চৌগাছায় জনপ্রতিনিধিদের নামে ১২৫টি নাশকতা মামলা

আপডেট: 02:15:58 04/10/2018



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : চৌগাছার ১২টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিরা মোট ১২৫টি নাশকতা মামলার ফেরারি আসামি। পুলিশের ভয়ে বছরের পর বছর তারা বাড়িঘর ছেড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউবা অর্থনৈতিকভাবে হয়ে পড়েছেন দেউলিয়া।
একদিকে পরিবারের ভরণ-পোষণ, নিজের চলা খরচ আর অন্যদিকে মামলার খরচ যোগাতে গিয়ে অনেকে জমাজমি বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এদের সবাই মাসের পর মাস কারাগারে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন। মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জীবন হারিয়েছেন ধুলিয়ানী ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম শান্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে পুলিশের নাশকতা মামলা দেওয়া শুরু হয় ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর তারিখে। প্রথম মামলায় আসামি করা হয় পাশাপোল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবু সাঈদকে। মাওলানা আবু সাঈদ ছাত্রজীবন শেষ করে মৌলভি শিক্ষক পদে যোগ দেন ধুলিয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেই সঙ্গে এলাকার মসজিদে বিনাপয়সায় ইমামতিসহ নানা সামাজিক কাজ করতে থাকেন। এলাকার মানুষ ১৯৮৭ সালের স্থানীয় নির্বাচনে মেম্বর পদে তাকে নির্বাচিত করেন। তারপর ১৯৯২ সালে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন তিনি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পাশাপোল ইউনিয়নবাসীর সুখ-দুঃখের সাথী মাওলানা আবু সাঈদ। হজ করে আসা এই ব্যক্তির অবস্থান রয়েছে পাশাপোল ইউনিয়নজুড়ে। অথচ সেই আবু সাঈদ আজ নাশকতা, বিস্ফোরকসহ পাঁচ মামলার আসামি হয়ে এক প্রকার ফেরার জীবনযাপন করছেন। পুলিশের ভয়ে বাড়িতে থাকতে পারেন না। বৃদ্ধ বয়সে বেশ কয়েক মাস জেলও খেটেছেন। বলেন, ‘শেষ বয়সে এতটা বিপদে পড়বো কোনদিন ভাবিনি।’
একই মামলায় তার আপন ভাই মাওলানা আব্দুল কাদেরকেও আসামি করে পুলিশ। তিনিও ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আট বছর ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। পুলিশ তার নামে আটটিরও বেশি মামলা দিয়েছে; যেগুলোকে ‘গায়েবি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এলাকাবাসী। মাওলানা কাদের এখন ফেরার জীবনযাপন করছেন।
মামলায় আসামি করা হয় হাকিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা আমিন উদ্দিন খানকে। তার সততার দৃষ্টান্ত এখনো মানুষের মুখে মুখে। চেয়ারম্যান হলেও তিনি পরিষদ থেকে কোনো ভাতা নিতেন না। চৌগাছা উপজেলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবার কাছে সুপরিচিত হাফেজ হাজি আমিন উদ্দিন খান। অথচ এমন মানুষের হাতেও হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে দেয় পুলিশ। ছয় মামলার আসামি হয়ে তিনিও এখন বাড়িছাড়া। ওই সব মামলায় আরো আসামি করা হয় চৌগাছা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র মাস্টার কামাল আহমেদকে। বয়সে তরুণ এই জনপ্রতিনিধি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। এলাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি চৌগাছা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে পুলিশ ১৩টির বেশি নাশকতা পরিকল্পনার মামলা করেছে।
অন্তত ১৫টি নাশকতা পরিকল্পনা মামলার আর এক আসামি হলেন সিংহঝুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুচ আলী দফাদার। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ইউনুচ আলী একের পর এক মিথ্যা মামলায় অনেকটাই কাবু হয়ে গেছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে তাকে যে কতবার জেলে যেতে হলো, তার কোনো হিসেব নেই। পুলিশের খাতায় তিনি এখন পলাতক আসামি। প্রতি মাসের বেশির ভাগ দিন তার কেটে যায় আদালতের বারান্দায়। স্বজনদের আক্ষেপ, তিনি নিজে জমি দান করে যে ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবন তৈরি করেছেন, সেই ভবনে কল্পিত বোমা হামলার অভিযোগে পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
ধুলিয়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম শান্তি। প্রচলিত আছে, তার ইউনিয়নের যে কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে একবার চেয়ারম্যান শান্তি ভাত খাওয়াবেনই। এই মানুষটাকে পুলিশ বারবার আটক করে জেলখানায় পাঠাতে লাগলো। এক সময় মানসিক চাপে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শান্তি।
চৌগাছা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কয়ারপাড়া গ্রামের এমএ সালাম। ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন তৈরি করতে নিজে জমি দান করেছেন। তিনিও অর্ধডজন মামলার আসামি হয়ে ফেরার জীবনযাপন করছেন।
জগদীশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মাওলানা আব্দুর রহমান। ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়ে চেয়ারম্যান থাকাকালে কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, কার্লভাটসহ হাজারো জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। এই জনপ্রতিনিধিকে পাঁচটি মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এখনো অজ্ঞাত মামলার আসামি হিসেবে ফেরার তিনি।
পাতিবিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে ১১ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এলাকার এমন কোনো উন্নয়নমূলক কাজ নেই, যেখানে জহুরুল ইসলামের হাতের ছোঁয়া নেই। সারা উপজেলার সকল মানুষ এক নামে তাকে চেনে। একের পর এক মামলা হতে থাকে তার নামে। তিনি এখন ১৩টি মামলার আসামি। মামলা-মোকদ্দমার কারণে নষ্ট হয়েছে ব্যবসা। প্রায় তিন কোটি টাকা দামের ইটভাটা ধ্বংস হয়ে গেছে। জহুরুল বলেন, ‘আমি জ্ঞানত কারো কোনো ক্ষতি করিনি। আমি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করি। এ উপজেলার কেউ বলতে পারবে না আমি কখনো পটকাবাজি ফুটিয়েছি। অথচ পুলিশ আমার নামে একের পর এক বোমাবাজির মিথ্যা মামলা দিয়ে যাচ্ছে।’
এই ইউনিয়নের আরেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান লাল। চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ পার করছেন। নিজের অসুস্থতা চেপে জনগণের সেবা দিয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন। অথচ তিনিও বেশ কয়েকবার জেল খেটে এখন ক্লান্তশ্রান্ত। তার নামে পুলিশ চারটি মামলা দায়ের করেছে।
হাকিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলেন মাসুদুল হাসান। এবার তিনি দ্বিতীয় মেয়াদ পার করছেন। উপজেলার সর্বকনিষ্ঠ চেয়ারম্যান তিনি। তার নিজের বলে যেন কোনো কাজ নেই। জনগণের সেবাই তার নেশা। অথচ সমাজসেবক এই তরুণের নামে এখন পর্যন্ত ২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। চেয়ারম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলার আসামি তিনি।
জানতে চাইলে মাসুদুল হাসান বলেন, ‘এখন প্রতিদিন আদালতে হাজিরা দিতে হয়। আর নতুনভাবে আটক হওয়ার ভয়ে বলা যায় একপ্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
স্বরূপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মাওলানা আব্দুল লতিফ। চৌগাছা উপজেলার সর্ববৃহৎ এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়ে মানুষকে সেবা দিতে ছুটে বেড়িয়েছেন একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। কিন্তু এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, তিনি চৌগাছার লোহার ব্রিজের কাছে বোমা নিয়ে বসে ছিলেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি চৌগাছা উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের খতিব। আমার ইমামতিতে ডিসি, ইউএনও সাহেবরা নামাজ আদায় করেন। আর পুলিশ বলল, আমি বোমাবাজ। খুবই খারাপ লাগে এসব চিন্তা করলে।’
১১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কাজী আব্দুল হামিদ। তার নামে পুলিশ নাশকতার পাঁচটি মামলা দিয়েছে। তিনিও এখন ফেরার জীবনযাপন করছেন।
চৌগাছা পৌরসভার মেয়র ছিলেন সেলিম রেজা আওলিয়ার। পৌর এলাকার মানুষের সঙ্গে যার রয়েছে হৃদয়ের বন্ধন। যিনি প্রতিদিন পৌরসভার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে হাসিমুখে মানুষের সাথে কুশলবিনিময় করেন। তিনি চারটি নাশকতা মামলার আসামি।
এছাড়া পৌর কাউন্সিলর সাইদুল ইসলাম দশটি, নাজমুজ্জান খোকন পাঁচটিসহ উপজেলার আরো অনেক জনপ্রতিনিধি পুলিশের দেওয়া নাশকতা মামলার আসামি হয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন।
জনপ্রতিনিধিদের মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে চৌগাছা থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই আকিকুল ইসলাম বলেন, ‘আইনের চোখে সবাই সমান। অপরাধীর ক্ষেত্রে কে জনপ্রতিনিধি আর কে সাধারণ মানুষ তা দেখার কোনো সুযোগ নেই।’

আরও পড়ুন