খেজুর তুলসি কিম্বা বোধিবৃক্ষের দোহাই

আপডেট: 02:23:28 21/01/2018



img

আহসান কবির

প্রায় দুই যুগ আগের কথা। কলেজের ছুটিতে এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে দেখেছিলাম, গ্রামের মেঠোপথ ধরে ছোট ছোট বাচ্চারা হই হই করে ছুটে যাচ্ছে। কী হয়েছে, জানতে চাইলে বন্ধুটি একটি গাছের দিকে ইশারা করলো। দেখলাম বিশাল এক বট গাছ। নিজেকে আড়াল করে এক লোক গাছের ওপর থেকে হিসি করছে। আমি জানতে চাইলাম, পাগল নাকি? বন্ধু জানালো— ‘না। পাগলদের ইজ্জতের ভয় থাকার কথা না। এই লোকের আছে তাই এলাকায় তারে সবাই গাছবলদ বলে ডাকে!’
বলদ গাছে না ধরলেও দেশে ‘গাছবলদ’দের সংখ্যা বাড়লে ভালো হতো। এরা গাছ নিয়েই থাকত। প্রয়োজনে গাছেই থাকত, খেতো আর ঘুমাত। পেট ভরা থাকলে গাছে বসেই কবিতা লিখত। ইদানীং অবশ্য দেশে গাছখেকোদের সংখ্যা বাড়ছে। তাই গাছ নিয়ে দেশের ভেতর হই চই হচ্ছে। গাছ কিন্তু মানব সভ্যতার সমান বয়সী। উঁচু গাছের ডালপালা ছিল পাখির; ফল, গাছের কাণ্ড আর ছায়া যেন ছিল মানুষের। যদিও গাছভর্তি জঙ্গল ছিল একান্তই পশু-পাখির। মানুষ তার প্রয়োজনে কিংবা লোভে এইসব সাবাড় করেছে, করছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো করবে!
অথচ মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী হলো গাছ। হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে গাছের উপকারিতা নিয়ে। কিছু গাছ আছে বন-বাদাড় আর রাস্তার জন্য, আর কিছু আছে গৃহপালিত। গৃহপালিত পাঁচটি গাছ আছে যেগুলো বাসায় থাকলে মানুষ ভালো থাকে। এইসব গাছ থাকলে বাসার সৌন্দর্য বাড়ে, অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক থাকে, বাসার মানুষদের ঘুম ভালো হয়!
অ্যালোভেরা এমন একটি গাছ। জ্বালাপোড়া সারায়, অক্সিজেন বিশুদ্ধ করে, মানবদেহকেও নাকি পরিশুদ্ধ করে ছাড়ে! আইভি বলেও একটা গাছ আছে। নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব, সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনায় আইভী নামের গাছটাও আলোচনায় চলে এসেছে। গাছটার নাম অবশ্য ইংরেজি আইভি। সূর্যের আলো ছাড়াই এই গাছ দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে (মেয়র আইভীর মতোই অনেকটা। দলের সাহায্য ছাড়াও মানুষটা জিতে আসতে পারেন। তার নাম দেওয়া যেতে পারে বাংলা আইভী। শামীম ওসমানের নামে অবশ্য কোনও গাছ নেই। রাক্ষসী কিংবা মানুষখেকো গাছের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে নাকি এর কোনও অস্তিত্ব নেই)। ফরমালডিহাইড শোষণে আইভী গাছের তুলনা নেই।
এমন আরেকটা গাছের নাম জেসমিন। এই নামে পারফিউমও আছে, আছে মেয়েদের নাম। জেসমিন গাছ ঘরে থাকলে সৌন্দর্য বাড়ে। জেসমিন নামের মেয়েরা ঘরে থাকলে কী ঘটে তা জানা না গেলেও জেসমিন গাছ মানুষের উদ্বেগ দূর করে, ঘুমে প্রশান্তি আনে। ল্যাভেন্ডার নামের গাছটার সুগন্ধি মানুষকে মোহিত করে। শরীরের সৌন্দর্য বাড়াতে ল্যাভেন্ডারের তুলনা নেই। উদ্বেগ অবসাদ দূর করে ল্যাভেন্ডার। আলমারি কিংবা ড্রয়ারে কাপড়-চোপড় যেন ভালো ও সুগন্ধিময় থাকে সেজন্য ল্যাভেন্ডারের পাতা ব্যবহৃত হয়। মশা তাড়ানোর কাজেও ব্যবহৃত হয় ল্যাভেন্ডার। ল্যাভেন্ডারের তেল হাত ও পায়ের অনাবৃত অংশে মাখলে সেখানে মশা কামড়ায় না। শুধু বাসায় খরগোশ থাকলে অসুবিধে। খরগোশরা কী কারণে যেন ল্যাভেন্ডারের ঘ্রাণ সহ্য করতে পারে না। আর আছে সাপ গাছ। এরা অক্সিজেন বিশুদ্ধ করে মানুষকে ঘুমাতে সাহায্য করে। নামে সাপ হলেও এদের কোনও বিষ বা বিপরীত প্রতিক্রিয়া নেই। সাপ গাছ বলার কারণ এই গাছের ইংরেজি নাম স্নেক প্ল্যান্ট!
এছাড়াও কিছু গাছ আছে যেগুলোকে মানুষ রীতিমতো সমীহ করে চলে। যেমন— তুলসি গাছ। এই গাছ মশা-মাছি কিংবা ছারপোকা তাড়াতে সাহায্য করে। আগে এই বাংলার মানুষদের বাড়িঘরে অন্তত একটা করে তুলসি গাছ লাগানো হতো। তুলসি স্প্রে করলেও মশা-মাছির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। লেমন গাছের পাতা খাবার সুগন্ধি করার কাজে ব্যবহৃত হয়। লেমনের মতো রোজমেরি গাছের পাতাও ব্যবহৃত হয় খাবার সুগন্ধির কাজে এবং মশা দূর করতে। এমন আরেকটি গাছের নাম পুদিনা। পুদিনার উপকার অনেক। তবে একবার রোপণ করলে জন্মাতেই থাকে, ছাড়পোকার মতো পুদিনা জন্মে নাকি খুব দ্রুত! সম্ভবত গাছের এত উপকারিতার কারণেই তাকে ধর্মের নামে বিভাজিত করা হয়েছে। তুলসি গাছ নাকি হিন্দুদের, বোধিবৃক্ষ নাকি বৌদ্ধদের। খ্রিস্টানরা ভালোবাসে ক্রিসমাস ট্রি আর মুসলমানদের ভালোবাসা নাকি খেজুর গাছের প্রতি!
যে মানুষ বৃক্ষকেও বিভাজিত করে সেই মানুষই আবার বৃক্ষনিধন করে। স্বার্থের কারণেই তারা গাছখেকো হয়। মানুষের স্মৃতি থেকে প্রিয় জায়গার স্মৃতি যে হারিয়ে যায়, তার বড় একটা কারণ গাছ। গাছহীন জায়গার স্মৃতি নাকি মানুষ নিজেই মুছে ফেলে।
বাংলাদেশের প্রধান তিন পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে নিরাপত্তার নামে বৃক্ষনিধন করা হয়েছিল। পাহাড়ের লতা, গুল্ম আর ছোট গাছগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই তিন পার্বত্য জেলায় গাছহীন যে পাহাড়গুলো আজও টিকে আছে, পাহাড়ধসের মাত্রা সেখানে বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতি মানুষের কাছ থেকেই নাকি বিরূপ হতে শিখেছে, প্রতিশোধ নিতে শিখেছে! প্রকৃতির মতো যে পাখিদের জীবনযাপনের প্রধান অবলম্বন বৃক্ষ, বৃক্ষ নিধন হলে তারা নীরব প্রতিবাদ জানায়। তাদের প্রতিবাদ হচ্ছে যে এলাকায় তাদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে, সেখান থেকে চলে আসা। মানুষ পাখির মতো নয়। মানুষ তার এলাকা ছেড়ে সহসা চলে আসতে চায় না। দূরে গেলেও তারা ফিরে আসতে চায় তাদের স্মৃতিমাখা জায়গাতে। পাখিদের অভিমান কি মানুষের চেয়ে তীব্র হয়?
ব্রিটিশরা এ দেশে ঘটা করে গাছ লাগিয়েছিল। আবার সেই গাছে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে মেরেছিল ১৮৫৭ সালে যারা সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল তাদের অনেককে। ব্রিটিশদের লাগানো গাছের সঙ্গে এ দেশীয় নবাব জমিদাররাও অংশ নিয়েছিল।
যশোর রোডের যে গাছগুলো নিয়ে এত আলোচনা, ধারণা করা হয় সেগুলো জনসেবার অংশ হিসেবে লাগিয়েছিলেন যশোরের সেই সময়কার জমিদার কালী পোদ্দার। তার সময়কাল হিসাবে করলে এই গাছগুলো বেঁচে আছে ১৮০ থেকে ২৫০ বছর ধরে। যশোরের দড়াটানা রোড থেকে বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত যশোর রোডের দৈর্ঘ্য ৩৮ কিলোমিটার। ভারতীয় অংশেও পেট্রাপোল থেকে কালীঘাট পর্যন্ত যশোর রোড রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যশোর রোডের স্মৃতি। ১৯৭১-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বৃষ্টিতে বন্যার মতো হয়ে গিয়েছিল। যশোর রোড ছাড়া আশপাশের সবকিছু ছিল পানির নিচে। আজ যেমন রোহিঙ্গারা আসছে এ দেশে, ১৯৭১ সালে প্রায় ৯৯ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে গিয়েছিল ভারতে, এই যশোর রোডের গাছগুলোকে সাক্ষী রেখে। ওই সময় যেসব মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ সহ্য করে, ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে ভারতে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই চলে গেছে পরপারে; গাছগুলো বুকভরা বেদনা নিয়েই বেঁচে ছিল।
মানুষ তার কুড়ালের নিচে নিয়ে আসতে চায় যশোর রোডের এই দ্বিশতবর্ষী মেঘ ও গগন শিরীষ, রেইনট্রি কিংবা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোকে। বিট জেনারেশনের কবিদের গুরুখ্যাত অ্যালেন গিন্সবার্গ তার ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতায় মানুষের এই বেদনার কথা তুলে ধরেছিলেন। তারপর এটা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। জন লেনন ও বব ডিলানদের চোখে জল এসেছিল এই কবিতা পড়ে, গিন্সবার্গই সুর দিয়েছিলেন, কনসার্টে সেটা গাওয়া হয়েছিল। পশ্চিম বাংলার গায়িকা মৌসুমী ভৌমিক গানটি বাংলাতে গেয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যত সমালোচনা করে, তার ভেতরে গাছও রয়েছে। বলা হয়, তিনি আয়োজন করে গাছ কেটেছিলেন। যেখানে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, সেই জায়গায় গাছ কেটে পার্ক বানিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানের পরাজয়ের কোনও অস্তিত্ব তিনি নাকি রাখতে চাননি। আজ যেটা কাওরান বাজারের কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, সেখানেও ছিল সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেসব গাছও কাটা হয়েছিল জিয়াউর রহমান সাহেবের আমলে। আর আওয়ামী লীগ আমলেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত যশোর রোডের শতবর্ষী গাছ কাটার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। যদিও ছয় মাসের জন্য হাইকোর্ট এটা স্থগিত করেছে।
লেখার শুরুটা করেছিলাম ‘গাছবলদ’ দিয়ে। গাছবলদের সংখ্যা বাড়ুক, ক্ষতি নেই। গাছখেকোদের যেন আমরা শনাক্ত করতে পারি, তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, তাদের শাস্তি যেন স্থগিত না হয়! খেজুর, বোধি, তুলসি কিংবা ক্রিসমাস গাছরা যেন অভিশাপ দেয়। তাদের অভিশাপে যেন গাছখেকোরা নিপাত যায়!
[লেখক : মিডিয়াকর্মী, অভিনেতা, রম্যলেখক। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]