খুলনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা টাকার কুমির

আপডেট: 02:54:56 06/12/2018



img

জিয়াউস সাদাত, খুলনা : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত ছয় প্রার্থীর চারজনই সংসদ সদস্য হিসেবে এই প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নতুন তিন প্রার্থীর মধ্যে দু’জন ‘হেভিওয়েট’।
ছয়টি আসনের সব প্রার্থীই নির্বাচন কমিশনে তাদের হলফনামা দাখিল করেছেন। হলফনামায় প্রার্থীরা তাদের ধন-সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন। দিয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণও।
দেখা যায়, হেভিওয়েট দুইজনসহ তিন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক। বাকি তিন প্রার্থী উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাশ। পেশায় তিনি কৃষিকাজ করেন। কৃষিকাজ থেকে তার বার্ষিক আয় ৭০ হাজার টাকা, বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে আয় পাঁচ লাখ ১২ হাজার টাকা। বেতন ও সম্মানী থেকে আয় ছয় লাখ ৬০ হাজার; অন্যান্য উৎস থেকে আয় এক লাখ ৪১ হাজার টাকা। নগদ আছে ৩৩ লাখ টাকা। আছে কয়েকটি যানবাহন যার মূল্য ৫০ লাখ টাকা, স্বর্ণ আছে ৭ লাখ টাকার, আসবাবপত্র আছে সাত লাখ ও ইলেকট্রনিক্স আছে সাত লাখ টাকার। খুলনা ও রাজধানীতে দুটি বাড়িও আছে তার।
সদর ও সোনাডাঙ্গা থানা নিয়ে গঠিত খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুষ্পুত্র ও ব্যবসায়ী শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। ‘মেসার্স আজমীর নেভিগেশন’ ও ‘মেসার্স ফারদিন ফিস’ নামে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে তার। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় এক কোটি নয় লাখ পাঁচ হাজার ৪০৪ টাকা। শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানত থেকে আয় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। ব্যাংক মুনাফা থেকে আয় ২৬ লাখ ৭০ হাজার এক টাকা। বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান ভাড়া থেকে বার্ষিক আয় তিন লাখ ৯০ হাজার টাকা। মিটিং ফিস থেকে আয় ৬৪ হাজার টাকা। তার মোট বার্ষিক আয় তিন কোটি ২০ লাখ ২৯ হাজার ৪০৫ টাকা। তার ওপর নির্ভরশীলদের বাড়ি ভাড়া, ডিভিডেন্ড, ব্যাংক মুনাফা ও অন্যান্য খাতে বার্ষিক আয় দুই কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ৯০৯ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তার নগদ অর্থ আছে আট কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮ টাকা। তার স্ত্রীর আছে চার কোটি ৫০ লাখ ২৮ হাজার ১১৩ টাকা। তার ওপর নির্ভরশীলদের এক লাখ তিন হাজার ৬৬৭ টাকা রয়েছে। তার নিজের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে দুই কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৩ টাকা। আর স্ত্রীর নামে ব্যাংক হিসাবে জমা আছে দুই কোটি ২৫ লাখ পাঁচ হাজার ৮১৫ টাকা। তিনটি কোম্পানিতে তার শেয়ার আছে, যার মূল্যমান ১৮ কোটি ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর শেয়ার আছে ২০ কোটি টাকার। পোস্টাল, সেভিংস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে তার বিনিয়োগ আছে চার কোটি ২৭ লাখ এক হাজার ৩৮২ টাকা; তার স্ত্রীর আছে দুই কোটি ৮৫ লাখ ছয় হাজার ৬৮৩ টাকা। এছাড়া তার স্ত্রীর বাস, ট্রাক, মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল ইত্যাদির মূল্য এক কোটি সাত লাখ ৪০ হাজার টাকা, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আছে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার। আসবাবপত্র আছে চার লাখ ৫০ হাজার টাকার, স্বর্ণ আছে তিন লাখ টাকার। অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ আছে ৩০ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮০ টাকা।
শেখ জুয়েলের স্থাবর সম্পদ আছে এক কোটি ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের অকৃষি জমি। নিজস্ব বাড়ি আছে এক কোটি পাঁচ লাখ ৪২ হাজার টাকা মূল্যের। তার স্ত্রীর আছে ৩১ লাখ ১৭ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষি জমি এবং এক কোটি ৩৯ লাখ ছয় হাজার ৬৩৫ টাকা মূল্যের দালান। বেসিক ব্যাংকে শেখ জুয়েলের দায় আছে ২৯ কোটি ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬২ টাকা।
খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা নিয়ে গঠিত খুলনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ (সম্মান)। বার্ষিক বাড়ি ভাড়া থেকে তার আয় এক লাখ, মাছ চাষ করে তার আয় এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে আয় ২৪ হাজার টাকা, বেতন থেকে আয় সাত লাখ ২৫ হাজার টাকা। অন্যান্য ভাতা থেকে আয় ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা। নগদ আছে ৫১ লাখ টাকা। তার বিভিন্ন যানবাহ আছে, যার মূল্য ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। স্বর্ণ আছে ৪০ তোলা। দৌলতপুরে তিন কাঠা জমি, রাজউকে পাঁচ কাঠা, রেলগেটে আট শতক ও বিল ডাকাতিয়ায় ৪৯ শতক জমি আছে; যার দাম ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে মহেশ্বরপাশায় সাড়ে ১১ শতক জমির ওপর একটি তিনতলা বাড়ি আছে বলে মন্নুজান উল্লেখ করলেও তার মূল্য হলফনামায় দেওয়া হয়নি। ফ্রিজ, টিভি, খাটসহ আসবাবপত্র উপহার পেয়েছেন বলে হলফনামায় দেখানো হয়েছে। মন্নুজান সুফিয়ানের ঋণ আছে সাত লাখ টাকা। তিনি গত দুই সংসদ নির্বাচনে টানা এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৪ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন সাবেক ফুটবলার ও বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। মুর্শেদীর বার্ষিক আয় ছয় কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বাড়ি ভাড়া থেকে আয় ১৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন থেকে আয় দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা। শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক থেকে আয় তিন কোটি ৫৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি আছে ৮৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার। নগদ অর্থ আছে চার কোটি ২৭ লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ৪৫ লাখ টাকা, বন্ড-সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার আছে ৭১ কোটি টাকার। স্বর্ণ আছে সাড়ে চার লাখ টাকার। ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আছে সাড়ে সাত লাখ টাকার, আসবাবপত্র আছে নয় লাখ ৮০ হাজার টাকার। অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি আছে সাত কোটি ৫৫ লাখ টাকার। স্থাবর সম্পদ আছে ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার। গুলশানে ১৫ কাঠা জমি, খিলগাঁওয়ে একটি ৯০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, গুলশানে দুটি ফ্ল্যাটসহ দালানকোঠাও রয়েছে। মুর্শেদীর দায় আছে ছয় কোটি ৭৪ লাখ টাকার। তিনি প্রাইভেট/পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বস্ত্রশিল্প, ব্যাংক ও হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য নারায়ণচন্দ্র চন্দ। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ পাস। পেশা হিসেবে তিনি কৃষিকাজ, ইটভাটা ব্যবসা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্ব দেখিয়েছেন। তার বার্ষিক আয় ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। যার ভেতরে কৃষিকাজ থেকে আয়  ৮০ হাজার ৫০০ টাকা, ইটভাটা থেকে আয় আট লাখ ৬৩ হাজার টাকা। মন্ত্রীর বেতন ও অন্যান্য ভাতা থেকে আয় ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা। তার ব্যাংক ঋণ রয়েছে এক কোটি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি আছে, নগদ অর্থ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ৫৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আছে ৬০ হাজার টাকার। দুটি পুরনো জিপ গাড়ি ও একটি মোটরবাইক আছে। তার স্ত্রীর ১৫ ভরি স্বর্ণ উপহার হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থাবর সম্পদ আছে দুই খণ্ড জমি; যার মূল্য ছয় লাখ ২৪ হাজার টাকা। তার একটি বিল্ডিং ও একটি টিনশেড সেমিপাকা বাড়ি আছে। তার ব্যাংক ঋণ ৮৩ লাখ ও ব্যক্তিগত ঋণ ৩৫ লাখ টাকা।
কয়রা-পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান। হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পাস। তিনি ঠিকাদার ও কৃষিকাজে যুক্ত। তার বার্ষিক আয় ৬৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যার ভেতরে কৃষিকাজ থেকে আয় ৩২ হাজার টাকা ও ঠিকাদারি ব্যবসা থেকে আয় ৬৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি নগদ অর্থ আছে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা আছে চার লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ইলেকট্রনিক্স  সামগ্রী আছে এক লাখ টাকার, আসবাবপত্র ১ লাখ টাকার ও ৩০ তোলা স্বর্ণ উপহার পাওয়া। স্থাবর সম্পদ কৃষিজমির আর্থিক মূল্য দশ লাখ ৮০ হাজার টাকা । তার ব্যাংক ঋণ এক কোটি টাকা।

আরও পড়ুন