কোটা : সহিংসতা নয়, শান্তিপূর্ণ সমাধান জরুরি

আপডেট: 02:38:23 09/04/2018



img

মামুন কবীর

পড়া ফেলে, কাজ ফেলে ছাত্র-তরুণ-বেকার যুবকরা রাস্তায় নেমেছে, রাস্তা অবরোধ করছে। পুলিশ আর সরকারি বাহিনী তাদের উপর চড়াও। লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, আহত, গ্রেপ্তার, ছড়িয়ে পড়ছে সহিংসতা। পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম। দাবি রাষ্ট্রের চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। অনেকদিন নিশ্চুপ থাকার পর রাষ্ট্র এখন সহিংস চরিত্র ধারণ করেছে। হামলে পড়েছে পুলিশ। কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অত্যন্ত দুঃখজনক। কোন দাবির ন্যায্যতা তা বিশ্লেষণ না করে, আন্দোলনকারীদের সাথে কোন আলোচনায় না গিয়েই আন্দোলনকারীদের উপর রাষ্ট্রের আক্রমণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সুস্পষ্টভাবেই অধিকারের লঙ্ঘন। সুশৃঙ্ক্ষল আন্দোলনকে সহিংস করে তোলা, তাদের উপর আক্রমণ করা কতটা যৌক্তিক?
আমি মনে করি এখনও বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী, নারী, প্রান্তিক মানুষদের জন্য কোটার যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু সেটা কতটুকু তা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যেখানে মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন সেখানে অনেকদিন আগে নির্ধারিত কোটা ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তাছাড়া যেসব ক্ষেত্রে কোটা রাখা হয়েছে সেগুলোও পুনর্বিন্যাস ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অসমতাও পরিলক্ষিত হয়। সমতলের আদিবাসী, কিংবা শ্রমজীবী তথা পিছিয়ে পড়া দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের সন্তানরা বঞ্চিত হচ্ছে। তাদেরকে কোটায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
যতদূর জানি, আন্দোলনকারীরা সংস্কার চেয়েছে। তারা বাতিল করার দাবি করেনি। ফলে সরকারের বিশেষজ্ঞরা দাবি নিয়ে বিশ্লেষণ এবং আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে একটা সুষ্ঠু সমাধানে যেতেই পারতেন। এভাবে হামলা সহিংসতার প্রয়োজন ছিল না।
হামলা করে, নিপীড়ন করে কোনদিন কোন আন্দোলন দমিয়ে রাখা যায়নি। আর যায়ও না। প্রয়োজন সুষ্ঠু আলোচনার। তরুণ সমাজ যৌক্তিক আলোচনাকে নিশ্চয়ই অবজ্ঞা করবে না। সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলে তরুণরা নিশ্চয়ই তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা সরকারের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরবে। আলোচনায় যারা নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে পারবে তাদের বিষয়গুলো সরকার বিবেচনায় নিক। আলোচনার বিকল্প কিছু নেই। সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে, লাঠি-গুলি দিয়ে পৃথিবীর কোন আন্দোলনকে কোনদিন ধ্বংস করা যায়নি। ইতিহাস থেকে অবশ্যই এই শিক্ষা তাদেরকে নিতে হবে। সহিংসতা কোনদিনও কাম্য নয়।
নিশ্চিন্ত কর্মজীবন সকলেরই কাম্য। আমাদের দেশে রাষ্ট্রের কর্মচারী হওয়াটাকে সবাই নিশ্চিন্ত জীবন মনে করে। কারণ এখানে মোটা অঙ্কের বেতন, ঘুষসহ অন্যান্য সকল প্রকার সুবিধা অবারিত। আর বাকি সকল কর্মক্ষেত্রগুলোই এখানে চ্যালেঞ্জিং। তাই রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে সকলেই নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতে চায়। নিশ্চিন্ত জীবন চাওয়া দোষের কিছু না। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদেরকে কেরানির মানসিকতা দিয়ে তৈরি করে। জীবনের চ্যালেঞ্জকে বরণ করে নিতে আমরা ভয় পাই। আর তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান এবং মানবাধিকারের সনদ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র পছন্দ করে নেবার অধিকার সকলেরই আছে। তরুণরা নিশ্চিন্ত জীবন চায়। তাতে দোষের কিছু নেই।
চাকরির, কাজের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক তরুণ-যুবকই এখন দেশান্তরী হতে চায়। পড়ালেখা শেষ করে থাকতে চায় না এই দেশে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তরুণদের নিয়ে একটি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণ দেশে থাকতে চায় না। কারণ তারা মনে করে নিজেদের দেশে সবার জন্য সমান সুযোগ নেই। জরিপে প্রশ্ন ছিল, সমাজে কোন কোন ঘাটতি তাদের জীবনযাপন ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় প্রভাব ফেলছে। তারা এ জন্য পাঁচটি বাধার কথা বলেছেন। অর্ধেক তরুণই বলেছেন, তাদের সমাজে অসমতাই বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া তরুণেরা মনে করেন, দেশে তারা নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারছেন না, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন না, নিজের পছন্দের জায়গায় কাজ করা যায় না এবং ন্যায্য বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা সম্ভব হয় না। অথচ নিশ্চিন্ত কাজের পরিবেশ পেলে তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আরও অনেকখানি। তারা বিদেশে গিয়ে কাজ করে সেসব দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন সেক্টরে। তাছাড়া, অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানরাও পাড়ি দিচ্ছে অন্য দেশে একটু নিশ্চিত জীবনের আশায়। এমন পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো, নিশ্চিত জীবনের, কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দায় রাষ্ট্র অস্বীকার করতে পারে না।
তরুণ-যুবদের জন্য কাজ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পুরনো ব্যবস্থাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই। সময়ের দাবিকে অগ্রাহ্য করা যুক্তিসাপেক্ষ নয়। তাই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আলোচনার জন্য। সরকারের তরফ থেকে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হোক। ১৫ দিন কিংবা এক মাস সময় নিয়ে তারা সকল দাবি-দাওয়া বিশ্লেষণ করে দেখুক এর যৌক্তিকতা। তারপর একটা প্রতিবেদন দাখিল করুক এবং তা জনগণের সামনে প্রকাশ করুক। তার ভিত্তিতে আলোচনা হোক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথে।
সহিংসতা নয়, শান্তিপূর্ণ সমাধান জরুরি। রাস্তায় সময় নষ্ট না করে কাজে থাকলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তাই সরকার অতিদ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধানের রাস্তা বেছে নিক। তরুণ-যুবরা রাস্তা ছেড়ে ঘরে ফিরে আসুক। কাজ করুক রাষ্ট্রের উন্নয়নে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে এখনো অনেক পথ বাকি। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশকে। তাই বিরোধ নয়, আসুন সহিংসতার রাস্তা ছেড়ে সমাধানের রাস্তা খুঁজে বের করি। আর এর উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্র পক্ষকেই।

লেখক : মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন