চেরনোবিল দুর্ঘটনা ও রূপপুর

আপডেট: 02:53:32 27/04/2018



img

মওদুদ রহমান

১৯৮৬ সালের এই দিনে যখন চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটে। তার দুই যুগেরও বেশি আগে মানুষ পৌঁছে গিয়েছিল মহাশূন্যে। বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে এভাবেই পৃথিবী এগিয়েছে, এগিয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞান যখন চর্চার বদলে বদ্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়, তখনই ঘটে যত বিপদ। সত্তর আর আশির দশকে বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অহমিকায় অন্ধ হয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) কেউই এই বিপদ থেকে রেহাই পায়নি।
১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থ্রি মাইল আইল্যান্ড পারমাণবিক দুর্ঘটনার মাধ্যমে বেজেছিল সাবধান হয়ে যাওয়ার ঘণ্টা। কিন্তু সে সময়ে নীতিনির্ধারকেরা তা কানে তোলেননি। যার মূল্য গুনতে হয়েছে ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ইউক্রেনে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ঘটনার মাধ্যমে। ৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও চেরনোবিল শহর এখনো বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত। বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম আর ক্যানসারে মৃত্যু এখনো সেখানে নিয়মিত ঘটনা। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়া রাশিয়া, বেলারুশ আর ইউক্রেনের কয়েক লাখ হেক্টর জমি আজও ফলনের জন্য অনুপযুক্ত।
ক্ষুদ্র পরমাণুর ভাঙনে বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়ার স্বপ্নের সৌধ এতটাই উঁচুতে পৌঁছে ছিল যে গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে এই বিদ্যুৎকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সস্তা বিদ্যুতের কাল আর আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার আশ্বাস দিয়ে দেশে দেশে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণের খরচ জোগানো হয়েছে। প্রযুক্তিকে দোহাই মেনে এটিকে নিরাপদ বিদ্যুৎ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনায় নিরাপদ আর সস্তা হিসেবে জাহির করা পারমাণবিক বিদ্যুতের বিজ্ঞাপনী মুখোশ খসে পড়েছে।
চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ স্তিমিত হয়ে পড়ে। আর ২০১১ সালে জাপানে ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জার্মানি ২০২২ সালের মধ্যেই চালু থাকা সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ মজুতের মালিক অস্ট্রেলিয়া কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার নীতি গ্রহণ করেছে। অতিরিক্ত খরচ আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ দেশগুলো যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকে বিদায় জানাচ্ছে, তখন ঠিক কী কারণে বাংলাদেশ রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু করল, তা পরিষ্কার নয়।
রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই নির্মাণ ব্যয় ৩২ হাজার কোটি টাকা থেকে এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে (ডব্লিউএনআইএসআর, ২০১৭)। লাগামছাড়া খরচ আর নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতায় শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউ জানে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইএইএর গাইডলাইন অনুসারে রূপপুর প্রকল্পের আশপাশের ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় বসবাসরত সবাইকে যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি আলোচনা পর্যন্ত করা হচ্ছে না। পরিবেশ সমীক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টটি কী কারণে এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হলো না, তা কেউ জানে না। জনসংযোগ এখন পর্যন্ত কেবল বিজ্ঞাপন প্রচারেই সীমাবদ্ধ। রূপপুর প্রকল্প নিয়ে আলোচনাহীন পরিবেশে নীতিনির্ধারণী মহলের নীতি এখন ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’। রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তার ব্যাপারে যদি এতটাই নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে ঠিক কী কারণে ভবিষ্যৎ যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়মুক্তি দিয়ে আইন পাস করে রাখা হয়েছে, সেটাও একটা জরুরি প্রশ্ন।
কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনেই পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচের চক্র শেষ হয় না; বরং এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় যে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়, সেটাও অনন্তকাল ধরে নিরাপদে রাখার আয়োজন করতে হয়। বলা হচ্ছে, রাশিয়া নাকি এই বর্জ্য ফেরত নেবে। অথচ রাশিয়ার আইন অনুসারে অন্য দেশের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সেখানে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ অসম্ভব। (world-nuclear.org)।
প্রযুক্তির আধুনিকায়নে অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনি ব্যবস্থায় খরচ কমে। যেমন ২০১০ সালের তুলনায় প্রতি ইউনিট সৌর বিদ্যুতের দাম সাত বছরের ব্যবধানে কমে গেছে শতকরা ৭২ ভাগ (আইআরইএনএ, ২০১৮)। অথচ পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা যুক্ত হতে থাকায় খরচ কেবলই বাড়ে। এ কারণেই ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্রান্সের ফ্লামেনভিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচ ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর তিন গুণ বেড়েছে, কিন্তু নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ক্রমাগত বাড়তে থাকা খরচের চাপে পিষ্ট হয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী কোম্পানি জাপানের তোশিবা আর ফ্রান্সের আরিভা উভয়েই ২০১৭ সালে দেউলিয়াত্বের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
বিজ্ঞানকে বিশ্বাসে পরিণত করে প্রযুক্তির ঘাড়ে পা রেখে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে সস্তা আর নিরাপদ হিসেবে প্রমাণ করতে চাওয়া নীতিনির্ধারকেরা বারবার ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছেন। মিথ্যা আশ্বাস আর ভ্রান্ত প্রচারণায় হিসাবের খাতায় ক্ষতির পরিমাণ কেবলই বেড়েছে। কাজেই চেরনোবিলসহ প্রতিটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা সবার জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সে বার্তা পাঠ করা খুব জরুরি।
[লেখক : প্রকৌশলী, গবেষক। প্রথম আলো থেকে।]