জাতীয় ঐক্য যেভাবে আওয়ামী লীগের জন্য হুমকি

আপডেট: 03:22:32 07/10/2018



img

অনুপম দেবাশীষ রায়

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে নির্বাচনী মৌসুম শুরু হয়ে গিয়েছে। ডিসেম্বরে হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে, যদিও এর ভেতরে বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার জোট গঠন নিয়ে চলছে দর-কষাকষি। এ পর্যন্ত বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না আর কাদের সিদ্দিকীর মতন নামজাদা নেতারা কার্যকর কোনো ঐক্য গঠন না করলেও এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যুক্তফ্রন্টকে স্বাগত জানালেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ধরে নিচ্ছে যে ভোটের রাজনীতিতে এই জোট তাদের জন্য কোনো রকম সংকট বয়ে আনবে না। তাদের শঙ্কার বিষয় কেবল যুক্তফ্রন্ট এবং বিএনপির মাঝে জোট গঠিত হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি, যেটি বিশ্বের কাছে সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য বিষয়ে একধরনের বার্তা পৌঁছে দেবে। যদিও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে রকম একটি বার্তা চলে গেছে, তবু নির্বাচনমুখী জোটটি এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের ভুল হবে যদি তাঁরা ভাবেন যে জোটবদ্ধ না হলেও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট তাঁদের জন্য কোনো রকম হুমকি নয়। ইতিহাস জানান দেয়, নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে গড়ে তোলা তড়িঘড়ি জোটগুলো মাঝেমধ্যেই হুট করে ক্ষমতায় চলে আসে এবং পূর্বতন বড়কর্তাদের ধরাশায়ী করে ফেলে।
আমি এটা বলছি, কেননা কেবল নামেই যুক্তফ্রন্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্যতম নির্বাচনী পটপরিবর্তনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ছিল হুট করে বিজয়ের স্বাদ পাওয়া মুসলিম লীগবিরোধী প্রতিস্পর্ধী জোট। আওয়ামী লীগের এই বিষয়টা ভালোভাবেই জানার কথা। কেননা, তারা নিজেরাই ছিল এই জোটের অংশ। কাজেই এই ক্রান্তিলগ্নে তারা যদি নিজেদের ইতিহাস নিজেরাই ভুলে বসে, তাহলে সেটা হবে পরিহাসের শামিল। অবশ্য যদি আমরা তত দূরের ইতিহাসেও যেতে না চাই, আমরা তাকাতে পারি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে। ১৯৭৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে সেখানে জনতা পার্টি জোটবদ্ধ দল হয়েও দশকের পর দশক ধরে শাসন করে আসা জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে জয়লাভ করে। এই জোটের মূল ভিত্তি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর কায়েম করা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা। নির্বাচনের চমক দেখিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে হারিয়ে দেওয়ার পর জনতা পার্টির নেতা মোরারজি দেশাই হয়ে ওঠেন স্বাধীন ভারতের প্রথম ‘অ-কংগ্রেসি’ প্রধানমন্ত্রী।
যদি আমরা একটু মনোযোগ দিয়ে ভারতে জরুরি অবস্থার সময়ে কংগ্রেসের নানান কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাই, দেখব, এর অনেকগুলোই বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মিলে যায়। ভারতীয় জরুরি অবস্থা রীতিমতো প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা সঁপে দেয়। নির্বাচন বাতিল করার এবং জনগণের স্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকার রহিত করার এখতিয়ার তাঁর হাতে তুলে দেয়। এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইন্দিরা রাজনৈতিক শত্রুদের কারারুদ্ধ করেন এবং সংবাদপত্রে লেখার স্বাধীনতা সংকুচিত করেন। এদিকে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সংবাদপত্রের মুখে কুলুপ এঁটে দেওয়া হয়েছে (সাম্প্রতিক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট যার অন্যতম উদাহরণ) আর সাংবাদিকদের নির্যাতন করা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নিত্যনতুন উপায়ে দমন অব্যাহত রয়েছে, তাঁদের অনেককে জেলহাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ হলো কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলন। কাজেই আওয়ামী লীগের ২০১৪-পরবর্তী শাসন ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সঙ্গে পুরোটা তুলনীয় না হলেও কিছুটা মিল দেখতে পাওয়া বাড়াবাড়ি হবে না। কাজেই এমন সব কর্মকাণ্ডের কারণে গড়ে ওঠা ক্ষোভ এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতা করার রেওয়াজ মিলিয়ে যুক্তফ্রন্টের সামনে একক বিজয় না হলেও বড় সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে তার জন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে আসলেই বৃহত্তম নির্বাচনী ঐক্য হয়ে উঠতে হবে। সেটাই হবে ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ কার্যকর যুক্তফ্রন্ট।
এবার এই একক বিজয়টুকু নিয়ে কিছু কথা বলি। একক বিজয়ের জন্য আসলে যুক্তফ্রন্টকে দেড় শর বেশি আসন জিততে হবে না, তার চেয়ে অনেক কম জিতলেও চলবে। যদি যুক্তফ্রন্টসহ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া বিএনপির সঙ্গে শেষতক একটা জোটে আবদ্ধ হতে সফল না-ও হয়, তারপরও এটি নগরগুলোয় ১০ থেকে ১৫টি আসন জয়ের সম্ভাবনা রাখে এর নামজাদা নেতাদের কারণে। এর বাইরে আরও রয়েছে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ছোট দলগুলো এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট। এরা সবাই মিলে যদি ৩০টি আসনেও জয়লাভ করতে পারে, তাহলে দুটি বড় দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া হয়ে যাবে দুরূহ। তবে এর জন্য তাদের স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত থাকতে হবে। এ রকম কিছু ঘটলে আমরা এগোব একটি ঝুলন্ত সংসদের দিকে, যেখানে ক্ষমতায় যেতে গেলে বড় দলগুলোকে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে হবে। এমনকি যদি আওয়ামী লীগও সেই সরকারের শিরোমণি হয়, তবু তাদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। তাতে একচেটিয়া শাসনের বিপদ প্রশমিত করায় যুক্তফ্রন্টের মৌলিক আকাঙ্ক্ষাও একপ্রকারে বাস্তবায়িত হতে পারবে।
যুক্তফ্রন্টের মূল চাহিদা যদি হয়ে থাকে অহিংস রাজনীতি এবং প্রগতি, তাহলে নিজেদের শক্তিতে এককভাবে নির্বাচনে দাঁড়াতে তাদের দ্বিধাবোধ করা উচিত নয়। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরই মাঝে বিএনপির সঙ্গে তাদের একরকম নির্বাচনী সমঝোতা তৈরি হয়েছে ঠিক, তবে নিজেদের শক্তিতে যদি যুক্তফ্রন্ট কমপক্ষে শহুরে আসনগুলো জিতে নিতে না পারে, তাহলে ঘুরেফিরে বাংলাদেশ চলে যাবে সেই দ্বিদলীয় অপরাজনীতির বৃত্তে। যদি যুক্তফ্রন্ট সেই বৃত্ত ভাঙতে পারে, তাহলে আমরা প্রথমবার স্বাধীন বাংলাদেশে একটি ঝুলন্ত সংসদ দেখতে পাব, যেখানে কিনা সরকারের স্থায়িত্বের জন্য হলেও রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক আচরণে সীমাবদ্ধ থাকবে। সেই সংখ্যালঘু সরকারে যুক্তফ্রন্ট অংশীদার হতে পারে এর নিজস্ব শক্তিতে, আর বাংলাদেশ ফিরে যেতে পারে তার কাঙ্খিত গণতান্ত্রিক পথরেখায়।
[লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত। মুক্তিফোরামের সম্পাদক। প্রথম আলোর বিশ্লেষণ।]