চৌগাছায় মঙ্গলবার শুরু বলুহ দেওয়ানের মেলা

আপডেট: 10:22:32 10/09/2018



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : কাল মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ানের (রহ.) মেলা। মেলা চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। শতবছরের এই মেলা ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় মেলা পরিচালিত হবে। এজন্য নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মুকুলকে সভাপতি এবং ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যের ‘মেলা পরিচালনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও মেলার আসবাবপত্রের বেচাকেনা শুরু হয়ে গেছে এক সপ্তাহ আগে থেকেই।
মেলা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও হাজরাখানা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলন বলেন, এবছর মেলায় কাঠের আসবাবপত্র, খেলনা, প্রসাধনী, গার্মেন্টস, হোটেল-বেকারি, মিষ্টির দোকান, নাগরদোলা, স্টিল সামগ্রীসহ হাজারের অধিক দোকান বসেছে। এছাড়া প্রতি বছরের মতো মেলার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে কপোতাক্ষ নদে স্পিডবোট ও ‘মৃত্যুকূপে’ প্রাইভেট কার চালানো।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার ভিডিপি আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করবে।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরিফকে ঘিরে যশোর জেলার সীমান্তবর্তী চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে বসে এই মেলা। হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের পাশে উঁচু ঢিবির ওপর বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফ অবস্থিত। বলুহ দেওয়ান কামেল পীর ছিলেন বলে বিশ্বাস।
প্রতিবছর মেলার সময় আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে । এ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে ঈদ-পূজায় না হলেও মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই দাওয়াত করে আনার রেওয়াজ রয়েছে।
যাকে ঘিরে এই মেলা, তার সম্পর্কে রয়েছে নানা মিথ; যা লোক মুখে প্রকাশ পায়। বলা হয়, পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। প্রচলিত কথা- তিনি যা বলতেন তাই নাকি হতো। তার জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের অনেক কিছুই ছিল রহস্যে ঘেরা।
বলুহ দেওয়ান চৌগাছার যাত্রাপুর গ্রামের ছুটি বিশ্বাসের ছেলে। তবে জন্মকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। জ্যেষ্ঠ ভক্তদের মতে, তিনি ৩-৪শ’ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন। তবে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাসির হেলালের লেখা ‘যশোর জেলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসার’ এবং স্থানীয় সাংবাদিক মাসুদ পারভেজের লেখা ‘চৌগাছার পীর-দরবেশ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে বলুহ দেওয়ান জন্মগ্রহন করেন বলে ধারণা করা হয়। তার নামে ভারতের কলকাতা ও নদীয়া, বাংলাদেশের চৌগাছার হাজরাখানাসহ বিভিন্ন স্থানে ৫২টি থান আছে। যেখানে তার ভক্তরা বসে ইবাদত-বন্দেগি করেন। বর্তমানে উপজেলার জিওলগাড়ি, ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড় ধোপাধী গ্রামে তার থানে ছোট পরিসরে মেলা বসে থাকে। তার নামে চৌগাছার হাজরাখানা পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদরাসার নামকরণ করা হয়েছে।
ফি বছর মেলায় সারা দেশ থেকে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা আসেন নানা পসরা নিয়ে। এ অঞ্চলের যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা এবং সাতক্ষীরা জেলার ২০-৩০টি উপজেলার মানুষ আসেন মেলা দেখতে এবং মেলা থেকে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে। আয়তন ও পরিধিতে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক বিখ্যাত সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা থেকেও বৃহৎ।
পীর বলুহ (রহ.) সম্পর্কে বলা হয়, যখন তার বয়স ১০-১২ বছর তখন বাবার নির্দেশে গ্রামের পাশের মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন তিনি। ক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগে চাষি গরুগুলো ধরতে গেলে তিনি সব গরু বক বানিয়ে বটগাছে বসিয়ে রাখেন।
বাবার মৃত্যুর পর বলুহ উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে মামাবাড়িতে থেকে অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটতেন। একদিন মাড়াই করতে মাঠে গিয়ে সর্ষের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। সংবাদ শুনে গৃহস্থ মাঠে গিয়ে দেখেন, সর্ষের গাঁদায় আগুন জ্বলছে। তখন গৃহস্থ রাগান্বিত হলে তিনি হেসে ছাই উড়িয়ে দেখিয়ে দেন সর্ষে পোড়েনি।
একদিন তার মামি খেজুররসের চুলায় জ্বাল দিতে বললে তিনি জ্বালানির পরিবর্তে চুলায় পা ঢুকিয়ে আগুনে জ্বাল দিতে থাকেন। কিন্তু তার পায়ের কোনো ক্ষতি হয়নি।
এমন অনেক ‘অলৌকিক’ ঘটনার জন্ম দিতে থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ বলুহর কাছে এসে শিষ্যত্ব নেন। ‘অলৌকিক’ ঘটনা ঘটানোয় বলুহ দেওয়ান পীর হিসেবে পরিগণিত হন।
তার মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলের মানুষ জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তার নামে মানত করতে থাকেন। তারা প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার হাজরাখানা গ্রামে অবস্থিত তার রওজা শরিফে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, নারকেল ও টাকাসহ নানা দ্রব্যাদি দিয়ে মানত শোধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে এখানে আসা ভক্তদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রয়োজনে গড়ে ওঠে পীর বলুহ দেওয়ানের (রহ.) মেলা। দীর্ঘদিন স্বল্প পরিসরে মেলা হতে থাকলেও বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে জমজমাট মেলা। প্রতি ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার শুরু হয়ে তিন থেকে সাত দিন মেলার আনুষ্ঠানিকতা থাকে। কিন্তু মেলা শুরুর ১৫-২০ দিন আগে থেকে শেষ হওয়ারও ১০-১২ দিন পর্যন্ত চলমান থাকে বেচাকেনা।
মেলা কমিটির সভাপতি ও নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, মেলা ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে একটানা ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। যাতে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর অবস্থার তৈরি না হয়, তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, আনসার-ভিডিপি ছাড়াও নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল থাকবে। মেলায় কোনো প্রকার জুয়া বা অনৈতিক কাজ হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। মেলায় যেন কোনো অপ্রীতিকর পরিবেশ তৈরি না হয় সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।