কুলের গ্রাম ভাটপাড়া

আপডেট: 02:00:12 03/02/2018



img
img

মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ‘বাউকুলের গ্রাম’ খ্যাত ভাটপাড়ায় বাউকুল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে প্রায় ৮০০ পরিবার। মাঠের পর মাঠ বাউকুলের বাগান। কেউ বা নিজের জমি আবার কেউ অন্যের জমি লিজ বা বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন বাউকুল। প্রতিদিন ২-৩ ট্রাক ভরে কুল যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এই গ্রামের ৯০০ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮০০ পরিবারই বাউকুল চাষে জড়িত। গ্রামের প্রায় তিন হাজার বিঘা জমির মধ্যে দুই হাজার ৪০০ বিঘা জমিতে চাষ করা হয়েছে কুলের।
গ্রামের কৃষকরা প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার কুল বিক্রি করছেন। কৃষি অফিসের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাউকুল চাষের গ্রাম এটি। স্থানীয়রা ভাটপাড়া গ্রামটিকে কুলের গ্রাম হিসেবেই পরিচিত করেছেন।
সরেজমিন বাউকুল মাঠে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১১ সালের দিকে এই গ্রামের গ্রাম্য চিকিৎসক ও কৃষক ডা. তাজু উদ্দিন মহেশপুর উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক সহযোগিতায় প্রথমে দেড় বিঘা জমিতে বাউকুলের চাষ করেন। সেই বছর তিনি কুল বিক্রি করে বেশ টাকা পান। এর পর কুল চাষে আগ্রহ বেড়ে যায় তার। পরের বছর আরো চার বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন তিনি। এর পর ডা. তাজু উদ্দিনকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার দেখাদেখি শুরু হয় বাউকুলের চাষ। কুল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অধিকাংশ চাষি। কেউ কিনেছেন জমি, মোটরসাইকেল, কেউ বা তৈরি করেছেন পাকা বাড়ি।
গ্রামের এনামুল হকের ছয় বিঘা, তাজ উদ্দিনের আট বিঘা, সোহরাব উদ্দিনের ১৫ বিঘা, সবুজ উদ্দিনের আট বিভা, জিয়ার উদ্দিনের তিন বিঘা, শিপনের ছয় বিঘা, মেহেদীর পাঁচ বিঘা, রশিদুলের ছয় বিঘা, এপিয়ারের ছয় বিঘাসহ এই গ্রামের প্রায় ৮০ পরিবারের কুলবাগান আছে। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছে এই সব বাগানে।
প্রথম কুলচাষি গ্রাম্য ডা. তাজু উদ্দিন জানান, প্রথম বছরে তিনি দেড় বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন। কুল চাষ একটি লাভজনক ফসল। কারো যদি এক বিঘা জমিতে কুল থাকে তাহলে সব খরচ বাদে এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এখন তার আট বিঘা জমিতে কুল আছে। তাকে অনুসরণ করে এখন প্রায় দুই হাজার ৪০০ বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, বাউকুল মূলত ৩-৪ মাসের ফসল। যে জমিতে কুল চাষ করা হয় সেই জমিতে বোরো ধান কিংবা কলাই চাষ করা যায়।
বাউকুল চাষি লিটন জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি বাউকুল পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে। ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই কুল ট্রাকে ভরে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমি থেকে ৯০ থেকে ১০০ কার্টন কুল সংগ্রহ করা যায়।’
চাষি জিয়ার উদ্দিন জানান, এক বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করতে খরচ হয় মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিদুল ইসলাম জানান, এ ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রাম বাউকুল চাষের জন্য বিখ্যাত। প্রতিদিন ২-৩ ট্রাক ভরে বাউকুল দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন কৃষকরা। বাউকুল চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
মহেশপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবু তালহা জানান, বাউকুল একটি লাভজনক ফসল। অল্প সময়ে এটি চাষ করে বেশি লাভ পাওয়া যায়।
তিনি জানান, ২০১১ সালের দিকে উপজেলা কৃষি অফিসের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখি প্রকল্পের (এসসিডিপি) আওতায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ডা. তাজু উদ্দিন দেড় বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন। কুলের পাশাপাশি এই জমিতে বোরো ধান, কলাই চাষ করা যায়।
তিনি বলেন, ‘মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রাম সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাউকুল চাষ এলাকা। এই গ্রামের বাউকুল চাষিদের কৃষি অফিস থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। কারিগরি, রোগবালাই নিরোধ, কৃষক প্রশিক্ষণ, কুল প্যাকেজিংসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।’