চৌগাছার পল্লবী ক্লিনিকের অনিয়ম তদন্তে কমিটি

আপডেট: 09:01:18 11/09/2018



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরের চৌগাছার সেই পল্লবী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রসূতিদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ আনা হয় ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপকুমার রায়।
নির্দেশের প্রেক্ষিতে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে প্রসূতিদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ তদন্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আওরঙ্গজেবকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গাইনি ডাক্তার ফারিয়া খাতুন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী আলামিন হোসেন। তদন্ত কমিটিকে দিন কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ করা হয়, পল্লবী ক্লিনিকে চলছে সেবার নামে প্রহসন। প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শোভা বাড়িয়ে সেবার নামে চলছে প্রতারণা।
সম্প্রতি এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য প্রশাসন। ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে আসা সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইন অনুযায়ী ক্লিনিকে রোগীদের দেখভালের জন্য সর্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস ডাক্তার থাকার নির্দেশনা থাকলেও পল্লবী ক্লিনিকে তা অনুপস্থিত। এমনকি কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকাও (নার্স) নেই ক্লিনিকটিতে।
গত ২৪ জুলাই সিজারিয়ান অপারেশন করতে উপজেলার দিঘলসিংহা গ্রামের জয়নাল আবেদিনের মেয়ে ও মহেশপুরের ভাটপাড়া গ্রামের আলমগীরের স্ত্রী তাহমিনা খাতুনকে (২৫) পল্লবী ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। অপারেশনের সময় প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ ও হ্যান্ড গ্লাভস রেখে সেলাই করা হয় বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনেরা। তারা জানান, সিজারের কয়েকদিন পরে তাকে রিলিজ দেওয়ার পরও বাড়িতে গিয়ে প্রসূতির ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় স্বজনরা ক্লিনিকের কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন বিষয়টি। তখন ক্লিনিক মালিক মিজানুর রহমান ওষুধ লিখে দেন আর রোগিনীকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, আস্তে আস্তে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ক্লিনিক থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে চলে যাওয়ার এক মাস ১৩ দিন পরও রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় গত ২ সেপ্টেম্বর রোববার তাহমিনাকে আবারো ওই ক্লিনিকে নিয়ে যান স্বজনরা। এসময় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে বন্ড নিয়ে দুইবার জরায়ু ওয়াশ করে দেয় রোগিনীর। ওয়াশের সময় রোগীর জরায়ু থেকে রক্তাক্ত মফ (যা অপারেশনের সময়ে তাৎক্ষণিক রক্ত বন্ধের জন্য জরায়ুতে ব্যবহার করা হয়। এটি সর্বোচ্চ ৭২ ঘন্টার মধ্যে খুলে ফেলতে হয়) বেরিয়ে আসে
বিষয়টি রোগীর স্বজনরা জানতে পেরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি কনসালটেন্ট ডা. রবিউল ইসলামের চৌগাছা শহরের চেম্বারে যান। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ডা. রবিউল ইসলাম তাদেরকে অভিজ্ঞ নার্স দিয়ে রোগীর পিভি করানোর পরামর্শ দেন। তার শরীরের মধ্যে গজ-ব্যান্ডেজ বা অন্য কিছু থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন ডা. রবিউল। এজন্য তিনি রোগীকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। পরামর্শমতো তহমিনাকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তহমিনার স্বজনরা জানিয়েছেন, জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তার আবার অস্ত্রোপচার করা লাগতে পারে।
একই ক্লিনিকে ২০১৬ সালে ৭ অক্টোবর উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের হাফিজুরের স্ত্রী মাফিজা (২৫) নামে এক প্রসূতির সিজার করা হয়। সেসময়ও প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ (মফ) রেখে সেলাই করা হয়। দীর্ঘদিন তার পেটের যন্ত্রণা বন্ধ না হলে স্বজনরা তাকে যশোরের নূর মহল ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে পেটে মফ রয়েছে বলে জানতে পারেন। পরে আবার অপারেশন করে রোগীর পেট থেকে মফ বের করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে পল্লবী ক্লিনিকের মালিক মিজানুর রহমান মোটা টাকা দিয়ে রোগীর স্বজনদের ‘ম্যানেজ’ করেন।
এর আগে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি উপজেলার খড়িঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা ও চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী আসমা খাতুনকে (২৭) পল্লবী ক্লিনিকে সিজার করা হয়। সেসময় রোগীর পেটের মধ্যে ব্যান্ডেজের বান্ডিল রেখেই সেলাই করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে যশোরের কুইন্স হসপিটালে নেওয়া হয়। সেখানে আলট্রাসনো করে রোগীর পেটে গজের বান্ডিল রয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। রোগীকে বাঁচাতে আবার অপারেশন করে গজের বান্ডিলটি বের করা হয়। আসমা খাতুনের স্বজনরা জানিয়েছেন আর দু’এক দিন অতিবাহিত হলেই রোগীকে বাঁচানো যেত না বলে জানিয়েছিলেন ডাক্তার। এ ঘটনায় যশোর সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগ করেছিলেন রোগীর স্বজনরা।
পল্লবী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম। তিনি বলেন, যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপকুমারের নির্দেশে ক্লিনিকটির বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আরওঙ্গজেবকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন