কেশবপুরে কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কত অভিযোগ!

আপডেট: 04:00:11 06/12/2018



img

কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি : কেশবপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল উদ্দিন সরদার। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়কও বটেন। পৌরসভার নির্বাচনে তার বিতর্কিত বিজয়ের পর শুরু হয় চাঁদাবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। গত পৌনে তিন বছরে এলাকার যে কোনো কাজে তাকে চাঁদা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি কেনা-বেচা, বাড়ি বা প্রাচীর নির্মাণ, বিয়ের তালাক, তার ওয়ার্ডে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, ঠিকাদারি কাজে চাঁদাসহ ওয়ারেশ কায়েম সনদ, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা কার্ড, ল্যাকটেটিন মাদার সহায়তা কার্ডসহ অন্যান্য সরকারি ভাতা পেতে তাকে টাকা দিতে হয়। তার বেপরোয়া শাসনেই চলতে হয় তিন নম্বর ওয়ার্ডের সাবদিয়া এলাকার বাসিন্দাদের। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিপদের শেষ নেই। আর ওই সব কাজে সহযোগিতা করতে কাউন্সিলর তার একাধিক ভাগ্নের নেতৃত্বে গড়ে তুলেছেন ‘ভাগ্নে বাহিনী’।
কাউন্সিলরের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ৩ মে সাবদিয়া এলাকায় ঝাড়–মিছিলও হয়েছে। এরপর ৫ মে নারীদের দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রাশিদা বেগমের বিরুদ্ধে পাল্টা ঝাড়–মিছিলও করিয়েছেন তিনি। কাউন্সিলরের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে ওয়ার্ডবাসী দুর্নীতি দমন কমিশনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগপত্র দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি, বলছেন ভুক্তভুগীরা।
এরপর গত ২৮ নভেম্বর চাঁদাবাজির খতিয়ানসহ তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের একটি লিফলেট ছড়ানো হয় পৌর এলাকায়। লিফলেটে কাউন্সিলর জামালের ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা চাঁদাবাজির খতিয়ানসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড উল্লেখ করা হয়।
সাবদিয়া গ্রামের বীমা কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন সরদারকে ২০১৫ সালে পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। বিগত কেশবপুর পৌরসভা নির্বাচনে তিনি তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর দিন দিন তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার ইশারায় চালাতে হয় সাবদিয়া এলাকার সব কর্মকাণ্ড। তার কথার বাইরে গেলে পুলিশের ভয় দেখানো বা মারপিটের শিকার হতে হয়। তার ছেলে শাহিনের হাতে গত এক বছরে কমপক্ষে ১৫ জন যুবক মারপিটের শিকার হয়েছেন। ওই সন্ত্রাসী ছেলে পুলিশের হাতে আটক হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাবদিয়া ওয়ার্ডের মানুষ অজানা আতঙ্কে রয়েছেন। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। পরে হয়রানির ভয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কেউ কথা বলতে চান না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই জানান, ওই কাউন্সিলরের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ছাত্র, দিনমজুর, ভ্যানচালকসহ ১৫-১৬ ব্যক্তি। তাদের মধ্যে সাবেক কাউন্সিলর সাখাওয়াত হোসেন, এইচএসসি পরীক্ষার্থী আব্দুস সালাম, ভ্যানচালক মনিরুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, আব্দুস সামাদ, সোহরাব হোসেন, খলিলুর রহমান প্রমুখ। মামলাও হয়েছে বহু নিরীহ মানুষের নামে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পলাতক থাকায় অনেকের পরিবারে নেমে আসে দুর্বিষহ অবস্থা। এদের অনেকের কাছ থেকে টাকাও নেওয়া হয়েছে পুলিশের ভয় দেখিয়ে। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে চাকরি হারানোর ভয়ে ওই ওয়ার্ডের প্রায় সব শিক্ষক-চাকরীজীবী তাকে চাঁদা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে চলেন। কাউন্সিলর জামালের রোষানলে পড়ে ও পুলিশের ভয়ে গত দুই বছর বহু পুরুষ রাতে বাড়ি ঘুমাতে পারেননি। সাবদিয়া ওয়ার্ডের বহু নিরীহ যুবক এখন উপজেলার বিভিন্ন ঘটনার মামলার আসামি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, একটি ওয়ারেশকায়েম সনদের জন্য তিনি কাউন্সিলর জামালের কাছে গিয়েছিলেন। অনেক দিন ঘুরানোর পর পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ওই সনদপত্র নিতে হয়েছে। আরেক যুবক জানান, তিনি তিন বার সামান্য জমি বিক্রি করেছেন। তিন বারই তাকে চাঁদা দিতে হয়েছে কাউন্সিলর জামালকে।
সাবদিয়া সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শামিমা নার্গিস বলেন, ‘আমাদের বাড়ির পুরনো প্রাচীর ভেঙে নতুন প্রাচীর নির্মাণের সময় কাউন্সিলর জামালউদ্দীন এসে কাজ বন্ধ করে দেয়। এরপর গত ২৭ অক্টোবর পৌরসভার দপ্তরে যেয়ে মেয়রের কাছ থেকে কাজ করার অনুমতি নিই। ফেরার সময় পৌরভবনের নীচে কাউন্সিলর জামালউদ্দীন আমার শ্বশুর ফজলে করিম মোড়লকে মারপিট করে এবং তার পোশাক ছিড়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আমাদের এখন আল্লার কাছে ছাড়া কারো কাছে বিচার চাওয়ার উপায় নেই।’
শহরের ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, তিনি সাবদিয়া এলাকায় একখণ্ড জমি কিনেছেন। ওই জমিতে প্রাচীর দেওয়ার সময় তার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কী কারণে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল হয়রানির ভয়ে সে বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌর এলাকার দরিদ্র কর্মজীবী গর্ভবতী বা দুগ্ধদায়ী মায়েদের সরকার প্রতিমাসে ল্যাকটেটিং ভাতা প্রদান করে থাকে। কেশবপুর পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের ৩৬০ জন এ ভাতা পেয়ে থাকেন। আটটি ওয়ার্ডে গড়ে ৩২ জন করে মা ল্যাকটেটিং ভাতা পেলেও শুধু তিন ওয়ার্ড থেকে ১০৩ জন ল্যাকটেটিং ভাতা পান। কাউন্সিলর জামালউদ্দীন চুক্তির মাধ্যমে এ ভাতা পাওয়ার অনুপযুক্ত ও বয়স্ক সন্তানের মায়েদের ওই কার্ড করিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে জাল আইডি কার্ড তৈরি করে ২২ জনের নামে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা কার্ড করে দেন তিনি; যা সমাজসেবা অফিসে যাচাই-বাছাইকালে ভুয়া প্রমাণিত হয়।
কাউন্সিলর হয়ে ২০১৬ সালে সাবদিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসার সভাপতি হন জামাল উদ্দিন। এরপর নিয়োগ-বাণিজ্য, শিক্ষকদের বেতনের অর্ধেক টাকা জোর করে নিয়ে নেওয়া, এমনকি মাদরাসার দুই বছরের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে আদায় হওয়া সব টাকা নিয়ে চলে গেছেন তিনি। তার অবৈধ হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ধ্বংস হতে চলেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তিন নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় বাড়ি নির্মাণের প্লান পাশ করাতে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয় কাউন্সিলরকে। তার অনুমতি ছাড়া কোনো নির্মাণ কাজ শুরু করলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, তিনি রান্নাঘরের ছাউনি যাতে উড়ে না যায় সে জন্য ইট দিয়ে চূড়া তৈরি করেছেন। এ জন্য তাকে ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই ওয়ার্ডের এক ব্যক্তির মেয়ে বাপের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর কাউন্সিলর জামাল ছেলে পক্ষের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে মেয়েটিকে দিয়ে তালাক দেওয়াতে বাধ্য করেছেন। তিনি শহরের এক নিকাহ রেজিস্ট্রারকে হুমকি দিয়ে বলে এসেছেন, তার ওয়ার্ডের কেউ বিয়ে বা তালাক দিতে এলে তাকে যেন জানানো হয়।
টাকা ছাড়া তার কাছে পৌরসভার কোনো নাগরিক সুবিধা পান না। কেউ এই বিষয়ে কথা বললে তাকে পুলিশের হয়রানির ভয় দেখানো হয়।
সাবদিয়া ওয়ার্ডের হতদরিদ্র কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভূমিহীন মানুষ, রাজনীতি বুঝি না। অন্যের জায়গায় বসবাস করি। চলতি বছরের ২ মে সন্ধ্যায় কাউন্সিলর জামালউদ্দীনের ছেলে শাহীনের নেতৃত্বে ৪-৫ জন যুবক অফিসপাড়ার পাবলিক ময়দানে ডেকে নিয়ে আমাকে বেদম মারপিট করে। এ ঘটনায় ওই রাতে থানায় অভিযোগ দিতে গেলে কাউন্সিলর জামালউদ্দীন উল্টো অভিযোগ দিয়ে আমাকে থানায় আটকে দেয়। তার প্রভাবে পুলিশ নাশকাতার পেন্ডিং মামলায় আমাকে চালান করে দেয়। পরে আরো একটি মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছে আমাকে।’
তবে কাউন্সিলর জামালউদ্দীন দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘লিফলেটে উল্লিখিত সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। কারো কাছ থেকে টাকা নিয়েছি প্রমাণিত হলে আমি জমি বিক্রি করে সবার টাকা দিয়ে দেবো।’
তিনি বলেন, ‘রাশিদা বেগম নামে এক মহিলা আমার বিরদ্ধে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে। শামীমা নার্গিস নামে এক নারী রাস্তার জমির ওপর প্রাচীর করছিল। তাই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার শ্বশুরকে বায়সা এলাকার কামরুল মারপিট করেছিল। আর আমি ঠেকিয়ে দিয়েছিলাম।’
কেশবপুর পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যতদূর জানি ও লিফলেট পড়ে মনে হয়েছে, কাউন্সিলর জামালের অবৈধ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ৫ শতাংশ লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। পৌরসভায় বিচারপ্রার্থী সাবদিয়া ওয়ার্ডের সম্মানী ব্যক্তি ব্যবসায়ী ফজলে করিম মোড়লকে পৌর ভবনের নীচে কাউন্সিলর জামাল নিজে মারপিট করে এবং পুলিশ নিয়ে আসে তাকে আটক করানোর জন্য। এ সময় আমার হস্তক্ষেপে তিনি রেহাই পান। কাউন্সিলর জামালের শক্তির উৎস অন্য জায়গায়। যে কারণে আমিসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। জামালের কারণে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহিন বলেন, ‘কাউন্সিলর জামালকে নিয়ে প্রচারিত একটি লিফলেট পেয়েছি। আমি সম্প্রতি এ থানায় যোগ দিয়েছি। আগে কী ঘটেছে বলতে পারবো না। তবে আমি যোগদানের পর শুধু কাউন্সিলর জামাল নয়, যে-ই পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে জানতে পারছি, তখনই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক ভুক্তভোগী অনায়াসেই আমার কাছে অভিযোগ করতে পারেন। আমি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, একটি লিফলেট ইউএনও বরাবর পাঠানো হয়েছে। লিফলেট পাওয়ার পর থানার ওসিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন