আরিফুল ইসলাম, আগমুন্দিয়া গ্রামের রশিদুল ইসলাম, মহেশ্বরচাঁদা গ্রামের মজিদ, ভাটাডাঙ্গা গ্রামের কার্তিক পাল বাণিজ্যিকভাবে এই চাষ শুরু করেছেন।
এছাড়া উপজেলাসহ জেলার কমলাপুর, আলঅইপুর, শ্রীরামপুর, সিংদহ, কালুখালী, আহসাননগর, কুল্লাগাছা, সুন্দরপুর ও দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক কৃষক বাসকপাতার বাণিজ্যিক বাজারদর এবং চাহিদার কারণে শুরু করেছেন।
এরমধ্যে মোস্তাবাপুর গ্রামের কৃষক মকছেদ খাঁ বলেন, ‘আমার ১৫ কাটা জমির চারপাশে দুই বছর আগে গবাদি পশু থেকে ফসল রক্ষার জন্য বাসক গাছ রোপণ করেছিলাম। একবছর পর প্রায় এক হাজার টাকার পাতা বিক্রি করেছিলাম। এবছর প্রায় তিন হাজার টাকা পাতা বিক্রি হবে।’
তিনি আরো জানান, শহর থেকে লোকজন এসে পাতা সংগ্রহ করে এবং পরিমাণ অনুযায়ী টাকা দেয়।
‘আমরা কোনো দরদাম করি না। এতে আমার ফসল রক্ষার বেড়া হয় অন্যদিকে কিছু টাকাও হয়’, বলেন মকছেদ।
জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড-এর প্রোগ্রাম অফিসার এসএম শাহীন হোসেন জানান, এ অঞ্চল বাকসপাতা চাষের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে এই চাষের সম্প্রসারণ করার জন্য বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এ অঞ্চলের কৃষকদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারা লাভবান হবে পাশাপাশি ও দেশীয় ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের যোগানে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়া একমি ফার্মাসিউটিক্যালস এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ কোম্পানি এখান থেকে সরাসরি বাসকপাতা সংগ্রহ করছেন।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোকামাকড়ের রোগ-বালাই বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আমাদের দেশের বাসকপাতার যে চাহিদা রয়েছে তার মাত্র দশ ভাগ দেশ থেকে যোগান দেওয়া হয়। বাকি কাঁচামাল ভারত থেকে আমদানি করা হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানেই না বাসকগাছের ওষধি ও বাণিজ্যিক মূল্য।
তিনি আরো জানান, কালীগঞ্জে বাসকপাতা চাষ সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন