কেড়ে নেওয়া হোক সুচির নোবেল

আপডেট: 01:11:45 30/08/2017



img

সাজেদুল হক

নেট দুনিয়ায় নানা ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবং এই ঘুরে বেড়ানো নতুন কিছু নয়। কারোরই রেহাই মেলেনি। গর্ভবতী মা। মাতৃগর্ভের শিশু। গুলি খাও, না হয় আগুনে পুড়ে মরো। ধর্ষণ যেন মামুলি ব্যাপার। বাঁচতে চাইলে পালাও। এবার অবশ্য পালাতে গেলেও গুলির মুখে পড়তে হচ্ছে।
এই লেখা শুরুর সঙ্গেই সঙ্গেই নজরে এলো হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট। স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবিতে ধরা পড়েছে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার চিহ্ন। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক শ’ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে একই দৃশ্য। গত বছরও গ্রামের পর গ্রামে আগুন দিয়েছিল সরকারি বাহিনী। এবারের ঘটনা আরো ভয়াবহ।
মানবাধিকার শব্দ নিয়ে অনেক বাকওয়াজ। এটা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। যদিও দুনিয়ায় এর বেঁচে থাকা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। মিয়ানমারের দৃশ্যপটের দিকে তাকালে সে সন্দেহ অবশ্য অনেকটা কেটে যায়। নাফ নদে শুধু জীবিত, মৃত মানুষই ঘুরে বেড়াচ্ছে না, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানবতা। তবে এই দৃশ্য এর চেয়েও বেশি মৃত্যু ঘোষণা করেছে এক নারীকে দেওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কারের। দুই যুগের কিছু বেশি সময় আগে অং সান সুচিকে যখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তখন দৃশ্যপট কেমনই না ছিল। সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে রাজনীতিবিদ, পরে গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের জন্য বিরামহীন লড়াই। কত যন্ত্রণা আর নিপীড়নই না সইতে হয়েছে তাকে। নিজ ঘরে বন্দি ছিলেন দিনের পর দিন। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তার সব অধিকার। সেসময় সুচির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল সারা দুনিয়া। সোচ্চার ছিলাম আমরাও।
নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। এ পুরস্কারে রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে তাও অনেকদিন হলো। কিন্তু সুচির নোবেল নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন তখন ওঠেনি। কিন্তু হায় ক্ষমতা। ক্ষমতায় যাওয়ার পরই বদলে গেলেন কথিত শান্তিকন্যা। দেখা গেলো তার নতুন রূপ। ভয়ঙ্কর। তার সরকারের সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন যে তিনি শুধু চোখ বুজে দেখলেন তাই নয়। তিনি তা অনুমোদন করলেন প্রকাশ্যে। তিনি মুখ খুললেন। তার এই মুখ খোলা হলো গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানবাধিকারের বিরুদ্ধে। মানবতাবাদী মানুষ ধিক্কার জানালেন তাকে। কিন্তু তাতে কী? তার চাই রক্ত আর ক্ষমতা। হাতে রক্তের দাগ নিয়ে তিনি বললেন, রোহিঙ্গারাই রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে। সেখানে কোনো জাতিগত নিধন হয়নি। মুনীর চৌধুরী লিখে গেছেন, মানুষ মরে গেলে পচে যায়। বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে বদলায়। কিন্তু কেউ কেউ যে, বেঁচে থেকেও পচে যায় অং সান সুচি তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।
গত বছরই দাবিটি উঠেছিল। হাজার হাজার মানুষ সই করেছিলেন সেই দাবিতে। নোবেল কমিটির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল অং সান সুচির নোবেল শান্তি পুরস্কার যেন প্রত্যাহার করা হয়। কারণ তার এই পুরস্কার শান্তিকামী মানুষের জন্য অবমাননা। সে দাবির প্রতি এখনো পর্যন্ত সাড়া দেয়নি নোবেল কমিটি। হয়তোবা এর কোনো নজির নেই বলেই তারা নীরবতা পালন করছেন। কিন্তু পৃথিবীতে নজিরবিহীন অনেক ঘটনাই ঘটছে। অং সান সুচি যে এতটা বদলে গেছেন তা কি নজিরবিহীন নয়? মানবাধিকারের প্রতি, মানুষের প্রতি যে বর্বর আচরণ তার, তা শুধু তাকে নয়, লজ্জায় ফেলেছে নোবেল শান্তি পুরস্কারটিকেও। বিতর্ক সত্ত্বেও এ পুরস্কারের যেটুকু মর্যাদা রয়েছে তাও কলঙ্কিত হচ্ছে সুচির কারণে। তার হাতে এ পুরস্কার বড্ড বেমানান। সুচির কাছ থেকে এই পুরস্কার কেড়ে নেওয়া প্রয়োজন। সেটা শুধু পুরস্কারটির মর্যাদা রক্ষার জন্যই নয়, বরং যারা এ পুরস্কার পেয়েছেন বা ভবিষ্যতে যারা পাবেন তারা যেন মানবতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করার আগে অন্তত ভাবেন সেজন্য হলেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
নেট দুনিয়ায় ভেসে বেড়ানো ছবির কথা আগেই বলেছি। বহু ছবি। হত্যা, ধর্ষণের শিকার লাশের বীভৎস ছবি। আহত মানুষের আর্তনাদ। ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিহত শিশুর লাশের ছবি। আশ্রয়ের খোঁজে পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষ। যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়, তারা কি নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন। মিয়ানমারের কথিত গণতন্ত্রের নেত্রীর ওপর তারা কি কোনো চাপ প্রয়োগ করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। নির্যাতিতদের ধর্ম পরিচয় কী মুখ্য হয়ে উঠছে? জাতিসংঘ অবশ্য সার্টিফিকেট দিয়েই তাদের কাজ অনেকটা সেরেছে। রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জাতি এ সার্টিফিকেট  দেওয়া কম কীসে! আনান কমিশনও কিছু সুপারিশ করেছে। সুপারিশেই সার। কিন্তু পরিস্থিতি কিছুই বদলায়নি। সুপারিশের পরপরই উপলক্ষকে উসিলা বানিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতনের পথই বেঁচে নিয়েছে তারা। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোও পরিচয় দিয়েছে নিদারুণ ব্যর্থতার। তাদের সব সামরিক জোট যেন কেবল নিজ স্বার্থ রক্ষায়। আর এসব দেশের নেতাদের বেশি আনাগোনা অবকাশ কেন্দ্রে। রোহিঙ্গা মুসলিমরা থাকুক নদীতে। আর বিশ্ব নেতারা থাকুক অবকাশ কেন্দ্রে। এ এক চমৎকার দৃশ্য।
[ মানবজমিনের বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন