চৌগাছায় মৎস্যজীবীদের বিক্ষোভ ম্যানেজার লাঞ্ছিত

আপডেট: 01:36:04 20/07/2017



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : যশোরের চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ের ডিঙ্গি নৌকা কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলা ও জাল ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে উপজেলা মৎস্য অফিস ঘেরাও করেন মৎস্যজীবীরা। এসময় বাওড় ম্যানেজার এমদাদ হোসেনকে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে।
এমদাদ হোসেন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিক্ষোভ শেষে বিকেল পাঁচটার দিকে মৎস্যজীবীরা এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং চৌগাছা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ের মৎস্যজীবী পল্লী ফতেপুর, আজমতপুর, রামভাদ্রপুর (কুষ্টিয়া-ফতেপুর) ও বেড়গোবিন্দপুর গ্রামে হামলা হুমকির ঘটনা ঘটে চলেছে। সর্বশেষ ১৪ জুলাই শুক্রবার বাওড় মৎসজীবী সমিতির সদস্য এ চার গ্রামের কয়েকজন জেলে রাণী মাছ ধরতে বাওড়ে গেলে তাদের ডিঙ্গি নৌকা ও জাল ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা এবং তাদের মারপিট করে।
এর প্রতিবাদে রোববার দুপুরে চৌগাছা উপজেলা মৎস্য অফিস ঘেরাও করেন মৎস্যজীবীরা। এসময় বাওড় ম্যানেজার এমদাদ হোসেন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। পরে ম্যানেজার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান দেবাশীষ মিশ্র জয়ের অফিস কক্ষে আশ্রয় নেন। তখন তাকে ভাইস চেয়ারম্যানের রুমে অবরুদ্ধ করে রাখেন মৎস্যজীবীরা। পরে চৌগাছা থানার সেকেন্ড অফিসার আকিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করেন। 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিত অভিযোগে তারা জানান, প্রাথমিক অনুমতি পেয়ে আমরা এক সপ্তাহ জাবৎ বাওড়ে রাণী মাছ শিকার করে আসছি। গত ১৪ জুলাই চাঁদপুর গ্রামের আইজদ্দিন, মেহেদী, মফিজুর, বেড়গোবিন্দপুর গ্রামের আক্তার, মিলন, বাবুল, তারোক, তপন, হাজরা ও ওয়াজিতের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা আমাদের ১১ মৎসজীবির রাণী মাছ ধরার ৬৪টি জাল ও ৩টি ডোঙ্গা  (ছোট নৌকা) কেড়ে নিয়ে যায়।
লিখিত অভিযোগে তারা আরো জানান ওই সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বিভিন্ন সময়ে মৃত কেষ্ট হালদারের ছেলে চিত্ত হালদার, মৃত অজিত গোসাইয়ের দুই ছেলে অরবিন্দ ও স্বপন, মৃত মনোরঞ্জন হালদারের পুত্র শৈলেন হালদার ও মনু হালদারের ছেলে শ্যামল হালদার নামে মৎস্যজীবী সমিতির পাঁচ সদস্য ভারতে চলে গেছেন।
জানা যায়, গত ১ জুলাই শনিবার ও হামলা-হুমকির ঘটনা ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে সারারাত ফাঁকা মাঠে রাত কাটান জেলেরা। পরে ২ জুলাই স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মনিরের কাছে এ বিষয়ে লিখিত আর্জি জানান তারা। লিখিত অভিযোগে জেলেরা বাওড়টি সম্পূর্ণ অবমুক্তকরণ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। এমপি বিষয়টি দেখবার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেন। নির্বাহী অফিসার বিষয়টির ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চৌগাছা থানার ওসিকে লিখিতভাবে জানালেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, ওই ঘটনার ব্যবস্থা নিলে ১৪ জুলাই তাদের ওপর হামলা করার সাহস পেত না সন্ত্রাসীরা। তারা আরো জানান, জেলে পাড়ায় হুমকি-ধামকি, হামলা, এখন নিত্য ঘটনা। এমনকি জেলেরা তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের সম্ভ্রমও নিশ্চিত করতে পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানিয়েছেন, সরকার আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের ভারতে পাঠিয়ে দিক। তাতে আমাদের জীবন আর বউ- মেয়েদের ইজ্জত অন্তত বেঁচে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৯-৮০ সাল থেকে যশোর ও ঝিনাইদহ জেলার ৬টি বাওড় বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের জুন মাস থেকে ‘বাওড় মৎস্য প্রকল্প’ রাজস্বখাতভূক্ত হয়। প্রকল্পভূক্ত চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ের জলাশয়ের পরিমাণ ২১৭ হেক্টর। এছাড়া পার্শ্ববর্তী ৪০ হেক্টরের ডায়নার বিলও এ প্রকল্পের অধিভূক্ত। বাওড়টিতে ১ম ও ২য় শ্রেণির কর্মকর্তাসহ ১২টি পদ রয়েছে।
সূত্র জানায়, চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাওড়টি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিতে ২০২ জন সদস্য রয়েছেন। নিয়মানুযায়ী, বাওড় থেকে আহরণকৃত কার্পজাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প) বিক্রয়লব্ধ অর্থের ৬০ শতাংশ (৩৫%+২৫%) মৎস্য ও ভূমি খাতে জমা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ মৎস্যজীবীরা পেয়ে থাকেন। এছাড়া রাণী মাছ (খয়রা, টাকি, শৈল, গজার, পুটি প্রভৃতি) শতভাগ মৎস্যজীবীদের।
কিন্ত গত সাত বছর থেকে বাওড় ম্যানেজার এমদাদ হোসেন মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি তপন কুমারসহ সরকার দলীয় প্রভাবশালী এক রাজনীতিকের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু ব্যক্তি বাওড়ের তিন ভাগের একভাগ প্রায় ৭৩ হেক্টর বা ৫ শতাধিক বিঘা জলাশয়ে পাটাবাঁধ দিয়ে নিজেদের মত করে চাষ করে আসছে। চলতি বছরের ১২ জুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নার্গিস পারভীন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এই পাটা অপসারণ করেন। এবং পাটা বাঁধ দেয়ার কারণে বাওড় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি তপন কুমারকে  মৎ্যেরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০-এর ৪ ধারা অনুযায়ী দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন। এর আগেও তিনি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একই বছরের ২ এপ্রিল মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ওই পাটা বাঁধ সম্পূর্ণ অপসারণ করেন।
জেলেরা অভিযোগ করছেন, বংশপরম্পরায় তারা বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এটিই তাদের একমাত্র পেশা। কিন্তু গত সাত বছর ধরে বিশেষ করে গত দুই বছরে বাওড় ম্যানেজার এমদাদ হোসেন নিজেসহ সরকার দলীয় এক প্রভাবশালী নেতার অনুগত ব্যক্তি বাওড়ের পাঁচ শতাধিক বিঘা জলাশয়ে পাটা দিয়ে বাঁধ দিয়ে নিজেরা মাছ চাষ করে আসছে। সেখানে জেলেদের কোনো সুবিধা দেয়া হচ্ছে না।
তাদের অভিযোগ, বাওড় ম্যানেজার সন্ত্রাসী প্রকৃতির মাত্র ৬০ জনকে মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য দেখিয়ে তাদের বাওড়ের সকল সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন এবং ওই সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বাওড়ের পাঁচশতাধিক বিঘা জলাশয়ে নিজে মাছ চাষ করছেন।
গত ১২ জুন চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নার্গিস পারভীন বাওড়ের পাটা উচ্ছেদকালেও দেখতে পান এমদাদ হোসেন বাওড়ের দখলকৃত অংশে নিজের জাল পেতে রেখেছেন। যা তিনি নিজেই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে স্বীকার করেন।
চৌগাছা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান দেবাশিষ মিশ্র জয় বলেন, প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের ভয়ে জেলেপাড়ার বাসিন্দারা বাড়িতে থাকতে পারছেন না। প্রশাসন এ ব্যাপারে নির্বিকার। সন্ত্রাসীরা প্রায়ই তাদের বাড়িতে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। তাদের ভয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু জেলে পরিবার দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছে।
বাওড় ম্যানেজার ইমদাদ হোসেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে কোনো সন্ত্রাসীর কাছে মাথা নত করবেন না। তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার কথা স্বীকার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
চৌগাছা থানার সেকেন্ড অফিসার আকিকুল ইসলাম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার নার্গিস পারভীন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এর আগে তিনি সংবাদকর্মীদের জানিয়েছিলেন, বাওড়ের ম্যানেজার ইমদাদ নিজে স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মৎস্যজীবী সমিতির নেতাদের সাথে ব্যবসা করেন। ১২ জুন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়েও দেখেন- বাওড় ম্যানেজারের নিজের জাল পাতা রয়েছে। সেটা তিনি স্বীকারও করেছেন। ম্যানেজার সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ব্যবসা করার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন