চৌগাছায় কর্মসৃজনের কোটি টাকা হরিলুটের অভিযোগ

আপডেট: 01:53:29 13/05/2018



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : চৌগাছায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্পের (৪০ দিনের) প্রায় দুই কোটি টাকার বড় অংশই নয়-ছয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অনিক বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই নয়-ছয় হচ্ছে বলে অভিযোগ।
উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে কিছু সংখ্যক শ্রমিক ছাড়া কোথাও কর্মসৃজনের কোনো কাজ হচ্ছে না। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর ১৯ দিনের কাজের বিল জমা দেওয়া হয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে। ১৯ দিনের কাজ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কাজ হয়েছে ১৪ দিন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসকে ২০% টাকা দিতে বাধ্য হওয়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মহিলা মেম্বার, ইউপি সচিব ও চৌকিদার-দফাদারদের জন্য একজন করে শ্রমিকের কোটা রাখায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে নামকাওয়াস্তে কাজ হলেও নারায়ণপুর, সিংহঝুলি, হাকিমপুর, পাতিবিলা, জগদীশপুর, স্বরুপদাহ ও সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ছিটেফোঁটা কাজও হচ্ছে না বলে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে।
এবিষয়ে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা এএসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ বলেন, ‘বিষয়টি আপনারা লিখিতভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দেন।’
সাংবাদিকরা লিখিত অভিযোগ কেন দেবেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পারলে আপনারা তাদেরকে আমার সামনে নিয়ে এসে প্রমাণ করেন। আপনাদের কাছে সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে নিউজ করেন। এমন উদ্ভট কথা আপনাদের কাছেই প্রথম শুনলাম।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৯৯টি ওয়ার্ডের ৯৯টি প্রকল্পে মোট দুই হাজার ৩৮৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। এর মধ্যে ফুলসারা ইউনিয়নে ২৬০, পাশাপোলে ২৩০, সিংহঝুলিতে ১৪২, ধুলিয়ানিতে ১৪৭, চৌগাছা সদরে ১৪০, জগদীশপুরে ১৮৫, পাতিবিলায় ১৫৮, হাকিমপুরে ২৪৬, স্বরুপদাহে ২৭২, নারায়ণপুরে ২৯১ এবং সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ৩১৩ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। প্রতিটি ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডে এসব শ্রমিক প্রকল্পের অধীন গ্রামীণ কাঁচা-আধাপাকা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তবে ১৫ শতাংশ শ্রমিকও কাজ করছেন না।
বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে কাজ পরিদর্শনে গিয়ে পাওয়া যায় ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বার এবং পিআইও অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অনিক বিশ্বাস সম্মিলিতভাবে পুকুর চুরিতে লিপ্ত।
উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের আন্ধারকোটা ওয়ার্ডে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও কয়েকদিনের পরিদর্শনে দেখা গেছে ৬-৭ জনের বেশি শ্রমিক কোনোদিন কাজ করেন না। কোনো কোনো দিন একজন শ্রমিকরা কাজ করেন না।
ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন ইউনিয়ন পরিষদের এক নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেনের ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত। তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য জাকির হোসেনকে ফোন করা হলেও তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
গত বুধবার উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের হাজরাখানা, পেটভরা, নারায়ণপুর, বাদেখানপুর, বুন্দেলীতলাসহ কয়েকটি গ্রামে ঘুরে কোথাও কোনো শ্রমিককে প্রকল্পের কাজ করতে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধুলিয়ানি ইউপির একটি ওয়ার্ডের একজন ইউপি সদস্য বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের প্রকল্প মূল্য ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯০ হাজার টাকা। ওয়ার্ডটির প্রকল্পে ২১ জন লেবার কাজ করার কথা। কাজ করছেন ১৬ জন। বাকি পাঁচজনের একটি ইউপি চেয়ারম্যান, একটি আমার, একটি ইউপি সচিবের, একটি ইউনিয়ন অফিসের, একটি ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার-দফাদারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এই পাঁচজন কাজ না করলেও টাকা উঠে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার নামে একটি লেবার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা থেকে ৪০ দিনে আমার আসবে আট হাজার টাকা। এখন উপজেলা পিআইও অফিসের ২০% হারে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আমি কোথা থেকে দেবো, বলুন?’
পিআইও অফিসের ২০ শতাংশ কে কে পাবেন জানতে চাইলে ওই মেম্বারের জবাব, ‘এও জানেন না? পিআইও অফিসসহ সংশ্লিষ্টরা ১৮ শতাংশ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ট্যাগ অফিসার ২ শতাংশ করে পাবেন।’
বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যানদের ব্যক্তিগত সহকারীদের নামেও কোনো কোনো ইউনিয়নের ওয়ার্ডগুলোতে এক থেকে তিনজন শ্রমিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পিআইও অফিসের টাকা কীভাবে দেওয়া হবে, তার জবাব পাওয়া গেল স্বরুপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের অন্য একটি ওয়ার্ডের একজন ইউপি সদস্যের কাছে। তিনি বললেন, ‘আমার ওয়ার্ডে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। পিআইও অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অনিক এবং অফিস সহকারী মতিয়ার রহমান দুইদিন পরিদর্শনে গিয়ে ২৫ জন করে পেয়েছেন।’
মেম্বারের সঙ্গে কথা বলার সময় বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট অফিসের লোকজন পরিদর্শনে যাওয়ার সময় তাদের ইনফর্ম করেই যান। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় বাকি পাঁচজনের কী হবে? তার জবাব, ‘একজন ইউপি চেয়ারম্যান, একজন আমার, একজন মহিলা মেম্বারের, একজন ইউপি সচিবের ও একজন চৌকিদার দফাদারদের ভাগে যাবে।’
তাহলে পিআইও অফিসের ২০ শতাংশ কীভাবে দেবেন?- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘শেষের কয়েকদিন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। অফিস থেকে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে বলা হবে। পরে বিল তুলে নেওয়া হবে।’
অবশ্য একটি সূত্র দাবি করেছে, ‘এখন ধান কাটার মৌসুম হওয়ায় কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে’ ঘোষণা দিয়ে কাজ বন্ধ করে পরে বিল তুলে নেওয়া হবে। তবে এসব বিষয়ে কেউ উদ্ধৃত হতে চাচ্ছেন না।
উপজেলার একজন ইউপি চেয়ারম্যান বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান হয়েই যেন বিপদে পড়েছি। উপজেলা থেকে কোনো প্রকল্প নিতে গেলেই কমপক্ষে ২০ শতাংশ টাকা দিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদে মেম্বার, চৌকিদার-দফাদার আছে। ইউপি সবিচরা টাকা ছাড়া ফাইলে স্বাক্ষর করতে চান না। অন্যদিকে জনগণকে কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে বলা হয়। আমরা কোথায় যাবো, বলুন তো?’
তিনি বলেন, ‘এমনটি কেনো হবে? জনগণের টাকা জনগনের জন্য ব্যয় করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দিচ্ছেন। সেখানে আমরা পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগ করেও কেনো অফিসে এতো টাকা দিতে হবে?’
এদিকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর প্রকল্প সাইটে সাইনবোর্ড টাঙানোর কথা বলা হয়েছে। এই ব্যবসাও করছেন পিআইও অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অনিক বিশ্বাস। সাইনবোর্ড তৈরির জন্য আড়াই হাজার টাকা করে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট মেম্বারদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হলেও তিনি চৌগাছার একটি আর্টের দোকান থেকে মাত্র ৬০০ টাকায় সাইনবোর্ড তৈরি করে প্রকল্প সাইটে পাঠিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ প্রকল্প সাইটেই সাইনবোর্ড টাঙানো হয়নি বলে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এএসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদের অনুপস্থিতিতে এই অনিক বিশ্বাসই পুকুরচুরির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে পিআইও অফিস এবং জনপ্রতিনিধিদের সূত্রে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পিআইও অফিসের সুপারভাইজার অনিক বিশ্বাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব কথা যে আপনারা কোথায় পান!’
প্রকল্প তালিকা চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটা দেওয়ার তো একটা প্রসেস আছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বললে দিয়ে দেবো।’
প্রকল্প সাইটে সাইনবোর্ড আছে বলে দাবি করেন অনিক বিশ্বাস। তবে কোন কোন সাইটে বোর্ড আছে, তা তিনি জানাতে পারেননি।
তার দাবি, এখনো কোনো বিল অফিসে জমা হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এএসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ ঝিকরগাছার সঙ্গে চৌগাছায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। জানতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আপনার কাছে এ বিষয়ে প্রথম শুনলাম। আপনারা অভিযোগগুলো লিখিতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান।’
তিনি বলেন, ‘অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এমন উদ্ভট কথা আপনার কাছে প্রথম শুনলাম। আপনাদের তো একমাস আগেই বলেছি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে পত্রিকায় রিপোর্ট করেন।’

আরও পড়ুন