কালের সাক্ষী নকিপুর জমিদারবাড়ি

আপডেট: 02:24:18 16/01/2019



img
img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর জমিদারবাড়িটি জীর্ণ অবস্থায়ও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি ‘ভূতের বাড়িতে’ পরিণত হয়েছে। জানালা-দরজা নেই। বাড়ির দেয়ালে জন্ম নিয়েছে শত শত বটগাছ। নোনা ধরে ইটের দেয়াল খসে খসে পড়ছে। কিন্তু ইতিহাসের জীবন্ত উপাদান এ বাড়িটি রক্ষায় নেওয়া হচ্ছে না কোনো উদ্যোগ।
শ্যামনগর আতরজান মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহী বলেন, উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পুব দিকে জমিদার হরিচরণ রায়চৌধুরীর বাড়িটি ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। বিশাল আকারের তিনতলার ইমারতটি ভাঙাচোরা অবস্থায় এখন কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা প্রতাপাদিত্যের পরে হরিচরণ রায় ছিলেন শ্যামনগর অঞ্চলের প্রতাপ ও বিত্তশালী জমিদার। তার উদ্যোগে শ্যামনগরে তথা সমগ্র সাতক্ষীরায় অনেক জনহিতকর কাজ হয়েছিল। অনেক জমিদারের মতো হরিচরণ রায় শুধু সম্পদ ও বিলাসে মত্ত ছিলেন না। রাস্তাঘাট, খাল খনন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল নকিপুর মাইনর স্কুলটি। যেটি বর্তমানে ‘নকিপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে খ্যাত।
তিনি জানান, জমিদার বংশের অবশিষ্টরা ১৯৭১ সালে সবাই চলে যান ভারতে। তারপর তাদের বসতবাটী পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে বাড়িতে। জমিদারবাড়ির সব জিনিসপত্র চলে গেছে চোর-লুটেদারের দখলে। তবে পরিত্যক্ত বাড়ি, এর পাশের দুর্গামণ্ডপ, নহবতখানা, শিবমন্দির, জলাশয় ইত্যাদি দেখে সহজে অনুমান করা যায় অতীত জৌলুস।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণবঙ্গের প্রতাপশালী শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ছিল বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের ধুমঘাট এলাকায়। তার রাজত্বের প্রায় আড়াইশ বছর পরে জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরী শ্যামনগরের নকিপুরে একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। শ্যামনগরে সদ্য জাতীয়করণ হওয়া নকিপুর এইচসি (হরিচরণ চৌধুরী) পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার অনিন্দ্য সুন্দর বসতবাড়িটি, যা দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপত্য হিসেবে পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতো, আজ সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও লেখক চারুচন্দ্র মণ্ডলের লেখা বই থেকে জানা যায়, জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরীর বাড়িটি ছিল সাড়ে তিন বিঘা জমির ওপর। যার সীমানা প্রাচীর ছিল দেড় হাত চওড়া। সদর পথে ছিল একটি বড় গেট বা সিংহদ্বার। সামনের দিকে ছিল একটি শান বাঁধানো বড় পুকুর। পুকুরটির অস্তিত্ব আজো আছে। এই পুকুরটিতে সারাবছরই পানি থাকে। পুকুরঘাটের বাম পাশে ছত্রিশ ইঞ্চি সিঁড়িবিশিষ্ট দ্বিতল নহবতখানা। আটটি স্তম্ভবিশিষ্ট এই নহবতখানার ধ্বংসাবশেষ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। বাগানবাড়িসহ মোট বার বিঘা জমির ওপর জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভবনটি ছিল ৭০ গজ লম্বা, তিন তলা। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই সিঁড়িঘর। নীচের তলায় অফিসাদি ও নানা দেবদেবীর পূজার ঘর। এছাড়া আরো দুটি গমনাগমন সিঁড়িপথ। মাঝের তলায় কুলদেবতা গোপাল দেবের মন্দির ও অতিথিশালা। সিঁড়ির দুই পাশে কক্ষ ছিল। অর্থাৎ সিঁড়ি ছিল মধ্যবর্তী স্থানে। সদর-অন্দরের দুই পাশেই বারান্দা ছিল। বারান্দাগুলো বেশ প্রশস্ত- আট ফুট চওড়া। বিল্ডিং এর নীচে বেজমেন্ট ছিল। সেগুলো ভাড়ার ঘর (মালামাল রাখার জায়গা) হিসেবে ব্যবহার করা হতো। নিচের তলায় ১৭টি এবং উপরের তলায় পাঁচটি কক্ষ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কক্ষের মধ্যে ছোট, বড়, মাঝারি সব রকমের ছিল। ভবনটির দৈর্ঘ্য ২১০ ফুট, প্রস্থ ৩৭ ফুট, পুনঃ ৬৪ ফুটের মাথায় এল প্যাটার্নের বাড়ি। প্রথমবার ঢুকলে কোন দিকে বহির্গমন পথ তা বোঝা বেশ কষ্টদায়ক ছিল। চন্দনকাঠের খাট-পালঙ, শাল-সেগুন, লৌহ কাঠের দরজা-জানালা ও বর্গাদি, লোহার কড়ি, দশ ইঞ্চি পুরু চুন-সুরকির ছাদ, ভেতরে কক্ষে কক্ষে গদি-তোষক, কার্পেট বিছানো মেঝে। এক কথায় জমিদারবাড়ির পরিবেশ, যেখানে যেমনটি হওয়া দরকার তার কোনো ঘাটতি ছিল না।
বাড়িতে ঢোকার জন্য চারটি গেট ছিল, ২০ ফুট অন্তর। জমিদারবাড়ির দক্ষিণে একটি বড় পুকুর ছিল। ১৯৫৪ সালের জমিদার পরিবার এখান থেকে ভারতে চলে যায়।
শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুজন সরকার বলেন, ইতিমধ্যে জমিদার বাড়িটির অবৈধ দখলমুক্ত এবং জমি প্রাঙ্গণে অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে আদালতে মামলা থাকায় একজনকে উচ্ছেদ করা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘সাবেক বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সামাদ ইতিপূর্বে স্ব-স্ব উপজেলার ঐতিহাসিক এবং দর্শনীয় স্থান সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভূমি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্দেশনা মতে নকিপুর জমিদারবাড়িটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়িটিকে পূর্বের নান্দনিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। জমিদারবাড়িটির চারপাশে বেষ্টনী দেওয়ার চেষ্টা করছি যেন কেউ এই নিদর্শনের কোনো কিছুই নষ্ট করতে না পারে।’
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘নকিপুর জমিদারবাড়িটি সাতক্ষীরার একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। এ বাড়িটি আমাদের দেড়শ বছর আগের কথা মনে করিয়ে দেয়। তৎকালীন জমিদার বংশের গৌরবময় ঐতিহ্যের নানা নির্দশন পাওয়া যায় এ বাড়িতে। বাড়িটি সংরক্ষণে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’