জীবননগরে ভোটের মাঠে দাগি আসামিরা, আতঙ্ক

আপডেট: 10:04:05 18/03/2018



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : জীবননগর উপজেলার রায়পুর, হাসাদহ ও বাঁকা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৯ মার্চ। নির্বাচনী উৎসবের আমেজের পরিবর্তে এ ইউনিয়নগুলোতে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও আতঙ্ক। সাধারণ ভোটারসহ এলাকাবাসীর মাঝে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা রায়পুর ইউনিয়নে। এখানকার বর্তমান চেয়ারম্যান নিজে ও তার লোকজন এমনকি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে গোটা ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার ও তার পেটোয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। জনশ্রুতি রয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী তাহাজ্জত হোসেন মির্জা বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন। বেশ কয়েকজন জেলফেরত দাগি আসামি তার পক্ষে ‘ভোটের মহড়া’ দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের জেল খাটানো ও জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন ভোটাররা।
চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত একদল সাংবাদিক এ সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে শনিবার রায়পুর ইউনিয়নে যান। এখানকার বারান্দি, রায়পুর, রায়পুর বাজার, কামারপাড়া, বাউরীপাড়া, নতুন ও পুরনো কৃষ্ণপুর, নতুন ও পুরনো চাকলা, মারুফদহ, বালিহুদা প্রভৃতি গ্রাম ঘুরে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ সব অভিযোগের সত্যতা মেলে। তবে অনেকেই সাংবাদিকদের সামনে ভয়ে কথা বলতে চাননি। এর পরেও চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি, মারুফদহ গ্রামের রবিউল ইসলাম ঝড়োর ছেলে তারিকুল ইসলাম তারেক, রায়পুর গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে ইমরানুল হাসান নয়ন, বৃহত্তর বাঁকা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান মাস্টার, মারুফদহ গ্রামের মরহুম মোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে আব্দুল লতিফ ও মরহুম আহম্মদ আলীর ছেলে গোলাম সরোয়ার স্মারক, কামারপাড়া গ্রামের সন্টুর ছেলে আলম ও আক্কাছ আলীর ছেলে শরীফ, বারান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম সিরাজুর ইসলামের ছেলে মশিয়ার রহমান, বালিহুদা গ্রামের আব্দুল মান্নান দর্জির ছেলে রাসেল, আসমান মণ্ডলের ছেলে মাজহারুল ইসলাম লিটন ও মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে জমির, রায়পুর গ্রামের মরহুম জবেদ আলী শাহর ছেলে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য আব্দুর রাজ্জাক শাহ, বারইপাড়ার ইয়ার আলীর ছেলে ইমরানসহ অনেকেই অভিযোগের ব্যাপারে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে মুখ খোলেন।
তাদের ভাষ্য, চেয়ারম্যান তাহাজ্জত হোসেন মির্জা নিজে ও তার লোকজন এবং স্থানীয় পুলিশকে ব্যবহার করে লোকজনকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করছেন। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এ নির্বাচনে টু-শব্দ করা যাবে না, করলে অস্ত্র দিয়ে পুলিশে দেওয়াসহ হাত-পা ভেঙে ফেলা ও খুন করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, ভোটের দিন কেন্দ্রে যদি কোনো ভোটার নাও থাকেন এবং মাত্র ২০০ ভোট পেলেও তাহাজ্জত মীর্জা চেয়ারম্যান হবেন, ভোট গণনা আর রেজাল্ট ভোট কেন্দ্রে নয়, দেওয়া হবে জীবননগর উপজেলা পরিষদ থেকে। এ রকমের অজস্র রকমের হুমকি-ধামকি, প্রপাগান্ডা ও নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করে এখানকার নির্বাচনী পরিবেশকে অশান্ত ও অস্থিতিশীল করে তুলেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান।
রায়পুর গ্রামের আব্দুল মণ্ডলের ছেলে ডাকাতি মামলার আসামি মোক্তার, বারান্দি গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে পিয়াস, আসমান মির্জার ছেলে আজাবুল, গনি মির্জার ছেলে ওলিয়ার, বালিহুদা গ্রামের আব্দুল ওহাব বিশ্বাসের ছেলে মিন্টুসহ একদল সন্ত্রাসী এবারের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদটি পুনর্দখল করতে তাহাজ্জত মির্জার পক্ষে বেপরোয়া পেশীশক্তি দেখিয়ে গোটা রায়পুর এলাকা অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
এসব বিষয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মতিয়ার রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াত নেতা মোহাম্মদ আলী সংবাদকর্মীদের সামনে ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।
আর স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) আব্দুর রশিদ শাহ বলেন, ‘গোটা রায়পুরবাসী তার ব্যাপারে বলবে, আমি কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকু বলবো, আমার নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তাহাজ্জত মির্জা ও তার লোকজন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে করে আদৌ নির্বাচন হবে কি-না সেটাই দেখার বিষয়। আর হলেও অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা এখনো চোখে পড়েনি।’
এ বিষয়ে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে সাংবাদিকদের জানান।
রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাহাজ্জত হোসেন মির্জা তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি আবারো বিজয়ী হই- এটা যারা চায় না তারাই এ রকমের মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে।’
অন্যদিকে, হাসাদহ ইউনিয়নের নির্বাচনী পরিস্থিতি অতটা ভয়াবহ না হলেও এখানে সাবেক বৃহত্তর বাকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হক ও সাধারণ সম্পাদক শফি মেম্বর হত্যা মামলার আসামি শাখাওয়াতকে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রবি বিশ্বাস নির্বাচনের মাঠ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হুমকি-ধামকি অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) সোহরাফ হোসেন বিশ্বাসসহ অন্য প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা আতঙ্কিত বোধ করছেন। এখানে সোহরাফ হোসেন বিশ্বাসের অবস্থান বেশ মজবুত। বিএনপির প্রার্থী কামাল উদ্দীন সিদ্দিকী নাশকতার মামলায় জেলে রয়েছেন। এ ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলামও রয়েছেন নির্বাচনের মাঠে।
নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে জীবননগর থানার ওসি মাহমুদুর রহমান বলেন, এ রকম হওয়ার কথা না। তার পরেও এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে রিটার্নিং অফিসার অথবা তাকে জানানোর জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন।
রিটার্নিং অফিসার ও জীবননগর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোতাওয়াক্কিল রহমান রায়পুর পরিস্থিতির বিষয়ে জানান, এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন