ছোটদের বড় নজরুল

আপডেট: 02:18:05 30/06/2017



img

সাগর জামান

বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে ছোটদের অনেক বড় ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। তিনি ছোটদের খুব ভালোবাসতেন। নজরুলকেও শিশুরা নিখাদ অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপ্লুত করতো। শিশুদের মাঝে নজরুল অপার সম্ভাবনা দেখতে পেতেন। ছোটদেরকে দেখলে নজরুল ছুটে যেতেন, অবিচ্ছেদ্য মমতার সম্পর্কে বেঁধে ফেলতেন। শিশুদের প্রতি তিনি ছিলেন সহমর্মী ও সংবেদনশীল।
মাত্র আট বছর বয়সে নজরুল পিতৃহারা হয়েছিলেন। তছনছ হয়েছিল তার শৈশব। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল দুঃসহ দুঃখ-দুর্দশা। তবু তিনি হেরে যাননি, দমে যাননি। বরং জয় করে নিয়েছেন সমস্ত প্রতিকূলতাকে। জীবনযুদ্ধে অপরাহত থেকেছেন তিনি। তিনি শিশুদের সাথে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে তুলে তাঁর হারানো শৈশবকে খুঁজে ফিরতেন। ছোটদেরকে নিয়ে হৈচৈ করতেন, গান শোনাতেন। শিশুতোষ ছড়া, কবিতা আবৃত্তি করতেন। আবার কাউকে কাউকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি শিশুদের মাঝে মিশে যেতেন। নিজেকে আবিষ্কার করতেন।
কাজী নজরুল যেমন বিদ্রোহী কবির অভিধা নিয়ে দ্রোহের কবিতা লিখেছেন, শেকল ভাঙ্গার গান গেয়েছেন, তেমনি তাঁর লেখনিতে উঠে এসেছে শিশু মনের নানা ভাবনা। নজরুল তাঁর ছন্দের জাদু দিয়ে ছোটদের মনে নানা ভাব জাগিয়ে তুলতেন। তাদের সম্ভাবনা উস্কে দিতেন। ছোটদের সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখাতেন।
নজরুল শিশু মনের নির্মল অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করতেন। নজরুলের শিশুতোষ লেখাগুলো নিছক কল্পনাপ্রসূত নয়। তিনি ছোটদের নিয়ে যে সব রচনা করেছেন সব কিছুর মধ্যে আলাদা আলাদা কাহিনীসূত্র কাজ করেছে। উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে :
কাঠবিড়ালী, কাঠবিড়ালী
পেয়ারা তুমি খাও?
গুড় মুড়ি খাও, দুধ ভাত খাও?
বাতাবি লেবু, নাউ?
বেড়াল বাচ্চা কুকুর ছানা তাও?

নজরুলের 'খুকি ও কাঠবিড়ালী' শীর্ষক এই ছড়ার পেছনে রয়েছে এক মজার কাহিনী। নজরুল বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন। তিনি যেখানেই যেতেন শিশুদের সাথে তাঁর সখ্য গড়ে উঠতো। ১৯২১ সালে তিনি কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি উঠেছিলেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। অঞ্জলি নামের ইন্দ্র বাবুর একটি ফুটফুটে মেয়ে ছিল। নজরুলের ক্ষুদে বন্ধুদের তালিকায় এই মেয়েটিও স্থান করে নিয়েছিল। নজরুল একদিন দেখলেন এই মেয়েটি একটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে উপরে তাকিয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। নজরুল কাছে গিয়ে দেখলেন মেয়েটি একটি কাঠবিড়ালীর সাথে কথা বলছে। তিনি অবুঝ মেয়েটির সারল্য দেখে বিমুগ্ধ হলেন। তিনি লিখলেন, 'খুকি ও কাঠবিড়ালী' কবিতাটি।
নজরুল বিচিত্র অভিজ্ঞতার সন্ধানে হয়তো ভ্রমণ করতেন, ঘুরে বেড়াতেন একস্থান থেকে অন্যস্থানে। ভারতের দেওঘর নামে একটি জায়গা আছে। অনাবিল আবহাওয়ার এই জায়গাতে নজরুল কিছুদিন ছিলেন। নজরুল এখানে যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়ির উপরতলায় একটি চঞ্চল মেয়ে থাকতো। কিছু দিনের মধ্যে মেয়েটির সাথে নজরুলের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। নজরুল মেয়েটিকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, গান শোনাতেন, কবিতা শোনাতেন। তিনি দেওঘর থেকে চলে আসার পর একটি চিঠি পেলেন। চিঠিতে নজরুলকে সেই মেয়েটির জন্মদিনে আসার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা ছিল। নজরুল মেয়েটির জন্মদিনে উপহারস্বরূপ লিখলেন :
নামহারা তুই পথিক শিশু
এলি অচিন দেশ পারায়ে
কোন নামে আজ পরলি কাকন
বাধনহাঁরা কোন কারাএ।

নজরুল তাঁর সিদ্ধহস্তে অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। নজরুলের শিশুতোষ ছড়ার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- পিলেপটকা, খাদু দাদু, লিচু চোর, মটকু মাইতি, খুকি, কাঠবিড়ালী প্রভৃতি।
নজরুলের সাথে আলী আকবর নামের এক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। ভদ্রলোকটি শিশুদের পাঠ্যবই লিখতেন। একদিন শিশুদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির জন্য আলী আকবর সাহেব কবিতা লিখে নজরুলকে দেখিয়েছিলেন। নজরুলের কাছে লেখাটা যথাযথ মানের মনে হয়নি বলে নজরুল ভদ্রলোককে বলেছিলেন। তখন আকবর আলী সাহেব নজরুলকে লিখতে বলেছিলেন একটি কবিতা। তখন নজরুল লিখলেন :
বাবুদের তাল পুকুরে
হাবুদের ডাল কুকুরে
সেকি ব্যাস করলো তাড়া
বলি থাম্ একটু দাঁড়া।

নজরুলের শিশুতোষ রচনার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। তিনি কোমলমতি শিশুদের মধ্যে অমিত সম্ভাবনার শক্তি দেখতে পেতেন। শিশুদের অন্তর্গত অগ্নিময় শক্তির স্ফুরণ তাঁর শিশুতোষ রচনায় ঘটাতেন। তিনি ছোটদের দুর্বল ভাবতেন না। তিনি শিশুদেরকে শক্তিময় হবার, জ্বলে উঠবার প্রেরণা যুগাতেন। নজরুল ছোটদের সম্ভাবনাকে প্রজ্জ্বলিত করবার বাণী উচ্চারণ করেছেন :
তুমি নও শিশু দুর্বল,
তুমি মহৎ মহীয়ান
জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট
অমৃতে সন্তান।

সাহিত্যের এই মহান কারিগর তাঁর অগ্নিঝলসিত রচনার মাধ্যমে দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে যেমন শাসন করেছেন, অত্যাচারীদেরকে তেমনি তাঁর শিশুতোষ সৃষ্টি কুশলতা দিয়ে জয় করে নিয়েছেন শিশুদের কোমল মনোজগতকে। নজরুল অবশ্যই সর্বজনবিদিত সাহিত্যের বরপুত্র। একথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। নজরুলের সৃষ্টি আমাদের শিশুদের অসাম্প্রদায়িক হতে শেখাবে। তাঁর রচনা সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বাতাবরণ অক্ষুণ্ন রাখার, সমাজের বিভাজন দূর করার চেতনাকে প্রজ্বলিত করবে- এমনটাই প্রত্যাশ্যা করি। নজরুলের যাপিত জীবন ও তাঁর আদর্শ থেকে আমাদের শিশুদেরকে শিক্ষা দেয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

সাগর জামান : কবি ও প্রাবন্ধিক