চিকিৎসা করাতে এসে চোখ হারাচ্ছেন ২০ রোগী

আপডেট: 08:37:30 29/03/2018



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে চোখের চিকিৎসা করাতে এসে চোখই হারাচ্ছেন ২০ নারী-পুরুষ। এদের মধ্যে নয়জনের চোখ ইতিমধ্যে তুলে ফেলা হয়েছে। অন্যরাও আছেন চোখ হারানোর ঝুঁকিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৫ মার্চ ইম্প্যাক্ট থেকে ২৪ জন নারী-পুরুষ তাদের চোখে অপারেশন করান। অপারেশনের একদিন পরই ২৪ জনকেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এরমধ্যে ২০ জনের চোখে প্রচণ্ড জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু হলে প্রাথমিক পরীক্ষায় ওই ২০ জনের চোখে ইনফেকশন ধরা পড়ে। এক পর্যায়ে ইমপ্যাক্ট কর্তৃপক্ষ ওই রোগীদের তাদের খরচেই ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও ভিশন আই হাসপাতালে চিকিৎসা করায়। সেখানে চিকিৎসা দিয়েও রোগীদের একটি চোখ ভালো করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীরা হলেন চুয়াডাঙ্গার সোনাপট্টির আবণী দত্ত, সদর উপজেলার গাইদঘাট গ্রামের গোলজার হোসেন, আলোকদিয়া গ্রামের ওলি মোহাম্মদ, আলমডাঙ্গা উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের খোন্দকার ইয়াকুব আলী, একই উপজেলার খাসকররা গ্রামের লাল মোহাম্মদ, মোড়ভাঙ্গা গ্রামের আহমেদ আলী, হারদী গ্রামের হাওয়াতন, নতিডাঙ্গা গ্রামের ফাতেমা খাতুন, খাস-বগুন্দা গ্রামের খবিরুন নেছা, রংপুর গ্রামের ইকলাস, আলমডাঙ্গা স্টেশনপাড়ার কুতলি খাতুন, কুটি পাইকপাড়ার ঊষারানি, দামুড়হুদা উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের তৈয়ব আলী, মদনা গ্রামের মধু হালদার, চিৎলা গ্রামের নবিছদ্দিন, মজলিশপুর গ্রামের সাফিকুল ইসলাম, কার্পাসডাঙ্গার গোলজান, সদাবরি গ্রামের হানিফা, বড় বলদিয়া গ্রামের আয়েশা খাতুন এবং জীবননগর উপজেলার সিংনগর গ্রামের আজিজুল হক।
ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা শহরের কেদারগঞ্জে অবস্থিত চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. সফিউল কবির জিপু বলেন, গত ৪ ও ৫ মার্চ দুদিন ৬০ জন রোগীর চোখের অপারেশন করানো হয়। ৫ মার্চ রোগীদের ছাড়পত্র দেওয়ার পর ২০ রোগীর চোখে ইনফেকশন ধরা পড়ে। রোগীদের আরো ভালো চিকিৎসার জন্য ইম্প্যাক্টের খরচে তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। তাছাড়া চোখে কী কারণে ইনফেকশন হলো তা জানার জন্য ইম্প্যাক্ট ফাউন্ডেশনের সকল ওষুধপথ্য পরীক্ষার জন্য আইসিসিভিডিআরবিতে পাঠানো হয়েছিল। তাদের পাঠানো প্রতিবেদনে ওরোব্লু (Auroblue) নামের ব্যবহৃত কিডসে পার্ম নেগেটিভ সেসিলি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ওই ব্যাকটেরিয়ার কারণেই ইনফেকশন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই কিডস আইআরআইএফ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে আমদানি করে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলম ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেল্থ কেয়ার সেন্টারের অপারেশন থিয়েটারসহ ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। তিনি তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করেছেন। তদন্ত টিমকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে (২ এপ্রিল) প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিভিল সার্জন।
চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য প্রশাসনের তরফে গঠিত তদন্ত দলের পক্ষে ইতিমধ্যে ইম্প্যাক্টের অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতিসহ ওষুধপথ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিভিল সার্জন ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের আই (চক্ষু) কনসালটেন্ট ডা. মোহাম্মদ শাহীনের এমবিবিএসসহ সব শিক্ষা সনদের ফটোকপি সংগ্রহ করেছেন।
অন্যদিকে, ইম্প্যাক্টের অপারেশন থিয়েটারে কয়েকদিন বন্ধ রাখা হলেও গঠিত তদন্ত দলের কাছ থেকে ‘অপারেশন থিয়েটারের কোনো ত্রুটি নেই’- এমন প্রতিবেদন নিয়ে তা দ্রুত চালু করার তোড়জোড় চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি নয়জনের চোখ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তুলে ফেলতে হয়েছে। আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী গ্রামের হাওয়াতনের চোখ তুলে ফেলা না হলেও তিনি ইম্প্যাক্টে অপারেশন করা চোখটিকে দেখতে পারছেন না। যন্ত্রণাও যায়নি। তার মেয়ে ফরিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। মায়ের চোখে অপারেশন করে আমরা যে হয়রানির শিকার হচ্ছি তা বলে শেষ করা যাবে না।’
অপরদিকে দামুড়হুদা উপজেলার সদাবরি গ্রামের হানিফার মেয়ে হালিমা বেগম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ৫ মার্চ মায়ের চোখে অপারেশন করানো হয়। পরদিন তাকে ছেড়ে দেয় ইম্প্যাক্ট। বাড়ি ফেরার পর মায়ের অপারেশন করা চোখে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। ৯ মার্চ আবার ইম্প্যাক্টে আনা হলে সেখান থেকে ডা. ফকির মোহাম্মদের কাছে যেতে বলা হয়। ডা. ফকির পরামর্শ দেন ঢাকা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি হতে। সেখানে এখনো চিকিৎসা চলছে ইম্প্যাক্ট ফাউন্ডেশনের খরচে।

আরও পড়ুন