খাদ্যনীতিতে বহুজাতিক করপোরেশনের থাবা

আপডেট: 02:51:34 19/09/2019



img

অ্যান্ড্রু জেকবস : অস্বাস্থ্যকর খাবারে লাল সতর্কবার্তা লাগানো বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়ে স্থূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গতবছর প্রায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছিল ভারত। কিন্তু প্রভাবশালী খাদ্য কোম্পানিগুলোর কাছে মাথা নত করে তা থেকে সরে আসে দেশটি। তবে সমালোচকদের চোখে ধুলা দিতে ওই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় একটি কমিটি করা হয়।
কিন্তু মনোযোগ দেওয়ার বিষয় হলো- তিন সদস্যের ওই কমিটির প্রধান করা হয় এমন একজনকে, যিনি শীর্ষ একটি বহুজাতিক খাদ্য ও পানীয় কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা। শুধু তাই নয় এধরনের কোম্পানিগুলোর অর্থায়নে তৈরি একটি ‘অলাভজনক’ সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত তিনি।
তিনি ভারতের জাতীয় পুষ্টি ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. বোইন্ডালা সেসিকেরান। একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদ হিসেবে তার নিয়োগে আপত্তির কথা না থাকলেও ভারতের স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
কারণ সেসিকেরান ইন্টারন্যাশনাল লাইফ সায়েন্স ইন্সটিটিউট (আইএলএসআই) নামে আমেরিকার একটি অলাভজনক সংস্থার ট্রাস্ট্রি। সংস্থাটি দৃশ্যত নিরপরাধ নামধারণ করে গোপনে বিশ্বজুড়ে সরকারের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক কমিটিতে ঢুকে পড়ছে।
চার দশক আগে কোকাকোলার শীর্ষ নির্বাহীদের হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় সম্পূর্ণরূপে কৃষিবাণিজ্য, খাদ্য ও ওষুধ শিল্প দানবদের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এর ১৭টি শাখা আছে। গত শতকের আশি ও নব্বুইয়ের দশকে ইউরোপ ও আমেরিকায় তামাকের স্বার্থ রক্ষায় জয়ী সংস্থাটি সম্প্রতি খাদ্য কোম্পানিগুলোর মুনাফার উল্লেখযোগ্য যোগানদাতা এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায়ও কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের প্রথম, দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ জনবহুল দেশ যথাক্রমে চীন, ভারত ও ব্রাজিলে সংস্থাটি সক্রিয়।
চীনে স্থূলতাকেন্দ্রীক মহামারি প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীবাহিনী ও কর্মস্থল ভাগাভাগি করে নিয়ে কাজ করছে আইএলএসআই। এর প্রতিনিধিরা ব্রাজিলে খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক অনেকগুলো প্যানেল দখল করেছে, যেগুলো আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
আর ভারতে খাদ্যে সতর্কবার্তা সংযুক্তি পর্যালোচনা কমিটির নেতৃত্বে সিসেকেরনকে আনায় প্রশ্ন উঠেছে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা লাল সতর্কবার্তার বিরোধিতাকারী প্যাকেটজাত খাদ্য প্রস্তুতকারকদের হাতের মুঠোয় চলে গেল কিনা।
বেসরকারি সংস্থা ইন্ডিয়া রিসোর্স সেন্টারের সমন্বয়কারী অমিত শ্রীবাস্তব বলেন, “এখানে খারপটা কী? জনস্বাস্থ্যের নীতিমালার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খাদ্য কোম্পানির লবিস্টদের পাওয়াটাই মারাত্মক ভুল এবং এর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে।”
তবে করপোরেট স্বার্থ রক্ষায় কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করে আইএলএসআই এক বিবৃতিতে বলেছে, “কোনো অবস্থাতেই তারা প্রতিকূল নীতি ও আইনের মুখোমুখি হওয়া থেকে খাদ্য শিল্পকে রক্ষা করে না।”
বেশ কয়েক দশক ধরে নজরে থাকার পর আইএলএসআইয়ের কর্মকাণ্ডগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন বিদেশের স্বাস্থ্য অধিকার গোষ্ঠীগুলোর কড়া নজরদারির মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, বছরে এক কোটি ৭০ লাখ ডলারের যোগানদাতা কোকা-কোলা, ডুপন্ট, পেপসিকো, জেনারেল মিলস এবং ডানোসহ প্রায় ৪০০ করপোরেট সদস্যের স্বার্থরক্ষাকারী একটি সংগঠনের চেয়ে বেশি কিছু নয় এ প্রতিষ্ঠান।
খাদ্য শিল্পের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে সমালোচকরা প্রশ্ন তোলার পর ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ অবস্থান হারায় আইএলএসআই।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত চল্লিশ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে নিজের অর্থায়নে সম্মেলনের আয়োজন এবং খাদ্য সুরক্ষা, কৃষি রসায়ন ও প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট বিষয়ক কমিটিতে প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের নিয়োগ দিয়ে আইএলএসআই পদ্ধতিগতভাবে গবেষক মহল ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে।
তবে সম্মেলনের বিষয়গুলো ‘রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত’ হয় না, যার পেছনে বৃহত্তর উদ্দেশ্য কাজ করে বলে সমালোচকদের মত। তা হলো- এমন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, যারা হয়তো ম্যাকডোনাল্ডস বা কেলোগসের আয়োজনে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে চাইবেন না।
ভারতের অলাভজনক সংগঠন পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের পুষ্টিবিদ ড. শ্বেতা খানডেলওয়াল বলেন, এই প্রতিষ্ঠান সবসময় পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং তারা মধ্যাহ্নভোজনও করায়।
যেভাবেই দেখেন না কেন, সেসিকেরান আইএলএসআইয়ের জন্য আদর্শ নিয়োগ; সরকারের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পদধারী পুষ্টিবিদ। ভারতের জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউট ছাড়ার পর গত সাত বছরে তিনি নেসলে, জাপানি খাদ্যজায়ান্ট অজিনোমোটো ও ইতালিয়ান চকোলেট প্রস্তুতকারক ফেরেরোর মতো কোম্পানির পরামর্শক ছিলেন।
২০১৫ সাল থেকে সেসিকেরান আইএলএসআই-ভারত ও ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠনটির বৈশ্বিক কার্যক্রমে ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রায়ই আইএলএসআইয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে বক্তা থাকেন, সেখানে তিনি কৃত্রিম মিষ্টি ও জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) ফসলের সুবিধার পক্ষে কথা বলেন। আইএলএসআইয়ের পদগুলো বিনা বেতনের হলেও অনুষ্ঠানের জন্য বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের ব্যয় তারাই বহন করে।
খাদ্যে সতর্কবার্তা লাগানো পর্যালোচনায় সেসিকেরানকে দায়িত্ব দিয়েছে যে কর্তৃপক্ষ (ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি), তার প্রধান নির্বাহী পবনকুমার আগরওয়ালও আইএলএসআই সেমিনারে সেসিকেরারেন পাশে বসে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০১৬ সালে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড সর্ষে গাছের উপকারিতা-অপকারিতা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটির জন্যও তিনি সেসিকেরানকেই বাছাই করেছিলেন।
ভারতীয় আইন অনুযায়ী এ ধরনের বৈজ্ঞানিক প্যানেলগুলোর আসন যে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের জন্য সংরক্ষিত, সম্প্রতি খাদ্য কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে তা তুলে ধরেছেন ইন্ডিয়া রিসোর্স সেন্টারের শ্রীবাস্তব। আইএলএসআইয়ের ঘোষণাপত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমস্ত স্বার্থের উপরে রাখার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “নিয়ন্ত্রিতরা নিয়ন্ত্রক হতে পারে না।”
এবিষয়ে কথা বলতে সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি সেসিকেরান। তবে ভারতের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ গুপ্ত বলেন, সিসেকিরন ব্যক্তিগতভাবে খাদ্যশিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পক্ষে তার কাছে সাফাই গেয়েছেন। তার যুক্তি, ‘খাদ্য শিল্পের বিপক্ষে না গিয়ে ভেতরে থেকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবেন।’
আইএলএসআই-ইন্ডিয়ার দীর্ঘকালীন নির্বাহী পরিচালক রেখা সিনহা বলেন, সংস্থাটি শিল্পের পক্ষে কাজ করে- অভিযোগটি ঠিক নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দশকে আইএলএসআই-ভারত ডায়াবেটিস ও ভিটামিন নিয়ে গবেষণায় অর্থায়ন করেছে; এইচআইভি ও এইডস আক্রান্তদের পুষ্টি কীভাবে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইএলএসআই অনেক সমালোচনাও কুড়িয়েছে। গত একবছরে গবেষকরা দেখিয়েছেন, কীভাবে এই সংস্থার চীন শাখা স্থূলতাবিরোধী শিক্ষা প্রচারণাকে তাদের মতো রূপ দিয়েছিল। এই প্রচারণা ওজন কমাতে খাদ্যতালিকা পরিবর্তনের বদলে শরীরচর্চায় জোর দেয়। করপোরেট মুনাফা রক্ষায় কোকা-কোলার দীর্ঘ দিন ধরে এ প্রচারণা চালিয়েছে বলে সমালোচকরা বলে থাকেন।
বেইজিংয়ে আইএলএসআই ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক এতোই গভীর আইএলএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্তারা চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসাবে দ্বিগুণ সংখ্যায় নিয়োগ পেয়েছেন।
তথ্য অধিকারের আওতায় আবেদন করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক আইএলএসআই ট্রাস্টি, এর করপোরেট সদস্য ও মিত্র গবেষকদের মধ্যে চালাচালি হওয়া ইমেল হাতে পেয়েছেন, যাতে তারা চিনির বিষয়ে ডব্লিউএইচওর কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
২০১৫ সালের এরকম একটি মেইলে আইএলএসআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স মালাস্পিনা ডব্লুএইচওর মহাপরিচালক ড. মার্গারেট চ্যানকে প্রভাবিত করার কৌশলের বিষয়ে আইএলএসআই ট্রাস্টি ও আটলান্টার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তার পরামর্শ চান। ২০০১ সালে আইএলএসআইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবসর নিলেও এখনো সংস্থাটির কর্মী, ট্রাস্টি ও করপোরেট সদস্যদের সঙ্গে মালাস্পিনার যোগাযোগ আছে।
ইমেইলে তিনি লিখেছেন, “আমাদের অবশ্যই সংলাপ শুরুর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তা নাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস করে দেবেন। আমাদের ব্যবসার জন্য এটা মারাত্মক হুমকি।”
আইএলএসআইয়ের ট্রাস্টি ও ওজন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ জেমস হিল জবাবে বলেন, “স্থূলতার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে খাদ্য শিল্পবিরোধী অবস্থান নেওয়া থেকে ডব্লিউএইচওকে ঠেকাতে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।”
তবে এক বিবৃতিতে ডব্লিউএইচওকে প্রভাবিত করার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও ভুল’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে আইএলএসআই। বিদেশের কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদ না জানালেও বা সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব না দিলেও অপর এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘আইএলএসআইয়ের বৈজ্ঞানিক দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য’ নিয়ন্ত্রকদের কাছে সরবরাহ করার অনুমতি আছে।
এই প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ওয়েবসাইটে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধিতে আইএলএসআই প্রকল্প ‘বৃহৎ জনস্বাস্থ্য স্বার্থকেন্দ্রীক হবে’ উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও করপোরেট স্বার্থে কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে এই প্রতিষ্ঠানের।
২০০১ সালে ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে ধূমপানের বিপদ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরির লক্ষ্যে একটি গবেষণায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় আইএলএসআইয়ের সমালোচনা করা হয়। খাদ্যশিল্পের স্বার্থে নীতি তৈরিতে প্রভাব ফেলার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে খাদ্য ও পানির মান নির্ধারণ কার্যক্রম থেকে বাদ দেয় ডব্লিউএইচও।
গত দশকে আইএলএসআই ২০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ নিয়েছে রাসায়নিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে, যার মধ্যে অন্যতম মনসান্টো, যেটাকে পরে জার্মান কোম্পানি বেয়ার কিনে নেয়। ডব্লিউএইচওর ক্যানসার বিষয়ক সংস্থার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ২০১৬ সালে জাতিসংঘ মনসান্টোর আগাছারোধী গ্লাইফোসেটকে ‘ক্যানসার ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে রায় দেওয়ার পরে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
পরে দেখা যায়, ওই কমিটি নেতৃত্বের দুজন ছিলেন আইএলএসআই কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে একজন আইএলএসআই-ইউরোপের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালান বুবিস, যিনি রাসায়নিক খাতের পরামর্শক ছিলেন।
ভারতে স্থূলতা ও কার্ডিওভাসকুলার রোগ বিশেষ করে ডায়াবেটিসের হারের সঙ্গে আইএলএসআইয়ের প্রভাবও বাড়ছে। দেশটিতে এখন সাত কোটি আক্রান্ত আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চর্বি, চিনি ও লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরবর্তী দশকে এ সংখ্যা ১২ কোটি ৩০ লাখে উন্নীত হতে পারে।
এটা প্রতিরোধে ২০১৭ সালে চিনি-মিষ্টিযুক্ত সোডায় ৪০ শতাংশ করারোপসহ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কিন্তু খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলোর বিরোধিতার মুখে স্কুলে ও আশেপাশে জাংক ফুড বিক্রি নিষিদ্ধ করাসহ অন্যান্য প্রচেষ্টা আর আগায়নি।
নয়া দিল্লিভিত্তিক বিজ্ঞান ও পরিবেশ কেন্দ্রের পরিচালক সুনিতা নারায়ণ বলেন, এই শিল্পের ক্ষমতা তামাক শিল্পের চেয়েও বেশি। চার বছর আগে খাদ্যে সতর্কতাবার্তা সংযুক্তির বিষয়ে সরকারি প্যানেলের সদস্য ছিলেন তিনি, যেটার প্রতিবেদন আলোর মুখই দেখেনি।
তিনি বলেন, “এই প্লেয়াররা খাদ্য শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে হাজির হয় না, তারা ছায়ার মতো কাজ করে। কারণ কেউই সভাকক্ষে কোকা-কোলা বা পেপসি গ্রহণ করবে না। কিন্তু তারপরও আইএলএসআই-ইন্ডিয়া তার সহযোগীদের সেই কক্ষে ঢুকাতে পেরেছে।”
সেসিকেরান ছাড়াও আইএলএসআই সদস্য ও ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন কর্মকর্তা ডা. দেবব্রত কানুনগো খাদ্য বিষয়ে দুটি বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সদস্য, যার একটি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের সুরক্ষা এবং অন্যটি প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে সম্পূরক সংযোজনের বিষয়ে কাজ করে। শিক্ষায় অর্থনীতিবিদ আইএলএসআই-ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক সিনহা স্বল্প সময়ের জন্য সিসেকিরনের সঙ্গে পুষ্টি বিষয়ে একটি সরকারি প্যানেলের সদস্য ছিলেন। তবে স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় তাদের অপসারণ করা হয়।
তবে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রভাব বাড়লেও আইএলএসআই মাঝে মাঝে ধাক্কা খেয়েছে। আর্জেন্টিনায় শৈশবকালের স্থূলতা নিয়ে আইএলএসআইয়ের অর্থায়নের গবেষণা প্রকল্পটি তিন বছর আগে বাতিল করা হয়, যখন গবেষণায় তালিকাভুক্ত শিশুদের পিতা-মাতারা সংগঠনটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। ২০১৫ সালে মেক্সিকোতে মিষ্টান্ন নিয়ে একটি সম্মেলনের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে অপ্রত্যাশিত লেখা প্রকাশের পরে সেখানে আইএলএসআইয়ের কার্যকম বন্ধ করা হয়।
পরে দেখা গেছে, বক্তাদের অনেকেই পানীয় শিল্পের পক্ষের সুপরিচিত সমর্থক ছিলেন এবং সেসময় মেক্সিকান সরকার চিনিযুক্ত পানীয়গুলোতে নতুন কর আরোপের চিন্তা করছিল। দেশটির বিজ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় কোকা-কোকালার প্রাক্তন নির্বাহী ও আইএলএসআই-মেক্সিকো প্রধান রাওল পোর্তিলো সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বে থাকলেও কোনো কাজে আসেনি।
আইএলএসআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালস্পিনা সংস্থাটির এক ট্রাস্টির কাছে পাঠানো ইমেইলে ঘটনাটিকে একটি ‘বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আইএলএসআই-মেক্সিকোর কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্তে তিনি দুঃখিত।
“আমি আশা করি, আমাদের এর চেয়ে আর পতন হবে না। কোক ও আইএলএসআইয়ের স্বার্থ পুনরুদ্ধারে আমরা সক্ষম হবো।”
তবে ওই স্থগিতাদেশ এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে উঠে যায়। আইএলএসআই-মেক্সিকো নতুন রূপে ফিরেছে। কোকা-কোলা মেক্সিকোর জনসংযোগ পরিচালক জে এদুয়ার্দো সার্ভেন্টেস নতুন নির্বাহী পরিচালক।
[নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ। বিডিনিউজ থেকে।]