খালেদার রায়ের পর রাজনীতি

আপডেট: 01:48:29 10/02/2018



img

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আদালতে আসা-যাওয়া করেছেন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন ৩৭টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এদের বেশিরভাগই তিনি দুইবার (১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে যে রায় দেয়া হয়েছে তার তাৎপর্য বিশাল।
১৯৯১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার স্বামী জিয়াউর রহমানের স্মৃতিতে গঠিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট থেকে অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন বেগম জিয়া। এই প্রথম কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। শাস্তিস্বরূপ তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য তিনি যদি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তাহলে তার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে তা সত্ত্বেও বর্তমানে তার ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে তা অনিশ্চিত।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধান। অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ (এএল) প্রধান হচ্ছেন শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। তারা দুইজন পূর্বে 'দুই বেগম' নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষে অবস্থানকারী দুই প্রভাবশালী নারী তারা। বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই পালাবদল করে বহু বছর ধরে সরকার গঠন করে আসছে। তবে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড দেশের দুই দলীয় সিস্টেমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙনের সৃষ্টি করেছে। গত দশকজুড়ে ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ছে খালেদা জিয়ার প্রভাব। প্রথমে সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকার ও পরে আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলা দায়ের করে। এসবের মধ্যে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না দেওয়ার জন্য সংবিধানে পরিবর্তন আনলে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। ফলস্বরূপ দলটি হয়ে পড়ে সংসদ সদস্যবিহীন।
বিএনপির এক সময়কার স্লোগান ছিল এমন- ‘খালেদা জিয়া আমাদের নেত্রী। জিয়াউর রহমান আমাদের আদর্শ। তারেক রহমান আমাদের ভবিষ্যৎ।’ কিন্তু বর্তমানে বেগম জিয়ার বয়স ৭২। তিনি অসুস্থ। আর রায়ের কারণে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে লড়ার সুযোগ হারাতে পারেন তিনি। অন্যদিকে, তার ছেলে তারেক রহমান ও দলের উত্তরাধিকারী বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসনে আছেন। তার বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।
সপ্তাহখানেক আগে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার মধ্যে ওই নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে- এমনটা সকলের কল্পনাতীত। ২০১৪ সালে তিনি বেগম জিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখেন। সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে একটি সামরিক হাসপাতালে আটকে রাখেন। বিএনপির মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি আদালত। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে কোনো বিশেষ ধর্মপন্থী দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানে ওই পরিবর্তন নিয়ে আসে আওয়ামী লীগ। তবে এবার সরকার চাইবে যে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক। অন্যথায়, এবারের নির্বাচনও গতবারের মতো হাস্যকর দেখাবে। প্রসঙ্গত, গত নির্বাচনে অর্ধেকেরও কম আসনে প্রতিযোগিতা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনেই আওয়ামী প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেন। নির্বাচন কমিশন বলেছে, একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য বিএনপির অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এমনকি আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থক ভারতও একটি অংশগ্রহণমূলক জনমত জরিপের আহ্বান জানিয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে খালেদা জিয়ার হাতে কোনো উপায় নেই। আইন অনুযায়ী হয়তো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে, নতুবা দলটির নিবন্ধন বাতিল হবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল কিছু প্রলোভন দেখাতে পারে। যেমন, সরকারি চাকরির সুযোগ ও মামলা প্রত্যাহার। ঢাকার বিশেষ এক শ্রেণির ধারণা, বিএনপি বা এর অংশবিশেষ হয়তো সব ভুলে সংসদে একটি মর্যাদাপূর্ণ অংশ চাইবে।
তবে এই মুহূর্তে বিএনপি অনমনীয়। ৩ ফেব্রুয়ারি দলটির শীর্ষ নেতারা নিশ্চিত করেছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে তারা অংশগ্রহণ করবেন না। আর অনেকটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করতেই যেন, সরকার এই সপ্তাহে ১১০০’র বেশি বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেফতার করেছে। বিরোধীদলীয় বিক্ষোভকারীদের শহরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। বিএনপি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই অভিযান ও দণ্ডাদেশ দলের মধ্যে মধ্যপন্থীদের দুর্বল করে তুলছে ও সরকারের বিরুদ্ধে যারা সহিংসতার পক্ষপাতী তাদের উৎসাহিত করে তুলছে।
শেখ হাসিনা এসবে তেমন একটা ভয় পাবেন না। তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগ সামলিয়েছেন। সতর্কভাবে সেনাবাহিনীকে খুশি রেখে চলেছেন। গত দশ বছরে বাহিনীর আকার দ্বিগুণ হয়েছে। নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি নতুন ঘাঁটি। এমতাবস্থায় তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো প্রায় অসম্ভব।
[ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ। মানবজমিন থেকে।]

আরও পড়ুন