খুদেকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর চেক হজম!

আপডেট: 03:19:25 24/04/2019



img

কে এম আনিছুর রহমান, কলারোয়া (সাতক্ষীরা) : কৃতী খুদে ক্রীড়াবিদকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা চেক আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কলারোয়ার এক প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে। তবে তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের আন্তঃপ্রাথমিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড়ে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে কলারোয়া উপজেলার উত্তর সোনাবাড়িয়া গ্রামের আনছার আলীর ছেলে আব্দুল মোমিন (১২)। পরে জাতীয় পর্যায়ে সে তৃতীয় স্থান অধিকার করার কৃতিত্ব দেখায়। এই খুদে ক্রীড়াবিদ সেই সময় কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল। খেলায় মনোযোগী হওয়ায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে বর্তমানেও সে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
গতবছরের প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চলতি বছরের ১৩ মার্চ রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে কলারোয়ার শিশু শিক্ষার্থী মোমিনকে মেডেল, সনদপত্র ও আর্থিক প্রণোদনার চেক তুলে দেন। ওই অনুষ্ঠানে মোমিনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কোমরপুর প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক এসএম শহীদুল ইসলাম। চেক পাওয়ার পরপরই অনুষ্ঠানেই চেকটির উল্টো পিঠে মোমিনের দুটি স্বাক্ষর নিয়ে চেকটি প্রধান শিক্ষক নিজের কাছে রেখে দেন।
অভিযোগ, কলারোয়ায় ফিরে আসার পর চেকটি নেওয়ার জন্য কৃতী খেলোয়াড় মোমিন ও তার পরিবার কয়েকদিন প্রধান শিক্ষক শহীদুল ইসলামের কাছে যায়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক টালবাহানা করতে থাকেন। এমনকি উত্তেজিত হয়ে তিনি (প্রধান শিক্ষক) ও স্কুলটির সভাপতি মুনছুর আলী শিক্ষার্থী মোমিন ও তার অভিভাবককে মারতে উদ্যত হন ও হুমকি-ধামকি দেন।
গত ১৮ এপ্রিল শিক্ষার্থী মোমিন ও তার পরিবার কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরএম সেলিম শাহনেওয়াজকে জানায়। ইউএনও বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোজাফফার উদ্দীনকে দায়িত্ব দেন। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোজাফফার উদ্দীন উভয়পক্ষকে আপস-মীমাংসা করে নেওয়ার জন্য বলেন।
এরপর গত ২৩ এপ্রিল মঙ্গলবার সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে চেকটি ফেরত পেতে এবং দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কামনা করে লিখিত অভিযোগ দেয় ক্রীড়াবিদের পরিবার।
মোমিনের বাবা আনছার আলী বলেন, ‘স্কুলের প্রধান শিক্ষক শহীদুল ইসলাম ও স্কুলের সভাপতি মুনছুর আলী আমার ছেলের চেকের টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। আমি গত ১৮ এপ্রিল কলারোয়ার ইউএনও-কে বিষয়টি লিখিতভাবে অবগত করেছি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমাকে ডেকে বিষয়টি গোপনে মীমাংসা করে নেওয়ার জন্য বলেন। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি এ ঘটনার বিচার চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কত টাকার চেক দিয়েছেন তাও আমার ছেলেকে দেখানো হয়নি বিধায় আমি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সেই চেকটি দেখতে চাই।’
তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া চেকের পাশাপাশি এর আগে একইভাবে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়া আরো ১৫ হাজার টাকা প্রধান শিক্ষক নিয়ে নেন। এবং আমার ছেলেকে বলেন, ‘স্কুলে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব টাকা ও সার্টিফিকেট তোমার হাতে তুলে দেওয়া হবে।’ কিন্তু আজো তা দেওয়া হয়নি। গত ১৫ এপ্রিল আমি স্কুলে গিয়ে এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে আমাকে মারতে যান। এসময় তিনি ও স্কুলের সভাপতি মুনছুর আলী আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোমার ছেলেকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে। বিষয়টি লোক জানাজানি হলে তোমার ছেলের আরো ক্ষতি হবে।’’
স্কুলটির অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক শহীদুল ইসলাম দাবি করছেন, মোমিনকে জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করায় প্রধানমন্ত্রী মোমিনকে দশ হাজার টাকার চেক দেন।
‘মোমিনের বাবা আনছার আলী চেকটি ভাঙিয়ে টাকা তুলে আনতে বলেছিলেন। আমি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তার কাছে দিয়েছি। মোমিন প্রতিযোগিতার জন্য সাতক্ষীরা, খুলনা, ঢাকা যাওয়া-আসার কোনো খরচ আমাকে দেয়নি। সব খরচ আমি বহন করেছি। আমি খরচের টাকা চেয়েছি বলে তারা আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করছেন,’ বলেন প্রধান শিক্ষক।
তবে চেকটি কবে ও কোন ব্যাংক থেকে ভাঙিয়েছেন জিজ্ঞাসা করলে প্রধান শিক্ষক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এটা আপনার জানার দরকার নেই।’
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি। গতকাল (২৩ এপ্রিল) সকালে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যথাযথ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কলারোয়ার ইউএনও আরএম সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘বুধবার (২৪ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে এর আগে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমাকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।’