খান টিপু সুলতানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

আপডেট: 02:37:06 20/08/2017



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন খান টিপু সুলতান; শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর সেন্ট্রাল হসপিটালে যার জীবনাবসান হয়েছে।
স্বজন, পারিবারিক ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা জানিয়েছেন, ১৯৫০ সালের ১৩ ডিসেম্বর খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়ায় মামার বাড়িতে জন্ম হয় খান টিপু সুলতানের। তার দাদার বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার চ-ীবরপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাথান গ্রামে। বাবা আব্দুল হামিদ খান তালুক দেখাশুনা করতেন, আর মা আনজীবন আরা বেগম ছিলেন গৃহিণী। দাদা ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলে যশোর জেলার অনারারি ম্যজিস্ট্রেট। পরবর্তীতে তিনি পিভি কাউন্সিলের মেম্বার হয়েছিলেন।
ছোট বেলায় দাদা-দাদির মৃত্যুর কারণে তার বাবা নানাবাড়িতে বড় হয়েছিলেন এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করেছিলেন। টিপু সুলতান তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে পঞ্চম এবং ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়।
১৯৮২ সালের ১৭ অক্টোবর খুলনার মেয়ে ডা. জেসমিন আরা বেগমকে বিয়ে করেন টিপু। তার স্ত্রী ঢাকা হলি ফ্যামিলি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। পারিবারিক জীবনে তারা দুই ছেলেসন্তানের বাবা-মা।
১৯৫৬ সালে ডুমুরিয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের পাঠশালাতে টিপু সুলতানের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে টিপু সুলতান অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। এসময় লেখাপড়ার জন্য তাকে যশোরের লোন অফিসপাড়ায় মামাবাড়িতে চলে আসতে হয়। ১৯৬৪ সালে যশোর সম্মিলনী ইনসটিটিউশনে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। ১৯৬৭ সালে এই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন টিপু। পরে বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে ভর্তি হন তৎকালীন যশোর কলেজে (বর্তমানে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ)। এরপর তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন সেনাশাসক আইয়ুব খানের শাসন আমল। রাজনীতি করার ‘অপরাধে’ এমএম কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯৬৮ সালে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় তিনি ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে চলে যান নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে। ১৯৬৯ সালে সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। পরে আবার যশোরে ফিরে এম এম কলেজে বিকম ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে কলেজ ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে একই কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন টিপু।
একই বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে নিজ উদ্যোগে যশোরে শহীদ মসিয়ূর রহমানের নামে একটি আইন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে সেখানেই আইনের ছাত্র হয়েছিলেন তিনি। তখন রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত আইনের ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হয়ে ওঠেনি তার। ১৯৭২-৭৫-এর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যশোরে তার দাপট ছিল ভীষণ। সে সময় সশস্ত্র অনুসারীসহ চলাফেরা করতেন টিপু সুলতান। তার বিরুদ্ধে এ সময় অনেক খুন-খারাবির অভিযোগও ওঠে। এসব কারণে একদিকে তার যেমন পরিচিতি ছিল ব্যাপক, সমীহও করতো মানুষ।
এরপর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তৎকালীন সামরিক সরকারের হাতে গ্রেফতার হন টিপু সুলতান। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাটাতে হয় দুই বছর।
বন্দি অবস্থায় ১৯৭৬ সালে এলএলবি ফাইনাল পরীক্ষার জন্য আবেদন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৭৭ সালে ল সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দিলে পরীক্ষার আগের দিন তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে যশোর কারাগারে আনা হয়। এই কারাগারে বসে পরীক্ষা দিয়ে এলএলবি পাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৭৭ সালের আক্টোবরে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭৮ সালে বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেটশিপ অর্জন করেন এবং আইন পেশায় যোগ দেন। পরে ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট ডিভিশনে প্রাকটিস করার সনদ পান তিনি।
খান টিপু সুলতানের সম্পাদনায় ১৯৭২ সালে যশোর থেকে ‘সাপ্তাহিক বিপ্লব’ নামে একটি পত্রিকা বের হয়। ১৯৭৫ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে বেরিয়ে তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকারের কাছে সাপ্তাহিকটি পুনঃপ্রকাশের আবেদন করেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি পুরোপুরি আইন পেশায় নিয়োজিত হন।
১৯৮৯ সালে টিপু সুলতান যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই বছরেই অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান তিনি। ওই নির্বাচনে তাকে হারিয়ে যিনি জয়ী হয়েছিলেন ১৯৯০ সালে তার আকস্মিক মৃত্যু হলে খান টিপু সুলতানকে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন।
খান টিপু সুলতান ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যশোরের এম এম কলেজ থেকে প্রথম মিছিল বের করেন। এসময় তিনি যশোরের ছাত্রসমাজের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের পরই যশোর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন খান টিপু সুলতান। এ সময়ে আইয়ুব খানের পতন এবং ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা আসে। এর কিছুদিন পর যশোরে মুসলিম লীগের নেতা নূরুল আমিনের আগমন নিয়ে গণপ্রতিরোধ সৃষ্টিতে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ ঘটনায় টিপুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মামলা হয়। বিচারে তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গ্রেফতার এড়িয়ে ১৯৭০-এর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য চট্টগ্রাম ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করেন। পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে সামরিক সরকার মামলাটি তুলে নেয়।
১৯৭১ সালের প্রথম দিকে যশোর জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নেন টিপু সুলতান। ওই সালের ২৩ মার্চ নিয়াজ পার্ক হিসেবে পরিচিত কালেক্টরেট ময়দানে মঞ্চ তৈরি করে রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। তখন তিনি সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন; যে ছবি এখনো যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ও যশোর সেনানিবাসের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
সহযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে খান টিপু সুলতান ছিলেন এম এম কলেজের ছাত্রাবাসে। সে সময় ছাত্র-জনতাকে নিয়ে তারা ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন আরবপুর মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাক সেনাদের গতিরোধ করার জন্য যে বোমা ফাটানো হয়, তার নেতৃত্বে ছিলেন খান টিপু সুলতান। ওই দিন রাত একটার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরে ঢোকে। তারা এম এম কলেজের হোস্টেলে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। সেনারা টিপু সুলতানের বই ও আসবাবপত্র নিয়ে যায়। পরদিন ২৬ মার্চ সকালে সেনাবাহিনী টিপু সুলতানকে ধরিয়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে; মাইকে তা প্রচারও করা হয়। টিপু সুলতান সে সময় শহরের কাজীপাড়ায় মিয়া মতিনের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। সেখানে দুইদিন অবস্থানের পর ২৭ মার্চ চলে যান হাসান শিবলীর বাড়িতে। ৩০ মার্চ খান টিপু সুলতানের নেতৃত্বের যশোর শহরে মুক্তিকামী জনতার মিছিল বের হয়। পরে হানাদার বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নিলে তিনি যশোর শহর ছেড়ে নড়াইলে অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে টিপু সুলতান ভারত চলে যান মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের নিয়ে একটি স্পেশাল অপারেশান গ্রুপ গঠন করে তাদের নিয়ে বিহারের চাকুলিয়াতে সশস্ত্র ট্রেনিং নেন তিনি। ট্রেনিং শেষে ফিরে আসেন দেশে। প্রবাসী সরকার তাকে যশোর এলাকায় স্টুডেন্ট পলিটিক্যাল লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি যশোর রণাঙ্গনে গেরিলা যোদ্ধাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে অগ্রসর করার দায়িত্ব পালন করেন। তার পরামর্শে বিভিন্ন মহকুমা ও থানায় এফ এফ কমান্ডার নিয়োগ দেন সাব-সেক্টর কমান্ডাররা।
দেশ স্বাধীন হলে টিপু সুলতান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন রাজধানীতে যান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাকে যশোরে থেকে রাজনীতি করার নির্দেশ দিলে তিনি ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেন।
কারাভোগ শেষে ১৯৭৭ সালে মুক্তি পেয়ে যশোর জেলা আওয়ামী লীগকে নতুন করে সংগঠিত করতে সচেষ্ট হন টিপু সুলতান। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এরআগে টিপু সুলতান ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর আওয়ামী লীগে আদর্শগত মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি মূল দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পরে তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে প্রায় আট মাস তিনি বাকশালের হয়ে কাজ করেন। পরে আবার আওয়ামী লীগে ফিরে যান এবং জেলা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন টিপু সুলতান।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে যশোর-৫ (মণিরামপুর) থেকে নির্বাচিত হন খান টিপু সুলতান। এ সময় তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় বারের মতো তিনি যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।  পরে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নৌকা প্রতীক নিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী মুফতি ওয়াক্কাসের কাছে হেরে যান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টিপু সুলতান বিজয়ী হয়ে তৃতীয় বারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ ও ১৬ জানুয়ারির ভোটে তিনি নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী স্বপন ভট্টাচার্য্যর কাছে হেরে যান।

শেষ জীবনে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করতেন। তবে ছুটির দিনগুলোতে আসতেন নির্বাচনী এলাকা মণিরামপুরে। বছর দুয়েক আগে তার বিরুদ্ধে পুত্রবধূ ডা. শামারুখ মাহজাবিন হত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে পুলিশ এই হত্যা মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দিলে তিনি রেহাই পান। আগামী নির্বাচনে যশোর-৫ আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বর্ষীয়ান এই নেতা। এ্ই লক্ষে সম্প্রতি তিনি এলাকায় গণযোগাযোগ বাড়িয়ে দেন। নিয়মিত সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ করছিলেন। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাকে রাজধানীর সেন্ট্রাল হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি মারা যান।

আরও পড়ুন