কালীগঞ্জে লিলিয়াম

আপডেট: 02:12:28 11/03/2018



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ভিনদেশি সুগন্ধি ফুল লিলিয়াম। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ছোটঘিঘাটি-ত্রিলোচনপুরে চার বিঘা জমিতে এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে এই ফুলের চাষ করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর গ্রামের টিপু সুলতান এবং নুর মোহাম্মদসহ চারজন চাষি যৌথভাবে এই বিদেশি জাতের ফুল চাষ করেছেন। তাদের গাজীপুর জেলা সদরের মাওনাতে আরো দুই বিঘা জমিতে লিলিয়াম ফুলের চাষ রয়েছে। তবে প্রথমবারেই আশানুরূপ লাভ হবে বলে আশা করছেন এই ফুলচাষিরা।
এর আগে ২০০৮ সালে আব্দুর রহিম নামে এক ফুলচাষি যশোরের গদখালীতে কাঠা কাঠা জমিতে চাষ করেছিলেন। তবে সঠিক চাষ পদ্ধতি জানা না থাকায় এই ফুলের চাষ আর হয়নি।
কালীগঞ্জে ফুলচাষি টিপু সুলতান গেল বছরের নভেম্বরে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ড থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। ডিসেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে এই ফুলের বীজ রোপণ করা হয়।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রোববার বিকেলে কালীগঞ্জ থেকে ৫০০ ফুলের স্টিক সংগ্রহ করা হয়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে গাজীপুর থেকে ৯০০ ফুলের স্টিক তোলা হয়। এ পর্যন্ত বাজারে এই লিলিয়াম ফুলের প্রতিটি স্টিক বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে চাহিদা অনুযায়ী এই ফুলের দাম বাড়তে বা কমতে পারে। বাংলাদেশে চাষ হওয়া লিলিয়াম সাদা, গোলাপি, হালকা গোলাপি রঙের।
মাঠে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছে তিন থেকে পাঁচটি ফুল ধরে। আর এই প্রতিটি গাছকেই একটি স্টিক বলা হয়। গাছে কলি থেকে ফুল ফোঁটার আগেই তা সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা বাজারে সরবরাহ করা হয়। বাজারে নেওয়ার পর ফুল ফোটে। জমি থেকে তোলার পর একটি ফুল ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত তাজা থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লিলিয়াম ফুলের আদি নিবাস নেদারল্যান্ড। সাদা, গোলাপি, হালকা গোলাপি, কমলা, হলুদ, লালসহ আটটি রঙের হয়ে থাকে এই ফুল। লিলিয়াম ফুলের গাছ দুই থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এই ফুল শীতপ্রধান দেশে জন্মায়। পাশের দেশ ভারতে হাতেগোনা কয়েকটি জেলায় এই ফুলের চাষ হয়। তবে বীজ সংরক্ষণের সমস্যার কারণে সেখানেও এই ফুল চাষের সম্প্রসারণ তেমনটা হয়নি।
ফুলচাষি টিপু সুলতান জানান, গেল বছরের নভেম্বরে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ড থেকে ৬৩ হাজার বীজ সংগ্রহ করা হয়। শুধু বীজ আনতে খরচ হয় প্রায় ৪২ লাখ টাকা। এরপর ডিসেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে কালীগঞ্জে চার বিঘা এবং গাজীপুরে দুই বিঘা জমিতে সেই বীজ রোপণ করা হয়। প্রায় দুই মাস পর ফুল আসা শুরু করে। জমির ছাউনিতে ব্যবহার করা হয় বেলজিয়াম থেকে আনা বিশেষ ধরনের নেট। ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ড থেকে একজন কৃষক এসে লিলিয়াম চাষের বিভিন্ন কলাকৌশল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।
তিনি আরো জানান, বীজ রোপণ, ক্ষেতের চারপাশে বাঁশের বেড়া স্থাপন, ছাউনি, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বাবদ এ পর্যন্ত ৪৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই ফুল পরিচর্যা করার জন্য নিয়মিত চারজন শ্রমিক কাজ করেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই এই ফুলের চাষ শুরু করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রথমবারেই আশানুরূপ লাভ হবে।’
লিলিয়াম ফুলের বীজ সংগ্রহ করে এই চাষ সম্প্রসারণ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নে টিপু সুলতান জানান, তাপমাত্রা যদি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে তাহলে বীজ ভালো থাকবে। তবে আমাদের দেশের গরম আবহাওয়ায় এই ফুলের বীজ সংরক্ষণ করা বেশ কঠিন। তবে কৃষি বিভাগ যদি এগিয়ে আসে তাহলে সম্ভব।’
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি যশোরের গদখালীর আব্দুর রহিম বলেন, ‘২০০৮ সালে আমি গদখালীতে দশ কাঠা জমিতে লিলিয়াম চাষ করেছিলাম। সে সময় ভারত থেকে বীজ সংগ্রহ করেছিলাম। ভারতের কৃষি বিভাগ লিলিয়ামের বীজগুলো এনেছিল নেদারল্যান্ড থেকে। বাংলাদেশে প্রথম আমার হাত দিয়েই লিলিয়াম ফুলের চাষ শুরু হয়। তবে জমি থেকে বীজ সংগ্রহের পদ্ধতি জানা না থাকায় পরে আর এই ফুলের চাষ করা সম্ভব হয়নি।’
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিএম আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমি শুনেছি কালীগঞ্জে নতুন জাতের বিদেশি ফুল লিলিয়াম চাষ হয়েছে। তবে দেশে এই ফুলের চাষ আগে কখনো হয়েছে কি না আমার জানা নেই।’
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ মোহাম্মদ আকরামুল হক জানান, লিলিয়াম ফুলের চাষ দেশে এর আগেও হয়েছে। তবে সেটা ছিল পরীক্ষামূলক। এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও গাজীপুরের কয়েক কৃষক চাষ করেছেন।’
তিনি আরো জানান, বিদেশি জাতের এই ফুলবীজের দুষ্প্রাপ্যতা এবং গরম আবহাওয়ার কারণে চাষটি সম্প্রসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন