গর্ভের সন্তানসহ প্রসূতির মৃত্যু, সভাকে দায়ী স্বজনদের

আপডেট: 10:38:32 11/12/2016



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় গর্ভের সন্তানসহ মায়ের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রোববার সকালে বিএমএর নির্বাচন উপলক্ষে হাসপাতালের সভাকক্ষে জেলা স্বাচিপের পরিচিতি সভায় সব চিকিৎসক উপস্থিত থাকায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ কারণে আড়াই ঘণ্টা হাসপাতালে সেবা পায়নি অন্তঃ ও বহির্বিভাগের রোগীরা।
হাসপাতার সূত্রে জানা যায়, অন্তঃস্বত্তা জুঁই (২৫) যখন প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন চিকিৎসকরা নিজেদের নির্বাচনী পরিচিতি সভা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যেই গর্ভের সন্তানসহ জুঁইয়ের মৃত্যু হয়। ওয়ার্ডের কতর্ব্যরত সেবিকারা নিজেদের সাধ্যমতো ব্যবস্থাপত্র ও সেবা দিয়েও বাঁচাতে পারলেন না মাসহ গর্ভের সন্তানকে। মৃত্যুর খবর সেবিকারা চিকিৎসককে দিলেও ব্যবস্থাপত্রে ‘অ্যাকলেমশিয়া’ রোগ উল্লেখ করে মৃত ঘোষণা করেন ইন্টার্ন চিকিৎসক মিথি- এভাবে অভিযোগ করলেন মৃতের বাবা জাহিদ হোসেন।
মৃত জুঁই যশোর সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামের জাহিদ হোসেনের মেয়ে ও ঢাকা মোহম্মদপুর এলাকার ফয়সল হোসেনের স্ত্রী। সন্তান প্রসবের জন্য চারমাস আগে বাবার বাড়িতে আসেন জুঁই।
জাহিদ হোসেন অভিযোগ করেন, সকাল সাড়ে আটটার দিকে জুঁইকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ভর্তির পরপরই অপারেশনের সব ওষুধও কিনে আনেন তিনি। সেবিকারা সকাল ৯টার দিকে তাকে হাসপাতালের অপারেশন রুমে পাঠান। কিন্তু অপারেশনের জন্য চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকরা সভা থেকে না আসায় বিনা অপারেশনে মেয়ে ও তার গর্ভে থাকা সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, জুঁইয়ের মতো চিকিৎসা না পেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মঞ্জুরুল আলমের (২২) মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি মাগুরার শালিখা উপজেলার কুল্লিয়া গ্রামের আবুল ফকিরের ছেলে। রোববার সকালে নছিমন নিয়ে তিনি শ্যালো মেশিন কিনতে যশোরে আসছিলেন। খাজুরা বাজারের অদূরে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি ট্রাক নছিমনে ধাক্কা দিলে তিনি মারাত্মক আহত হন। পরে লোকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ডাক্তাররা সভায় থাকায় সেবিকারা রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেন। উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্রের অভাবে মঞ্জুরুল আলমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ। পরে ইন্টার্ন ডা. জিনাত আরা খাতুন তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএমএ কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন উপলক্ষে যশোর জেলা স্বাচিপ ডা. মোস্তফা জালাল উদ্দিন ও ডা. ইহতেসামুল হক চৌধুরী পরিষদের পরিচিতি সভার আয়োজন করে। এই সভা চলে সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। এই দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা হাসপাতালে অন্তঃ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানা যায়, এই আড়াই ঘণ্টায় তারা ৯১৩টি টিকিট বিক্রি করেছেন। জরুরি বিভাগে এই সময়ে ভর্তি হন ৬৯ জন।
হাসপাতালের বহির্বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, চিকিৎসকদের ২০টি কক্ষের মধ্যে ইএনটি মোকলেসুর রহমান, মেডিসিন রাশেদ রেজা ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বাদে ১৮ চিকিৎসকের চেম্বার সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বহির্বিভাগের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সোলাইমান কবির, চর্ম ও যৌন বিশেষজ্ঞ তৌহিদুর রহমান, অলোক সরকার, মেডিসিনের মাধবীরানী বিশ্বাস, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ আমিনুর রহমান, শিশু সার্জন গোলাম কিবরিয়া, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ জিজি এ কাদরী, নিউরো সার্জন সিরাজুল ইসলাম, অর্থোপেডিক বিভাগের ওমর ফারুক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিমাদ্রিশেখর সরকার, নজরুল ইসলাম, গিয়াসউদ্দিন তাদের নিজ নিজ চেম্বারে বসেননি। এ সময় মাধবীরানীর চেম্বারের সামনে পিয়নের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম মিটিংয়ে আছেন। শেষ হলে এসে রোগী দেখবেন।’
রোগী ও তার স্বজনরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে বহির্বিভাগে সকাল সাড়ে আটটায় টিকিট কেটে চিকিৎসকের জন্য প্রায় তিন ঘণ্টা বসে অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু সভা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসক চেম্বারে আসেননি। তখন রোগীদের একমাত্র ভরসা, সেবিকা ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাদের বক্তব্য, চিকিৎসকদের এই ধরনের সভা দুপুরের পরে হলে রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
রোববারের পরিচিতি সভায় উপস্থিত ছিলেন বিএমএর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. বাহারুল ইসলাম, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মাহাবুব উল মওলা চৌধুরী, হাসপাতালের উপ-পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ সাহা, যশোরের সিভিল সার্জন ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. ইয়াকুব আলী মোল্লা, বিএমএর জেলা শাখার সভাপতি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. কামরুল ইসলাম বেনু, সাধারণ সম্পাদক ডা. এমএ বাশারসহ হাসপাতালের অন্য চিকিৎসকরা।
এ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য্য জানান, দাওয়াতে তিনি হাসপাতালে গিয়ে ছিলেন। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে নিজ কার্যালয়ে চলে আসেন। তবে, রোগীর মৃত্যু ঘটনা দুঃখজনক বলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
এদিকে, হাসপাতালের উপ-পরিচালক শ্যামলকৃষ্ণ সাহা বলেন, ‘সভায় চিকিৎসকরা থাকলেও হাসপাতালের বহিঃ ও অন্তর্বিভাগে চিকিৎসক ছিলেন। এ সময় কোনো রোগীর চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যু হয়নি।'
এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

আরও পড়ুন