ঘানি টেনে সন্তানদের পড়াচ্ছেন নূরুল-পারুল

আপডেট: 02:27:06 20/11/2016



img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) :    বাবা-মা মানেই সন্তানের অভিভাবক। আর প্রতিটি বাবা-মাই চান সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করতে। সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সব বাবা-মার সক্ষমতা থাকে না। দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে হয় অনেক বাবা-মাকে। আবার সক্ষমতা থাকলেও নানা কারণে প্রিয় সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন না অনেক পিতা-মাতা।
তবে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে দারিদ্র্য বাধার প্রাচীর তুলতে পারেনি পাইকগাছার সরল এলাকার নূরুল-পারুল দম্পতির সামনে। প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনে দারিদ্রের বাধা। তেরের ঘানি নিজেদের কাঁধে টেনে তারা মানুষ করছেন সন্তানদের। তাদের ছেলে পড়ছেন একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। আর মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিকে।
দুই ছেলে-মেয়েই পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে তাদের মেধার প্রমাণ দিয়েছে। এরপর ছেলেটি ২০০৯ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১১ সালে পাইকগাছা কলেজ থেকে একই ফলাফল অর্জন করে ভর্তি হন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিসারিজ বিভাগে। এরপর খুলনার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুযোগ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অব্যহতি নিয়ে গরিব ও মেধাবী কোটায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজটিতে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্র।
পাইকগাছা শহরের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের সরল এলাকার মৃত জাহান আলী গাজীর ছেলে নূরুল হক গাজী।
তিনি জানান, সহায়সম্বল বলতে মাত্র দুই শতক জমির উপর বসতবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের। দিনমজুরি ও তেলের ঘানি টেনে চালাতে হয় সংসার। তার ওপর ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ।
বংশপরম্পরায় নূরুল হক গাজীরা ঘানি টানাছেন। তার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তিনি গরু দিয়েই ঘানি টানাতেন। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে বিক্রি নূরুল হক বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন গরু। নতুন করে গরু কিনতে পারেননি টাকার অভাবে। তাই বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনই গত ১৫ বছর ধরে ঘানি টানছেন।
নূরুল গাজী বলেন, ‘বাজার থেকে সর্ষে কিনে এনে প্রতি ২-৩ দিন পরপর মাড়াই করে তেল বের করি। সাড়ে চার কেজি সর্ষে মাড়াই করতে প্রায় চার ঘণ্টা দুই মণ ওজন চাপানো ঘানি টানতে হয়। প্রতি কেজি সর্ষেয় ৩০০ মিলি তেল হয়। যা বাড়িতেই বসে ২৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করি। এতে খরচ বাদে ১৫০ টাকা মতো লাভ হয়। এ দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয় না কোনোভাবেই। তাই কাজ করি দিনমজুরের। সংসার কোনো রকমে চললেও ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় ধার-দেনা করে খরচ যোগাতে হয়।’
নূরুল-পারুল দম্পতি জানান, তাদের প্রবল ইচ্ছে দুই ছেলে-মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করা। শত অভাব অনটনের মাঝেও আল্লাহ সেই ইচ্ছা পূরণ করছেন বলে মনে করেন তারা।
মেধাবী দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গর্বিত নূরুল-পারুল দম্পতি। তারা মনে করেন, সন্তানরা যখন লেখাপড়া শেষ করে দেশ, জাতির ও সমাজের উপকারে আসবে তখনই তাদের ত্যাগ ও কষ্ট সার্থক হবে।

আরও পড়ুন