খোঁজ নিয়ে জানা গেল শিক্ষা অফিসার জেলে

আপডেট: 03:12:01 02/05/2019



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়া শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ সেখানে বসেই আবারো দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন।
কারাগারে গেলেও তিনি সেই তথ্য গোপন করে চিকিৎসার কথা বলে ছুটি চেয়েছেন। নয় দিনের নৈমিত্তিক ছুটির পর আবারো চিকিৎসার জন্য তিন সপ্তাহের ছুটি চেয়েছেন ওই কর্মকর্তা। এই ক্ষেত্রে কর্মকর্তা তার চিকিৎসক ভাই ডাক্তার এন কে আলমের একটি মেডিকেল সনদ দাখিল করেছেন।
অবশ্য ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এই আবেদনটি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও আবেদনপত্রে ওই কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেই বলে জানিয়েছেন। হাতের লেখা আবেদনটির নিচে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদের নাম ও পদবি লেখা আছে। ৭ এপ্রিল তিনি নৈমিত্তিক আর ১৬ তারিখে চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়ে আবেদন দুটি করেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ মুশতাক আহমেদ যোগদান করেন। গত ৮ এপ্রিল থেকে তিনি কার্যালয়ে অনুপস্থিত আছেন। প্রথম দিকে তিনি ‘নৈমিত্তিক ছুটিতে আছেন’ বলে ওই অফিসের অন্যরা অবহিত ছিলেন। নয় দিনের ছুটি শেষে ১৭ এপ্রিল থেকে তার কার্যালয়ে যোগদান করার কথা। কিন্তু তিনি যোগদান না করে ১৬ এপ্রিল চিকিৎসার জন্য তিন সপ্তাহের ছুটি চেয়ে আরেকটি আবেদন পাঠান। যে আবেদনে তার নাম থাকলেও স্বাক্ষর বা সিল দেওয়া নেই। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এতে সংশ্লিষ্ট অফিসের অন্যরা বিচলিত হয়ে পড়েন। তারা খোঁজাখুঁজি করে কোথায় চিকিৎসাধীন সেটাও উদ্ধার করতে পারেননি। এই অবস্থায় কেটে গেছে প্রায় তিন সপ্তাহ।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ দুর্নীতির একটি মামলায় হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।
আদালতের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের দায়রা মামলা নম্বর ৯/১৯ ও ১০/১৯-এর আসামি হিসেবে তিনি হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। বিচারক একেএম ইমরুল কায়েস জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
মামলা দুটি বিশেষ জজ আদালত-৪ এর আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলা দায়ের হয় ঢাকার শাহবাগ থানায় বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক জুলফিকার আলী শিক্ষা কর্মকর্তার কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, মামলার মুশতাক আহমেদের নামে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর তিনি জামিনের জন্য এসেছিলেন। তারপর আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। অথচ তিনি চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছেন। 
মামলার উৎপত্তি সম্পর্কে মাগুরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কুমারেশচন্দ্র গাছি জানান, মুশতাক আহমেদ মহম্মদপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় একটি দুর্নীতির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই সময়ে বেসরকারি পাঁচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদায়নে যোগ্যতার সমস্যা দেখা দেয়। যোগ্যতা না থাকায় তৎকালীন জেলা শিক্ষা অফিসার পদায়নের ক্ষেত্রে তাদের নাম অধিদপ্তরে পাঠাননি। পরে ওই সব শিক্ষকের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেতন ছাড় হয়। এ বিষয়টি খোঁজ নিয়ে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ওই শিক্ষকরা একাধিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে অধিদপ্তর থেকে তাদের বেতন ছাড় করিয়েছেন। এই বেতন ছাড়ের সময়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. আমানুল্লাহ। পরে তার স্থলে বদলি হয়ে আসেন মো. আব্দুস সালাম। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস তখন তদন্ত করে এবং বিষয়টি ধরা পড়ে। শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এদিকে বিষয়টি চলে যায় দুর্নীতি দমন কমিশনে। আর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে মহম্মদপুরে যোগদান করেন মুশতাক আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় যশোরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. ওয়াজেদ আলী গাজী বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত হলেও মুশতাক আহমদ শিক্ষকদের বেতন করানোর বিষয়ে দাখিল করা সব কাগজপত্র সঠিক আছে বলে লিখিত প্রতিবেদন দেন। পরে দুদক ঘটনাগুলো তদন্ত করে মামলা করে। যে মামলায় ওই শিক্ষকদের সঙ্গে মুশতাক আহমদকেও আসামি করা হয়। মামলায় ইতিমধ্যে চার্জশিট দাখিল হয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার অপর এক আসামি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মঙ্গলহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই সময়ে কর্মরত প্রধান শিক্ষক মফিজুল ইসলাম জানান, তাদের সব কাগজপত্র ঠিক ছিল। তাদের যোগ্যতাও ছিল। কিন্তু সব জায়গায় টাকা দিতে না পারায় তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। পরে তারা এক শিক্ষকনেতাকে দিয়ে বেতন করিয়েছেন। ওই নেতা কীভাবে এই কাজ করেছেন, তা জানা নেই বলে দাবি প্রধান শিক্ষক মফিজুলের। স্বাক্ষর স্ক্যান করে তা ব্যবহারের বিষয়েও তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন বলে জানান।
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা অফিসার শেখ মো. আকতারুজ্জামান জানান, শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ নয় দিনের নৈমিত্তিক ছুটির পর চিকিৎসার জন্য একটি দরখাস্ত দিয়েছেন। যেখানে একটি মেডিকেল সনদও রয়েছে। এছাড়া তিনি শুনেছেন, ওই কর্মকর্তা কারাগারে আছেন। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ আছে বলে জানান শিক্ষা অফিসার আকতারুজ্জামান।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রামনাথপুর গ্রামের মাস্টার দীন মোহাম্মদের ছোট ছেলে মুশতাক আহমেদ ২০০৫ সালে ১০ জানুয়ারি চাকরিতে যোগদান করেন। সাতক্ষীরা সদর ও ঝিনাইদহের কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

আরও পড়ুন