গরু জবাই দুধ বিক্রি ‘নিষেধ’ যে গ্রামে

আপডেট: 09:01:31 29/08/2018



img
img

জহর দফাদার : ভগবতীতলা। যশোর সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের ভৈরব নদের কোল ঘেঁষে সবুজ-শ্যামল ছায়াঢাকা শান্ত গ্রাম। এখানকার মানুষ বংশপরম্পরায় যে নিয়মটি মেনে চলে আসছে, তা হচ্ছে গরুর দুধ বিক্রি কিংবা গ্রামের ভেতরে গরু জবাই না করা।
চৌদ্দ পুরুষের এই সংস্কার ভেঙে দিয়েছেন কোরবান আলী (৪০)। প্রতিদিনই শহরে এসে দুধ বিক্রি করছেন তিনি। আয়ও হচ্ছে বেশ।
অবশ্য এই দুধ বিক্রি করাটা তার জন্যে একটা সুখের ছিল না বছর ছয় আগেও। বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে সংগ্রামের পথে হেঁটেছেন তিনি। আজ তাই একজন সফল খামারি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত কোরবান আলী।
ভগবতীতলাবাসী গরু জবাই করেন না। ব্যতিক্রম শুধু কুরবানি ঈদ। তার মানে এই না যে, তারা মাংস খান না। এই গ্রামের পাশের নিমতলী, মুনসেফপুর, রায়মানিক বা দাইতলা থেকে গরু জবাই করে ভ্যানে কিংবা সাইকেলে মাংস এনে চাহিদা মেটান।
গরুর দুধ বিক্রি বা গরু জবাই কেনো করা হয় না?- এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর কারো কাছেই পরিষ্কার না। গ্রামের প্রবীণ কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় একটি কাহিনি। তবে, এর সত্যতা সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন।
ভগবতীতলা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন অশীতিপর গহর আলী মোল্যা ও আছর আলী মোল্যা (৭২)। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত হন মাহবুবুর রহমান (৪০) ও ওবায়দুর রহমান (৪২)।
গহর আলী মোল্যা বলেন, ‘‘বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, বহু বছর আগে এক ব্যক্তি আমাদের গ্রামে আসেন দুধের সন্ধানে। আশপাশের গ্রামে দুধ না পেয়ে তিনি এই গ্রামে এসে গাভীর দুধ পান। তিনি গ্রামবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা খুব ভাগ্যবান; কখনো দুধ বিক্রি করো না। বিনে পয়সায় কেউ চাইলে দিও, আর গরু জবাই করো না। দেখবে তোমরা তাতে ভালো থাকবে।’’
এই ঘটনার পর থেকে গ্রামের কেউই আর দুধ বিক্রি করতেন না; গরুও জবাই করতেন না।
আছর আলী বলেন, ‘খুব ছোটবেলায় দেখেছি- কুটুমরা এলে তাদের দুধের নানা ধরনের পিঠা খাওয়ানো হতো। যাওয়ার সময় তাদের ভাঁড়ে করে দুধও দিয়ে দিতেন গৃহস্থরা। কিন্তু কখনো শুনিনি কেউ বিক্রি করেছে। আর কুরবানির ঈদ ছাড়া গরু জবাইও করতে দেখিনি আজ পর্যন্ত।’
তার দাবি, ১০-১২ বছর আগে মোজের মোল্যার মা নামে এক বৃদ্ধা গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে ঘি বানিয়ে তা বিক্রি করেন। এরপর তার গরুটি মারা যায়।
বছর তিন আগে আব্দুল্লাহর ছেলে সদর আলী তার গরুর দুধ বিক্রি করায় গাইগরুটি মারা যায়।
ওবায়দুর রহমান বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে শীতকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ট্রেনিং করতে আসে। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে একজন মেজর গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করে একটি গরু জবাই করার কথা বলেন। গণ্যমান্যরা তাকে নিষেধ করলেও তিনি তা মানেননি। কথিত আছে, ওইরাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে কী হয়েছে তা জানিনে।’
এমন আরো কিছু লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে গ্রামে। তারা জানান, এই গ্রামের একজন মৌলভি, যার নাম মোহাম্মদ, এই প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গরু জবাই করেন এবং তিনি রোগে ভুগে মারা যান।
গল্পগুলোর সার সংক্ষেপ হচ্ছে- কেউ দুধ বিক্রি করলে গাভী মারা যায় আর গরু জবাই করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মারা যান! এই ভয়ে কেউই সাধারণত আর দুধ বিক্রি কিংবা গরু জবাই করতে চান না।
এই সংস্কারের বিপরীতে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন গ্রামের পশ্চিপাড়ার গোলাম রসুলের ছেলে কোরবান আলী। ২০১২ সালে তিনি একটি ফ্রিজিয়ান বাছুর কেনেন ১৪ হাজার টাকা দিয়ে। পরের বছর থেকে ১২ থেকে ১৪ কেজি দুধ প্রতিদিন বিক্রি শুরু করেন। তার ভাষায়, ‘দুধ বিক্রি করার পর এক ঈদের দিন ঈদগাহে স্থানীয় গণ্যমান্যরা আমাকে ব্যাপকভাবে তিরস্কার করেন। তারা দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে দেন, আমাদের চৌদ্দপুরুষ যে নিয়মনীতি মেনে আসছে, তার ব্যত্যয় হতে তারা দেবেন না।’
‘আমার বাড়ি থেকে যে গোয়ালা দুধ নিতে আসতো, একদিন তাকে মারপিটও করা হয়। ভয়ে তিনি আর আসতে চাননি। কিন্তু পাশের গ্রাম বিধায় আমি তাকে পরামর্শ দেই, নদী সাঁতরে লোকচক্ষুর আড়ালে যেন সে আসে এবং দুধ নিয়ে যায়। এভাবেই আমার দুধের ব্যবসা শুরু।’
ছয় বছর আগে মাত্র ১৪ হাজার টাকা দিয়ে গরু পোষার কাজ শুরু করলেও আজ তিনি পাঁচটি গরুর মালিক। ইতিমধ্যে দুটি ষাঁড় বিক্রি করে পেয়েছেন দেড় লাখ টাকা। এখনো প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দামের গরু রয়েছে তার গোয়ালে।
দুধ বিক্রি করায় এ পর্যন্ত তার কোনো গরু মরেনি; কিংবা তারও কোনো ক্ষতিও হয়নি।
প্রতিবেশী সদরের গরুটা কেনো মরেছিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাছুর হওয়ার পর গরুটি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু  সে গরুর চিকিৎসা করায়নি। এতে গরুটি মরে যায়; এরসাথে দুধ বিক্রির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা না।’
কথা হয় গ্রামের মসজিদের ইমাম সাব্বির আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর দুনিয়ায় এই গ্রামের জন্যে আলাদা কোনো বিধান নেই। বছর তিনেক আগে একটি অসুস্থ গরু গোয়াল ঘরেই জবাই করেছিলাম। এই ঘটনায় গ্রামের মুরুব্বিরা আমাকে ভর্ৎসনা করেছিলেন।’
জানতে চাইলে দাইতলা হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক সফর আলী বলেন, ‘বছর ১৫ আগে এক মৌলভি প্রথা ভেঙে গরু জবাই করেছিলেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। এটি আমাদের প্রথা। তবে, ইদানীং কয়েকজন দুধ বিক্রি করছেন বলে শুনেছি।’
কচুয়া ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও এই গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমরা বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছি। আসলে এই ঘটনার সত্যতা আমিও জানিনে। কবে কার কাছে কে দুধ চেয়েছিল, কাকে বলেছিল দুধ বিক্রি করা যাবে না বা গরু জবাই করা নিষেধ- তা কেউই জানে না। শুধু বিশ্বাসের ওপর যুগের পর যুগ এই প্রথা চলে আসছে।’
কারো প্রয়োজন হলে সে দুধ বিক্রি করতেই পারে; তাকে নিষেধ করার কিছুই নেই, মত দেন মেম্বার।
এসব বিষয়ে কথা হয় গবেষক বেনজীন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতিগতভাবেই অনেককিছু ঘটে। হয়তো দুধ বিক্রি করার পর স্বাভাবিকভাবেই গরুটি মারা যেত কিংবা এজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন- এই বিষয়টিকে মানুষ অতিপ্রাকৃত ভাবতে পছন্দ ও প্রচার করে। আর এ ঘটনার পর অনেকে ভয় পেয়ে যেতেও পারেন। মানুষের ভেতরে কিছু দুর্বলতা কিন্তু থাকে। এতকিছুর পর যে দুধ বিক্রি করেও একজন মানুষ সুস্থ সবল আছেন, সচ্ছল হয়েছেন- এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তারা যা ভাবছে, সেটি আসলে ভুল।’
তবে, এগুলো যদি কেউ বিশ্বাসও করে, তা ভেঙে দেওয়াও যেমন ঠিক না, তেমনি কেউ বেরিয়ে আসতে চাইলে তাকে সহায়তা করাও উচিৎ বলে মনে করেন বেনজীন।
ভগবতীতলা গ্রামটি যশোর-নড়াইল সড়কের পাশে অবস্থিত। প্রায় দুই হাজার লোকের বসবাস এখানে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই গ্রামে ৩০ ঘরের মতো ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস।